আন্তর্জাতিক অপেরার মঞ্চে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছেন আইরিশ গায়িকা তারা এরাউট। সালৎসবুর্গ উৎসবের মঞ্চে জিওয়াকিনো রসিনির অপেক্ষাকৃত কম পরিবেশিত হাস্যরসাত্মক অপেরা ‘ইল ভিয়াজ্জিও আ রেমস’-এ মাদামা কর্তেসি চরিত্রে অভিষেক হয়েছে তাঁর। চরিত্রটি যেমন হাস্যরস ও দ্রুতগতির অভিনয়ের দাবি রাখে, তেমনি এর মাধ্যমে নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও মঞ্চনৈপুণ্যও দেখানোর সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
মাদামা কর্তেসি একটি স্বাস্থ্যনিবাসের মালিক। ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অভিজাত অতিথিরা সেখানে আটকা পড়েছেন, কারণ ফ্রান্সের রেঁমসে রাজা দশম শার্লের অভিষেক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ঘোড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অতিথিদের সামলানো, নানা ধরনের বিপত্তি সামলে ব্যবসা চালানো এবং ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একসঙ্গে সামলে রাখার দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ওপর।
চরিত্রটির সঙ্গে নিজের পারিবারিক জীবনেরও যেন একটি মিল খুঁজে পান এরাউট। তাঁর বাবা-মা দুজনই পেশাদার রাঁধুনি। তাঁর ভাষায়, রান্না ও অপেরা—দুই পেশাতেই হাতে থাকা উপকরণ দিয়ে সর্বোচ্চটা বের করে আনতে হয়। এই বাস্তববোধই তাঁর শিল্পীজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
চেহারা নিয়ে সমালোচনা, পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শিল্পীরা
এরাউটের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁকে কঠিন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। ২০১৪ সালে ব্রিটেনের কয়েকটি বড় সংবাদপত্রের সমালোচকেরা রিশার্ড শ্ট্রাউসের ‘ডের রোজেনকাভালিয়ার’ অপেরায় অক্টাভিয়ান চরিত্রের জন্য তাঁর শারীরিক গড়নকে উপযুক্ত নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন।

কিন্তু সেই সমালোচনার বিরুদ্ধে সরব হন অপেরাজগতের বহু বিশিষ্ট শিল্পী। জেসি নরম্যান থেকে শুরু করে অ্যালিস কুট—অনেকেই স্পষ্ট করে দেন, একজন গায়কের সাফল্যের বিচার হওয়া উচিত তাঁর কণ্ঠ ও শিল্পমান দিয়ে, শরীরের গড়ন দিয়ে নয়। এমনকি সহমর্মিতার নিদর্শন হিসেবে মঞ্চের নেপথ্যে তাঁর জন্য মিষ্টি খাবারও পাঠিয়েছিলেন সহশিল্পীরা।
এরাউট মনে করেন, সেই ঘটনা ক্লাসিক্যাল সংগীতজগতে নারীদের নিয়ে একটি বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শিল্পীদের পারস্পরিক সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্যও কাজ করছেন
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপেরা অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত নাম হলেও নিজের অভিজ্ঞতা কেবল নিজের মধ্যে আটকে রাখতে চান না এরাউট। ২০২০ সালে তিনি ‘সেলিব্রেটিং দ্য ভয়েস’ নামে একটি পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু করেন। সেখানে নবীন গায়কদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, আলোচনা ও পরিবেশনার সুযোগ তৈরি করা হয়।
ডাবলিনের জাতীয় কনসার্ট ভবনেও এই কর্মসূচির বিভিন্ন আয়োজন হয়েছে। এরাউট আয়ারল্যান্ডের জাতীয় অপেরার পরিচালনা পর্ষদেও কাজ করেছেন এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন।
তাঁর দর্শন খুব সরল—জ্ঞান তখনই অর্থবহ, যখন তা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়।
মহামারির পর বদলে গেছে অপেরার জগত
তরুণ গায়কদের জন্য এরাউটের পরামর্শও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মতে, কেবল উচ্চমানের শিল্পচর্চা করলেই এখন আর যথেষ্ট নয়; শিল্পীদের নিজেদের পেশার বাস্তব দিক সম্পর্কেও জানতে হবে।
করোনাভাইরাস মহামারির পর অপেরার ব্যবসায়িক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। আগে অনেক প্রেক্ষাগৃহ তিন থেকে পাঁচ বছর আগেই শিল্পী ও পরিবেশনা নির্ধারণ করত। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট পরিবেশনার টিকিট বিক্রির ফলাফল দেখার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়। তাই গায়কদেরও বিভিন্ন ধরনের চরিত্র ও পরিবেশনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।
এরাউট নিজেও কর্মজীবনের শুরুতে জার্মানির বাভারিয়ান স্টেট অপেরার অপেরা স্টুডিওতে দুই বছর এবং পরে দলীয় শিল্পী হিসেবে আরও ১০ বছর কাজ করেছেন। সেই সময়ে ৪৯টি চরিত্রে প্রথমবারের মতো মঞ্চে ওঠার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।

একসময় দর্শকসারিতে বসেই মুগ্ধ হয়েছিলেন
সালৎসবুর্গের এবারের পরিবেশনায় তাঁর সঙ্গে রয়েছেন কিংবদন্তি রসিনি-শিল্পী চেচিলিয়া বার্তোলি। তাঁদের একসঙ্গে কাজ করা এরাউটের জন্য বিশেষ আবেগেরও বিষয়।
ডাবলিনে পড়াশোনার সময় জাতীয় কনসার্ট ভবনে দর্শকসেবিকার কাজ করতেন তিনি। সেখানেই একদিন বার্তোলির গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বহু বছর পর সেই শিল্পীর সঙ্গেই একই মঞ্চে দাঁড়ানোর সুযোগ তাঁর কাছে স্বপ্নপূরণের মতো।
এরাউট জানান, বার্তোলি তাঁকে সবসময় অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সমতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। প্রথম মহড়াতেই তিনি নতুন অলংকার ও নানা সৃষ্টিশীল ভাবনা নিয়ে হাজির হন, অথচ ব্যক্তিগত আলাপের সময় নতুন প্রজন্মের শিল্পীর সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেন যেন দুজন সমান মর্যাদার সহকর্মী।
আগামী দিনেও ব্যস্ততা
এরাউটের সামনে এখন আরও বড় কিছু কাজ অপেক্ষা করছে। আগামী মৌসুমে আয়ারল্যান্ডের জাতীয় সিম্ফনি অর্কেস্ট্রার সঙ্গে গুস্তাভ মাহলারের দ্বিতীয় সিম্ফনিতে সোপ্রানো অংশে গান করবেন তিনি।
২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিলানের লা স্কালা মঞ্চে প্রথমবারের মতো তাঁর অভিষেক হবে। মোৎসার্টের ‘দন জিওভান্নি’ অপেরায় ডোনা এলভিরা চরিত্রে দেখা যাবে তাঁকে। একই চরিত্রে পরবর্তী সময়ে প্যারিসের জাতীয় অপেরাতেও ফিরবেন তিনি।
এ ছাড়া মার্চে আয়ারল্যান্ডের চেম্বার অর্কেস্ট্রার সঙ্গে কোনো সঞ্চালক ছাড়াই প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ কনসার্টে গান করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেই পরিবেশনায় হ্যান্ডেল থেকে শুরু করে লিলি বুলাঞ্জে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের সংগীত উঠে আসবে।
যা আছে, তা দিয়েই সেরাটা দেওয়ার দর্শন
চেহারা নিয়ে কটাক্ষ, পেশাগত অনিশ্চয়তা কিংবা পরিবর্তিত শিল্পবাজার—কোনোটিই এরাউটকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও বাস্তববাদী করেছে।
তাঁর নিজের কথাতেই এরাউটের শিল্পীজীবনের দর্শন ধরা পড়ে—প্রতিদিন হাতে যা থাকে, তা দিয়েই সর্বোচ্চটা করার চেষ্টা করতে হয়। আর সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই তিনি এখন শুধু নিজের জায়গা ধরে রাখছেন না, তাঁর পরের প্রজন্মের শিল্পীদের জন্যও পথ তৈরি করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















