০২:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নতুন ব্যবসা—অ্যালেক্স টেলরের বদলে যাওয়ার গল্প বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক সুবিধা স্পষ্ট করল এনবিআর শ্রীলঙ্কায় ৩ কেজির বেশি ওজনের বিশাল মূত্রথলির পাথর অপসারণ, রেকর্ডের দাবি নোনতা বাদাম ও চকোলেটের খসখসে কুকি রুটি-বিদ্যুৎহীন কিউবা: আর কতটা সহ্য করতে পারবেন সাধারণ মানুষ? মঞ্চে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন তারা এরাউট: সমালোচনা পেরিয়ে রসিনির অপেরায় নতুন সাফল্য সন্ত ফ্রান্সিসের চরিত্রে ডুব দিতে দুই মাস সন্ন্যাসীদের সঙ্গে শিল্পীর জীবন প্রযুক্তি জায়ান্টদের মুনাফায় নতুন ঝুঁকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজার কি ‘চক্রাকার’ ফাঁদে? নটর ডেমে নতুন রঙিন কাচের জানালা, ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতার তীব্র বিতর্ক জর্জ মাইকেলের হারিয়ে যাওয়া কনসার্ট ফিরছে পর্দায়

শিশুর ঘরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নজরদারি: নিরাপত্তা নাকি অতিরিক্ত নির্ভরতা?

শিশুর ঘুম, শ্বাস-প্রশ্বাস, কান্না, নড়াচড়া—সবকিছুই এখন প্রযুক্তির চোখে ধরা পড়ছে। শিশুর যত্নে অভিভাবকদের সহায়তা করার নামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু শিশুর প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ কি সত্যিই অভিভাবকদের নিশ্চিন্ত করছে, নাকি ধীরে ধীরে তাদের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভরতা তৈরি করছে?

আধুনিক শিশুনজরদারি যন্ত্রগুলো এখন শুধু শিশুর কান্না শোনানো বা ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্যামেরা ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিশুর নড়াচড়া, চোখ খোলা ও বন্ধ করার সময়, ঘুমের ধরন, বুকের ওঠানামা এবং এমনকি কাশি বা ভাষা ও শারীরিক বিকাশের মতো বিষয়ও পর্যবেক্ষণের দিকে এগোচ্ছে।

শিশুর ঘুম থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যতথ্য

এই প্রযুক্তির জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ হলো অভিভাবকদের কাছে বিপুল পরিমাণ তথ্য পৌঁছে দেওয়া। একটি জনপ্রিয় শিশুনজরদারি ব্যবস্থায় শিশুর ঘুমের কার্যকারিতা, ঘুমিয়ে পড়তে কত সময় লাগছে এবং রাতে কতবার অভিভাবকের প্রয়োজন হয়েছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

অনেক অভিভাবকের কাছে এই তথ্য নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। সন্তান ঘুমাচ্ছে কি না, কতক্ষণ ঘুমাচ্ছে বা রাতে তার আচরণ কেমন—এসব বিষয়ে ধারণা পাওয়া তাদের উদ্বেগ কমাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, একটি শিশুর জীবনের এত সূক্ষ্ম তথ্য আদৌ কতটা প্রয়োজনীয়?

একজন অভিভাবকের অভিজ্ঞতায়, প্রথম সন্তানের ঘুমের প্রায় প্রতিটি রাতই যন্ত্রের মাধ্যমে রেকর্ড ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শুরুতে উদ্দেশ্য ছিল দূর থেকে সন্তানকে দেখে নেওয়া। পরে সেই যন্ত্রের বিপুল তথ্য ও বিশ্লেষণই অভিভাবকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের আগেই একই ধরনের যন্ত্র কেনার সিদ্ধান্তও যেন স্বাভাবিক হয়ে যায়।

নিরাপত্তার আশ্বাস, নাকি ভয়কে পুঁজি করা?

শিশুনজরদারি প্রযুক্তির বাজারে প্রতিযোগিতাও দ্রুত বাড়ছে। কিছু যন্ত্র শিশুর পায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হৃদস্পন্দন ও রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণের দাবি করে। আবার কিছু ব্যবস্থায় শিশুর মুখ ঢাকা পড়লে সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ঘুমের সময় নির্ধারণ, ঘুমের পূর্বাভাস কিংবা ব্যক্তিগত পরামর্শ দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, এসব ব্যবস্থা অভিভাবকদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে এবং শিশুর ঘুম ও নিরাপত্তার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এমনও দাবি করেছে যে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অভিভাবকেরা বছরে অতিরিক্ত কয়েক রাত ঘুমানোর সুযোগ পান।

তবে শিশু বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই প্রচারণা নিয়ে সতর্ক। তাদের আশঙ্কা, শিশুর সম্ভাব্য বিপদকে সামনে রেখে অতিরিক্ত সতর্কবার্তা ও ভয়ভিত্তিক প্রচারণা অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কোনো যন্ত্র ভুল সংকেত দিলে অভিভাবক এমনও ভাবতে পারেন যে শিশুটি শ্বাস নিচ্ছে না।

তথ্য যত বাড়ছে, উদ্বেগও তত

প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা। শিশুর ঘুম, শ্বাস-প্রশ্বাস, আচরণ, শব্দ, নড়াচড়া এবং বিকাশসংক্রান্ত তথ্য দীর্ঘ সময় ধরে সংগ্রহ করা হলে সেই বিপুল তথ্যের মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে শিশুর ভাষা ও শারীরিক বিকাশ পর্যবেক্ষণেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। এমনকি কোনো শিশুর আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শৈশবের নড়াচড়ার ধরন মিলিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করার সম্ভাবনাও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা তুলে ধরেছেন।

অর্থাৎ বিষয়টি আর শুধু ‘শিশু এখন ঘুমাচ্ছে কি না’—এই প্রশ্নে আটকে নেই। শিশুর জন্মের পর থেকে কৈশোর পর্যন্ত তার জীবনের ক্রমাগত তথ্যভাণ্ডার তৈরির একটি সম্ভাব্য কাঠামো গড়ে উঠছে।

Privacy Challenges of Smart Cameras: Edge AI as a Solution? - TechNexion -  Embedded Vision - USB , MIPI CSI-2 , GMSL2 , GIGE Vision

প্রযুক্তির ভুলও কম নয়

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হলেও এসব ব্যবস্থার তথ্য সবসময় নির্ভুল নয়। ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, নজরদারি ক্যামেরা এমন ঘটনা শনাক্ত করেছে যা বাস্তবে ঘটেনি—যেমন শিশুর কান্না বা ঘরে কারও প্রবেশের ভুল সংকেত।

এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি সমস্যা। অভিভাবক যদি যন্ত্রের তথ্যকে নিজের চোখে দেখা বাস্তবতার চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করতে শুরু করেন, তাহলে প্রযুক্তি সহায়ক থাকার বদলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

শিশু বিশেষজ্ঞ রেবেকা ডায়মন্ডের উদ্বেগও এখানেই। তাঁর মতে, অতিরিক্ত মাত্রায় শিশুকে পর্যবেক্ষণ ও স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণের প্রবণতা অভিভাবকদের নিজেদের স্বাভাবিক বিচারবোধকে দুর্বল করে দিতে পারে। শিশুর ঘুমের প্রয়োজন বুঝতে সবসময় কোনো যন্ত্রের পরামর্শ দরকার হয় না; শিশুর আচরণ দেখেও অনেক কিছু বোঝা সম্ভব।

নজরদারির ইতিহাসও নতুন নয়

শিশুকে নজরদারির ধারণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ১৯৩২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক শিশুকে তার বাড়ির শয়নকক্ষ থেকে অপহরণের ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এর কয়েক বছর পর বাজারে আসে প্রথম দিকের বাণিজ্যিক শিশুনজরদারি যন্ত্র। এর উদ্দেশ্য ছিল শিশুর কান্না, আগুন কিংবা অনুপ্রবেশের মতো বিপদের খবর দ্রুত জানানো।

কিন্তু তখনকার প্রযুক্তি যেখানে শুধু বিপদের সংকেত দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, আজকের ব্যবস্থা তার চেয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। এখন শিশুর দৈনন্দিন জীবনকে পরিমাপ, বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে ধারণা করার সম্ভাবনাও প্রযুক্তির আওতায় আসছে।

শিশুর ব্যক্তিগত পরিসর কোথায়?

শিশু যখন খুব ছোট, তখন তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব অভিভাবকের। কিন্তু শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত পরিসর ও তথ্যের ওপর তার অধিকার কতটা থাকবে—এ প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এমন আবরণ তৈরির কথা বলছে, যার মাধ্যমে নজরদারি ক্যামেরাকে খরগোশ, ভালুক বা হাতির মতো খেলনার আদলে সাজানো যায়। উদ্দেশ্য হলো শিশুর কাছে যন্ত্রটিকে আরও আপন করে তোলা। কিন্তু শিশুটি যখন নিজের ঘরে ক্যামেরা থাকার অর্থ বুঝতে শুরু করবে, তখন সে আদৌ এই নজরদারিতে সম্মত হবে কি না—সেই সিদ্ধান্তও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Kids can bypass anything if they're clever enough!' How tech experts keep their  children safe online | Parents and parenting | The Guardian

সুবিধা ও নির্ভরতার মাঝখানে অভিভাবকত্ব

শিশুর নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোনো বিপদ দ্রুত শনাক্ত করা, দূর থেকে শিশুকে দেখা কিংবা ঘুমের ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া—এসব সুবিধা ব্যস্ত অভিভাবকদের জন্য মূল্যবান হতে পারে।

তবে সুবিধার সঙ্গে যদি অতিরিক্ত নির্ভরতা যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। শিশুর প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি ঘুম এবং প্রতিটি শব্দ যখন পরিসংখ্যানে পরিণত হয়, তখন অভিভাবকত্বও ধীরে ধীরে একটি তথ্যনির্ভর পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে পারে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। তারা শিশুর জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও আচরণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ভবিষ্যতে প্রায় প্রতিটি পরিবারের এমন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন, যা সন্তান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য দেবে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো প্রযুক্তি কতটা সক্ষম—তা নয়। প্রশ্ন হলো, সন্তানের দিকে তাকানোর বদলে আমরা কতটা সময় পর্দার দিকে তাকাচ্ছি?

একটি শিশুর ঘুমের হিসাব হয়তো যন্ত্র দিতে পারে, তার বুকের ওঠানামাও পর্দায় দেখা যেতে পারে। কিন্তু ঘুম ভেঙে শিশুর মুখে ফুটে ওঠা হাসি, তার চোখের ভাষা কিংবা বাবা-মাকে দেখে তার আনন্দ—এসব অনুভূতির মূল্য কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।

প্রযুক্তি তাই অভিভাবকের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু অভিভাবকের চোখ ও বিবেচনাবোধের বিকল্প হয়ে ওঠা উচিত কি না—সেই সিদ্ধান্তের সামনে এখন নতুন প্রজন্মের পরিবারগুলো দাঁড়িয়ে আছে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নতুন ব্যবসা—অ্যালেক্স টেলরের বদলে যাওয়ার গল্প

শিশুর ঘরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নজরদারি: নিরাপত্তা নাকি অতিরিক্ত নির্ভরতা?

১২:৫১:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

শিশুর ঘুম, শ্বাস-প্রশ্বাস, কান্না, নড়াচড়া—সবকিছুই এখন প্রযুক্তির চোখে ধরা পড়ছে। শিশুর যত্নে অভিভাবকদের সহায়তা করার নামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু শিশুর প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ কি সত্যিই অভিভাবকদের নিশ্চিন্ত করছে, নাকি ধীরে ধীরে তাদের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভরতা তৈরি করছে?

আধুনিক শিশুনজরদারি যন্ত্রগুলো এখন শুধু শিশুর কান্না শোনানো বা ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্যামেরা ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিশুর নড়াচড়া, চোখ খোলা ও বন্ধ করার সময়, ঘুমের ধরন, বুকের ওঠানামা এবং এমনকি কাশি বা ভাষা ও শারীরিক বিকাশের মতো বিষয়ও পর্যবেক্ষণের দিকে এগোচ্ছে।

শিশুর ঘুম থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যতথ্য

এই প্রযুক্তির জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ হলো অভিভাবকদের কাছে বিপুল পরিমাণ তথ্য পৌঁছে দেওয়া। একটি জনপ্রিয় শিশুনজরদারি ব্যবস্থায় শিশুর ঘুমের কার্যকারিতা, ঘুমিয়ে পড়তে কত সময় লাগছে এবং রাতে কতবার অভিভাবকের প্রয়োজন হয়েছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

অনেক অভিভাবকের কাছে এই তথ্য নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। সন্তান ঘুমাচ্ছে কি না, কতক্ষণ ঘুমাচ্ছে বা রাতে তার আচরণ কেমন—এসব বিষয়ে ধারণা পাওয়া তাদের উদ্বেগ কমাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, একটি শিশুর জীবনের এত সূক্ষ্ম তথ্য আদৌ কতটা প্রয়োজনীয়?

একজন অভিভাবকের অভিজ্ঞতায়, প্রথম সন্তানের ঘুমের প্রায় প্রতিটি রাতই যন্ত্রের মাধ্যমে রেকর্ড ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শুরুতে উদ্দেশ্য ছিল দূর থেকে সন্তানকে দেখে নেওয়া। পরে সেই যন্ত্রের বিপুল তথ্য ও বিশ্লেষণই অভিভাবকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের আগেই একই ধরনের যন্ত্র কেনার সিদ্ধান্তও যেন স্বাভাবিক হয়ে যায়।

নিরাপত্তার আশ্বাস, নাকি ভয়কে পুঁজি করা?

শিশুনজরদারি প্রযুক্তির বাজারে প্রতিযোগিতাও দ্রুত বাড়ছে। কিছু যন্ত্র শিশুর পায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হৃদস্পন্দন ও রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণের দাবি করে। আবার কিছু ব্যবস্থায় শিশুর মুখ ঢাকা পড়লে সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ঘুমের সময় নির্ধারণ, ঘুমের পূর্বাভাস কিংবা ব্যক্তিগত পরামর্শ দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, এসব ব্যবস্থা অভিভাবকদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে এবং শিশুর ঘুম ও নিরাপত্তার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এমনও দাবি করেছে যে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অভিভাবকেরা বছরে অতিরিক্ত কয়েক রাত ঘুমানোর সুযোগ পান।

তবে শিশু বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই প্রচারণা নিয়ে সতর্ক। তাদের আশঙ্কা, শিশুর সম্ভাব্য বিপদকে সামনে রেখে অতিরিক্ত সতর্কবার্তা ও ভয়ভিত্তিক প্রচারণা অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কোনো যন্ত্র ভুল সংকেত দিলে অভিভাবক এমনও ভাবতে পারেন যে শিশুটি শ্বাস নিচ্ছে না।

তথ্য যত বাড়ছে, উদ্বেগও তত

প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা। শিশুর ঘুম, শ্বাস-প্রশ্বাস, আচরণ, শব্দ, নড়াচড়া এবং বিকাশসংক্রান্ত তথ্য দীর্ঘ সময় ধরে সংগ্রহ করা হলে সেই বিপুল তথ্যের মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে শিশুর ভাষা ও শারীরিক বিকাশ পর্যবেক্ষণেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। এমনকি কোনো শিশুর আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শৈশবের নড়াচড়ার ধরন মিলিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করার সম্ভাবনাও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা তুলে ধরেছেন।

অর্থাৎ বিষয়টি আর শুধু ‘শিশু এখন ঘুমাচ্ছে কি না’—এই প্রশ্নে আটকে নেই। শিশুর জন্মের পর থেকে কৈশোর পর্যন্ত তার জীবনের ক্রমাগত তথ্যভাণ্ডার তৈরির একটি সম্ভাব্য কাঠামো গড়ে উঠছে।

Privacy Challenges of Smart Cameras: Edge AI as a Solution? - TechNexion -  Embedded Vision - USB , MIPI CSI-2 , GMSL2 , GIGE Vision

প্রযুক্তির ভুলও কম নয়

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হলেও এসব ব্যবস্থার তথ্য সবসময় নির্ভুল নয়। ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, নজরদারি ক্যামেরা এমন ঘটনা শনাক্ত করেছে যা বাস্তবে ঘটেনি—যেমন শিশুর কান্না বা ঘরে কারও প্রবেশের ভুল সংকেত।

এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি সমস্যা। অভিভাবক যদি যন্ত্রের তথ্যকে নিজের চোখে দেখা বাস্তবতার চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করতে শুরু করেন, তাহলে প্রযুক্তি সহায়ক থাকার বদলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

শিশু বিশেষজ্ঞ রেবেকা ডায়মন্ডের উদ্বেগও এখানেই। তাঁর মতে, অতিরিক্ত মাত্রায় শিশুকে পর্যবেক্ষণ ও স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণের প্রবণতা অভিভাবকদের নিজেদের স্বাভাবিক বিচারবোধকে দুর্বল করে দিতে পারে। শিশুর ঘুমের প্রয়োজন বুঝতে সবসময় কোনো যন্ত্রের পরামর্শ দরকার হয় না; শিশুর আচরণ দেখেও অনেক কিছু বোঝা সম্ভব।

নজরদারির ইতিহাসও নতুন নয়

শিশুকে নজরদারির ধারণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ১৯৩২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক শিশুকে তার বাড়ির শয়নকক্ষ থেকে অপহরণের ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এর কয়েক বছর পর বাজারে আসে প্রথম দিকের বাণিজ্যিক শিশুনজরদারি যন্ত্র। এর উদ্দেশ্য ছিল শিশুর কান্না, আগুন কিংবা অনুপ্রবেশের মতো বিপদের খবর দ্রুত জানানো।

কিন্তু তখনকার প্রযুক্তি যেখানে শুধু বিপদের সংকেত দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, আজকের ব্যবস্থা তার চেয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। এখন শিশুর দৈনন্দিন জীবনকে পরিমাপ, বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে ধারণা করার সম্ভাবনাও প্রযুক্তির আওতায় আসছে।

শিশুর ব্যক্তিগত পরিসর কোথায়?

শিশু যখন খুব ছোট, তখন তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব অভিভাবকের। কিন্তু শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত পরিসর ও তথ্যের ওপর তার অধিকার কতটা থাকবে—এ প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এমন আবরণ তৈরির কথা বলছে, যার মাধ্যমে নজরদারি ক্যামেরাকে খরগোশ, ভালুক বা হাতির মতো খেলনার আদলে সাজানো যায়। উদ্দেশ্য হলো শিশুর কাছে যন্ত্রটিকে আরও আপন করে তোলা। কিন্তু শিশুটি যখন নিজের ঘরে ক্যামেরা থাকার অর্থ বুঝতে শুরু করবে, তখন সে আদৌ এই নজরদারিতে সম্মত হবে কি না—সেই সিদ্ধান্তও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Kids can bypass anything if they're clever enough!' How tech experts keep their  children safe online | Parents and parenting | The Guardian

সুবিধা ও নির্ভরতার মাঝখানে অভিভাবকত্ব

শিশুর নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোনো বিপদ দ্রুত শনাক্ত করা, দূর থেকে শিশুকে দেখা কিংবা ঘুমের ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া—এসব সুবিধা ব্যস্ত অভিভাবকদের জন্য মূল্যবান হতে পারে।

তবে সুবিধার সঙ্গে যদি অতিরিক্ত নির্ভরতা যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। শিশুর প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি ঘুম এবং প্রতিটি শব্দ যখন পরিসংখ্যানে পরিণত হয়, তখন অভিভাবকত্বও ধীরে ধীরে একটি তথ্যনির্ভর পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে পারে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। তারা শিশুর জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও আচরণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ভবিষ্যতে প্রায় প্রতিটি পরিবারের এমন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন, যা সন্তান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য দেবে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো প্রযুক্তি কতটা সক্ষম—তা নয়। প্রশ্ন হলো, সন্তানের দিকে তাকানোর বদলে আমরা কতটা সময় পর্দার দিকে তাকাচ্ছি?

একটি শিশুর ঘুমের হিসাব হয়তো যন্ত্র দিতে পারে, তার বুকের ওঠানামাও পর্দায় দেখা যেতে পারে। কিন্তু ঘুম ভেঙে শিশুর মুখে ফুটে ওঠা হাসি, তার চোখের ভাষা কিংবা বাবা-মাকে দেখে তার আনন্দ—এসব অনুভূতির মূল্য কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।

প্রযুক্তি তাই অভিভাবকের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু অভিভাবকের চোখ ও বিবেচনাবোধের বিকল্প হয়ে ওঠা উচিত কি না—সেই সিদ্ধান্তের সামনে এখন নতুন প্রজন্মের পরিবারগুলো দাঁড়িয়ে আছে।