ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্লাউড কম্পিউটিং বাজারে প্রতিযোগিতা আরও উন্মুক্ত রাখতে অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের ক্লাউড সেবাকে কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠান দুটিকে এমন কিছু বাধ্যবাধকতা মানতে হবে, যাতে তারা বাজারে নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে প্রতিযোগীদের জন্য বাধা তৈরি করতে না পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রাথমিক অবস্থান
ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, অ্যামাজনের ক্লাউড সেবা এবং মাইক্রোসফটের ক্লাউড সেবাকে ‘গেটকিপার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান দুটি এই মর্যাদার আওতায় এলেও এবার তাদের ক্লাউড প্ল্যাটফর্মকেও একই নিয়মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কমিশনের মতে, দুই প্রতিষ্ঠানের আয়, বিনিয়োগ, কার্যক্রমের পরিধি এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক বেশি। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সেবা ও অংশীদারত্বের কারণে ক্লাউড সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং সেই চাহিদার বড় অংশ নিজস্ব প্ল্যাটফর্মের মধ্যেই ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে তারা।
কেন এই পদক্ষেপ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভাষ্য, ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে ক্লাউড অবকাঠামোর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তাই এই বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বাজারে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে নতুন প্রতিষ্ঠান ও ছোট প্রতিযোগীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রতিষ্ঠান দুটির সামনে কী সুযোগ
এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ইউরোপীয় কমিশনের হাতে থাকা নথিপত্র পর্যালোচনা এবং লিখিত জবাব দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে অ্যামাজন ও মাইক্রোসফট।
চূড়ান্তভাবে গেটকিপার হিসেবে ঘোষণা করা হলে প্রতিষ্ঠান দুটিকে ছয় মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আইন পুরোপুরি মেনে চলতে হবে।

অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের প্রতিক্রিয়া
অ্যামাজনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইউরোপের ক্লাউড বাজারে ইতোমধ্যেই শক্তিশালী প্রতিযোগিতা রয়েছে এবং গ্রাহকেরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিকল্প, কম খরচ ও বেশি নমনীয়তা পাচ্ছেন। তাদের দাবি, নতুন নিয়ন্ত্রক স্তর যুক্ত হলে বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের গতি কমে যেতে পারে। তবে কমিশনের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মাইক্রোসফটও জানিয়েছে, তারা কমিশনের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ চালিয়ে যাবে। তাদের মতে, ইউরোপের ক্লাউড খাত অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
কঠোর নিয়ম ও বড় অঙ্কের জরিমানা
গত বছরের নভেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে। তদন্তের লক্ষ্য ছিল, ক্লাউড সেবাগুলোকে ডিজিটাল বাজার আইনের আওতায় আনা উচিত কি না তা নির্ধারণ করা।
এই আইনের আওতায় গেটকিপার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের সেবার পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের সেবার সঙ্গে আন্তঃকার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবহারকারীদের নিজেদের তৈরি তথ্য ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে এবং প্ল্যাটফর্মের বাইরে গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক চুক্তি করার পথও বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।
একই সঙ্গে নিজেদের পণ্য বা সেবাকে প্রতিযোগীদের তুলনায় অন্যায্যভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা ব্যবহারকারীর সম্মতি ছাড়া লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের জন্য তথ্য সংগ্রহের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ থাকবে।
নিয়ম ভঙ্গ করলে কোনো প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা যেতে পারে। একই ধরনের লঙ্ঘন বারবার ঘটলে জরিমানার পরিমাণ বেড়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। প্রয়োজনে দৈনিক বিক্রির গড় আয়ের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত আর্থিক জরিমানাও আরোপ করতে পারবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের ক্লাউড কম্পিউটিং বাজারে প্রতিযোগিতার কাঠামো এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
সংক্ষিপ্ত বিবরণ: ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের ক্লাউড সেবাকে কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে, যা বাজারে প্রতিযোগিতার নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















