ভুয়া তথ্য এখন আর শুধু ইন্টারনেটের বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দ্রুতগতির অনলাইন যোগাযোগ এবং বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের কারণে মিথ্যা দাবি এমন গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে যে গবেষকেরা এর সঙ্গে সংক্রামক রোগের তুলনা করছেন। একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে যেমন ভাইরাস ছড়ায়, তেমনি একটি মিথ্যা তথ্যও মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও অসতর্কতার মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিবেচনায় ভুয়া দাবি বর্তমানে বিশ্বের বড় হুমকিগুলোর একটি। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভুল তথ্যের ব্যাপক বিস্তারকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে ‘তথ্য-মহামারি’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
গুজবেরও আছে সংক্রমণ-চক্র
যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ভুয়া তথ্যের বিস্তার বোঝার জন্য সংক্রামক রোগের মডেল ব্যবহার করছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, একজন মানুষ অন্য কারও কাছ থেকে কোনো গুজব বা মিথ্যা দাবি না শুনলে সেটির সংস্পর্শেই আসবেন না। অর্থাৎ রোগজীবাণুর মতোই এখানে একজন মানুষ অন্যজনের মাধ্যমে ‘সংক্রমিত’ হচ্ছেন।
কম্পিউটারভিত্তিক এসব মডেলে তথ্য কীভাবে একজন থেকে আরেকজনের কাছে যায়, কত দ্রুত ছড়ায় এবং কোন পর্যায়ে সেটি থামানো সম্ভব—এসব বিষয় বারবার অনুকরণ করা হয়। বাস্তব পরিস্থিতি অবশ্যই অনেক বেশি জটিল। তবু এই মডেল গবেষকদের ভুয়া তথ্যের বিস্তার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিচ্ছে।
ভুল তথ্য থামাতে সবচেয়ে জরুরি দ্রুত সংশোধন

গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর সেটি সংশোধন করতে কত দ্রুত কেউ এগিয়ে আসছেন।
ভুয়া দাবির সরাসরি সংশোধনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যত দেরিতে সামনে আসে, তত বেশি মানুষ ভুল তথ্যটির সংস্পর্শে চলে যায়। গবেষণার অনুকরণে দেখা গেছে, কোনো গুজব ছড়ানোর এক সপ্তাহ পর সংশোধন শুরু হলে ততক্ষণে প্রায় অর্ধেক মানুষ সেটি দেখে ফেলতে পারেন। সংশোধন প্রকাশের পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ শুধু মিথ্যা দাবিটিই দেখে যেতে পারেন, সংশোধনীটি আর তাঁদের কাছে পৌঁছায় না।
অন্যদিকে, এক দিনের মধ্যেই যদি নির্ভরযোগ্য সংশোধন হাজির হয়, তাহলে ভুয়া তথ্যের বিস্তার অনেক দ্রুত থেমে যেতে পারে।
ক্যানসারের ওষুধ নিয়ে গুজবের ভয়াবহ পরিণতি
দক্ষিণ কোরিয়ায় কয়েক বছর আগে ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়ে এমন একটি গুজব ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটি ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রের এক ব্যক্তি দাবি করেন, পশুর পরজীবী নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি ওষুধ খেয়ে তিনি ক্যানসার থেকে সেরে উঠেছেন। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার এক বিনোদনজগতের ব্যক্তিও জানান, তিনি নিজের ক্যানসারের চিকিৎসায় একই ওষুধ ব্যবহার করছেন।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ক্যানসার রোগীদের মধ্যে ওষুধটির চাহিদাও বেড়ে যায়, যদিও ক্যানসার চিকিৎসায় এর কার্যকারিতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না।
প্রায় তিন সপ্তাহ পর দক্ষিণ কোরিয়ার খাদ্য ও ওষুধ নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ক্যানসারের চিকিৎসায় ওষুধটি ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আরও পরে দেশটির ক্যানসারবিষয়ক সংগঠন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে খণ্ডন করে।
কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে। কিছু রোগী সংশোধনী পৌঁছানোর আগেই গুজবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমনকি কেউ কেউ নিজেরাই ওষুধটি গ্রহণ করে যকৃতের ক্ষতির শিকার হন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাড়িয়ে দিচ্ছে বিপদ
আগে একটি মিথ্যা খবর তৈরি করতে সময় ও পরিশ্রম লাগত। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ লেখা, ছবি, শব্দ ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। ফলে মিথ্যা তথ্য তৈরির পাশাপাশি সেটি ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
গবেষণার অনুকরণে দেখা যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া তথ্য সাধারণ গুজবের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই মিথ্যা দাবি একসঙ্গে বহু ভুয়া হিসাব থেকে প্রকাশ করা হলে মানুষ সেটিকে আলাদা আলাদা উৎস থেকে আসা সত্য তথ্য বলে ভুল করতে পারে।
কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক ভুল তথ্য ছড়ানোর এমন একটি নেটওয়ার্কের সন্ধানও পাওয়া গিয়েছিল। একই বক্তব্য বিভিন্ন হিসাব থেকে ভিন্ন কৃত্রিম কণ্ঠে প্রচার করা হয়েছিল এবং সেগুলোর ভিডিও কয়েক কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েই কি প্রতিরোধ সম্ভব?
প্রশ্ন উঠছে, যে প্রযুক্তি ভুয়া তথ্যকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে, সেটিকে কি উল্টোভাবে ভুয়া তথ্য শনাক্ত ও খণ্ডনের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব?
সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু কাজটি সহজ নয়। বিশেষ করে সম্পাদিত ভিডিও, বিকৃত ছবি এবং নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভরশীল দাবির সত্যতা যাচাই করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারও সীমাবদ্ধতা আছে।
তাই শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে মানুষ, সংবাদমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ভুয়া খবর ঠেকানো শুরু হোক নিজের কাছ থেকেই
সরকার আইন করতে পারে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার কমাতে নিজেদের ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো তথ্য দেখে সেটি যাচাই না করে অন্যের কাছে পাঠাবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিকেই নিতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য যাচাই করা এবং ভুল তথ্য সংশোধন করাকে দৈনন্দিন সামাজিক আচরণের অংশ করে তুলতে হবে। কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে বিরক্ত না হয়ে বরং সেটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার অভ্যাসও তৈরি করতে হবে।
পরিবারের সদস্য বা বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিলে তাঁকে সংশোধন করা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর। সামাজিক সম্প্রীতি ও পারিবারিক সম্পর্কের কথা ভেবে অনেকে নীরব থাকেন। কিন্তু নীরবতা অনেক সময় গুজবকে আরও দূরে পৌঁছে দেয়।
ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে ‘টিকা’ও হতে পারে
গবেষকেরা মানুষের মধ্যে ভুয়া তথ্য বিশ্বাস করার প্রবণতা কমাতে এক ধরনের আগাম প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়েও কাজ করছেন। এর মূল ধারণা হলো, মানুষকে আগে থেকেই ভুয়া তথ্য ছড়ানোর সাধারণ কৌশলগুলো চিনিয়ে দেওয়া।
মাত্র ৯০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে ভুয়া তথ্যের প্রচলিত কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পর মানুষ পরবর্তী সময়ে মিথ্যা দাবিতে তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হয়েছেন—এমন প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া গেছে।
এই পদ্ধতিকে অনেকটা ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে আগাম টিকার মতো দেখা হচ্ছে। বড় পরিসরেও এর পরীক্ষা হয়েছে। তবে এখনো এটি স্থায়ী ও সর্বব্যাপী প্রতিরোধব্যবস্থায় পরিণত হয়নি।
শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব আমাদের সবার
ভুয়া তথ্যের বিস্তার ঠেকানোর লড়াইকে শুধু সরকার বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। একটি মিথ্যা খবর যত দ্রুত ছড়ায়, তার প্রতিরোধও তত দ্রুত হতে হবে।
কোনো তথ্য দেখেই বিশ্বাস না করা, উৎস যাচাই করা, সন্দেহজনক দাবি ছড়িয়ে না দেওয়া এবং ভুল প্রমাণিত হলে নিজের অবস্থান সংশোধন করা—এই অভ্যাসগুলোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
ভাইরাসের বিরুদ্ধে যেমন সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়, তেমনি তথ্য-মহামারির বিরুদ্ধেও প্রয়োজন সম্মিলিত সতর্কতা। কারণ একটি মিথ্যা খবর হয়তো একজনের কাছ থেকে শুরু হয়, কিন্তু সেটিকে মহামারিতে পরিণত করে আমাদেরই অসতর্কতা।
ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি সচেতন মানুষ।
ভুয়া খবর ঠেকাতে যাচাই করুন, সংশোধন করুন এবং প্রয়োজন হলে নিজেকেও সংশোধন করতে প্রস্তুত থাকুন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















