কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার প্রযুক্তি খাত ও শেয়ারবাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেও এর ভেতরে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতার ঝুঁকি। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবসার পাশাপাশি একে অন্যের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। সেই বিনিয়োগের মূল্য বাড়লে তাদের মুনাফাও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ক্রমেই অন্য প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার একটি বড় অংশ এখন পণ্য ও সেবা বিক্রি থেকে নয়, বরং অন্য প্রতিষ্ঠানে করা বিনিয়োগের মূল্যবৃদ্ধি থেকে আসছে। এতে প্রযুক্তি খাতের উত্থান যেমন দ্রুত হচ্ছে, তেমনি এই উত্থান উল্টো দিকে ঘুরলে ক্ষতির পরিমাণও বড় হতে পারে।
বিনিয়োগ থেকেই আসছে বিপুল মুনাফা
গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট এবং অ্যামাজনের সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফলে বিষয়টি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে। অ্যালফাবেটের ত্রৈমাসিক নিট আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি এসেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে করা বিনিয়োগের মূল্যবৃদ্ধি থেকে। এর বড় অংশই এসেছে ইলন মাস্কের মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সে অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন অংশের মূল্যবৃদ্ধি থেকে।
অন্যদিকে অ্যামাজনের নিট আয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ এসেছে বিনিয়োগজনিত মুনাফা থেকে। এর প্রধান উৎস ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকে অ্যামাজনের বিনিয়োগের মূল্য বেড়ে যাওয়া।

এ ধরনের মুনাফা অবশ্য হাতে নগদ অর্থ আসার অর্থ নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন শেয়ারের বাজারমূল্য একটি হিসাবকাল শেষে বেড়ে গেলে সেই মূল্যবৃদ্ধি হিসাবের খাতায় মুনাফা হিসেবে যুক্ত হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি শেয়ার বিক্রি না করলে সেই লাভ মূলত কাগজে-কলমের লাভ হিসেবেই থাকে। আবার শেয়ারের মূল্য কমে গেলে একইভাবে মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অর্থ ঘুরে আবার প্রযুক্তিতেই
এই পরিস্থিতিকে আর্থিক বিশ্লেষকেরা ক্রমবর্ধমান ‘চক্রাকার’ বিনিয়োগ ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, চিপ নির্মাতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারগুলো একে অন্যকে অর্থ দিচ্ছে, বিনিয়োগ করছে কিংবা ঋণ দিচ্ছে। সেই অর্থ আবার অনেক সময় ফিরে যাচ্ছে একই প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য, চিপ, তথ্যকেন্দ্র বা গণনাসেবা কেনার পেছনে।
অর্থাৎ যে অর্থ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ঢুকছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আবার সেই একই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ও সম্পদের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে প্রকৃত চাহিদা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার পাশাপাশি পারস্পরিক বিনিয়োগও বাজারের মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
সাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় বড় পরিবর্তন
বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত সাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা, অ্যাপল, টেসলা ও এনভিডিয়া—দ্বিতীয় প্রান্তিকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩১৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে।
এর মধ্যে প্রায় ১৩৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ মোট মুনাফার প্রায় ৪২ শতাংশ এসেছে বিনিয়োগের মূল্যবৃদ্ধি থেকে। আগের প্রান্তিকে এই অংশ ছিল মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ।
বিনিয়োগজনিত এই অতিরিক্ত মুনাফা বাদ দিলে সাত প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত লাভ আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত থাকত। অর্থাৎ সাম্প্রতিক মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে বিনিয়োগের মূল্যবৃদ্ধি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা এই হিসাবেই স্পষ্ট।
চিপ নির্মাতা এনভিডিয়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। অ্যানথ্রপি ও ওপেনএআইয়ের পাশাপাশি তথ্যকেন্দ্র পরিচালনাকারী কোরউইভ ও অ্যাপ্লায়েড ডিজিটালের মতো প্রতিষ্ঠানেও তাদের অংশীদারি রয়েছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে এনভিডিয়ার বিনিয়োগজনিত মুনাফা ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার।
স্পেসএক্সের ওঠানামায় অ্যালফাবেটের হিসাব বদলাতে পারে
অ্যালফাবেটের বিনিয়োগজনিত বিপুল মুনাফার বড় অংশ স্পেসএক্সের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৯৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের স্পেসএক্স শেয়ারের মালিক বলে জানিয়েছে।
স্পেসএক্সের শেয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে এর মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়। কিন্তু এরপর দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা দিয়েছে। জুনের শেষ দিনের তুলনায় শেয়ারটির মূল্য পরে প্রায় ১৭ শতাংশ কমে যায়। ফলে অ্যালফাবেটের বিনিয়োগের হিসাবেও ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান থেমে গেলে কী হবে?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখানেই। বিনিয়োগকারীরা যদি একসময় মনে করতে শুরু করেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে প্রত্যাশিত মাত্রার মুনাফা আসবে না, তাহলে বর্তমানে এই খাতে যে বিপুল অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে তার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
সেক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মূল্য কমতে পারে। তার প্রভাব পড়বে সেসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর ওপর। আবার সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম কমলে বৃহত্তর শেয়ারবাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একটি খাতের মন্দা অন্য খাতকে প্রভাবিত করার সুযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিনিয়োগ ও ব্যবসার ওপর আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরশীল। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজারে বড় ধরনের সংশোধন হলে তার অভিঘাত শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিতে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; সামগ্রিক অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারেও তা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাজারের উত্থানের আড়ালে তাই সতর্কতার বার্তা
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান মুনাফা আপাতদৃষ্টিতে শেয়ারবাজারের শক্তিশালী অবস্থানের প্রমাণ। কিন্তু সেই মুনাফার বড় অংশ যদি অন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে করা বিনিয়োগের মূল্যবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে বাজারের ভেতরের পারস্পরিক নির্ভরতাও বাড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিই বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারলে এই চক্র আরও শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু প্রত্যাশা ভেঙে গেলে একই চক্র উল্টো দিকেও কাজ করতে পারে। আর সেই কারণেই প্রযুক্তি খাতের বর্তমান উত্থান শুধু সম্ভাবনার গল্প নয়, ভবিষ্যৎ বাজারঝুঁকিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি জায়ান্টদের বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারের চক্রাকার ঝুঁকি—এই তিনের পারস্পরিক সম্পর্কই এখন বৈশ্বিক বাজারের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















