কে-পপে শিল্পীদের ভূমিকা এখন আর শুধু মঞ্চে গান গাওয়া, নাচ করা কিংবা নির্ধারিত পরিবেশনা উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নিজেদের গান লেখা, সুর ও সংগীত প্রযোজনা, নৃত্য পরিকল্পনা এবং পুরো প্রকল্পের ভাবনা তৈরিতে সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন অনেক শিল্পী। হাইব লেবেলসের তিন শিল্পী ইওনজুন, ডিনো ও ইভানের সাম্প্রতিক একক কর্মকাণ্ড সেই পরিবর্তনেরই স্পষ্ট উদাহরণ।
তিন শিল্পীর তিন রকমের সৃজনশীল যাত্রা
টুমরো এক্স টুগেদারের ইওনজুন, সেভেনটিনের ডিনো এবং সাবেক এনহাইপেন সদস্য ইভান—তিনজনই নিজেদের একক কাজের ক্ষেত্রে শিল্পী হিসেবে আরও স্বাধীন হয়ে উঠছেন। গান, নৃত্য ও সংগীত প্রযোজনায় সরাসরি যুক্ত হয়ে তাঁরা নিজেদের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলছেন।
ইওনজুনের রেকর্ড সাফল্য
কে-পপের অন্যতম জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিত ইওনজুন গত জুলাইয়ে প্রকাশ করেন তাঁর দ্বিতীয় ক্ষুদ্র অ্যালবাম ‘নো লেবেলস: পার্ট টু’। অ্যালবামটির সংগীত ও পরিবেশনা তৈরিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। নামগানের নৃত্য পরিকল্পনায় সহায়তার পাশাপাশি অন্য গানগুলোর কথাও লিখেছেন তিনি।
প্রকাশের প্রথম সপ্তাহেই অ্যালবামটি ৭ লাখ ৩৮ হাজার ৭২ কপি বিক্রি হয়। চলতি বছরে কোনো কোরীয় একক শিল্পীর অ্যালবামের ক্ষেত্রে এটি ছিল সর্বোচ্চ প্রথম সপ্তাহের বিক্রি।
আন্তর্জাতিক সাফল্যও আসে দ্রুত। বিলবোর্ডের দুইশ গানের অ্যালবাম তালিকায় অ্যালবামটি ১৬ নম্বরে উঠে আসে, যা চলতি বছরে কোনো কোরীয় একক শিল্পীর অ্যালবামের সর্বোচ্চ অবস্থান।
এই সাফল্যের পর উত্তর আমেরিকাতেও নিজের উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন ইওনজুন। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় সকালের টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’র গ্রীষ্মকালীন কনসার্ট সিরিজ এবং জেড১০০ গ্রীষ্মকালীন অনুষ্ঠানে তিনি পরিবেশন করেন। এরপর লস অ্যাঞ্জেলেসের ঐতিহাসিক ট্রুবাডুর মঞ্চে একক কনসার্টেও নেতৃত্ব দেন তিনি।
ডিনোর নতুন পরিচয় পিচোলিন
সেভেনটিনের ডিনো আবার একক সংগীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। নিজের সংগীতসত্তার জন্য তিনি তৈরি করেছেন নতুন চরিত্র ‘পিচোলিন’। এই পরিচয়ের মাধ্যমে গত ৩ আগস্ট প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম ক্ষুদ্র অ্যালবাম ‘গিলবোর্ড’।
অ্যালবামটিতে ইলেকট্রনিক নৃত্যসংগীত, ট্র্যাপ, সিটি পপ ও নিউ জ্যাক সুইংয়ের সঙ্গে কোরীয় সংস্কৃতির প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাসকে একত্র করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে চরিত্রটিকে পৌঁছে দিতে ডিনো জনপ্রিয় কোরীয় অনুষ্ঠান ‘কোরিয়া সিংস’-এও উপস্থিত হন।
অ্যালবামের প্রতিটি গানেই ডিনোর অবদান রয়েছে। নামগান ‘পার্টি রক রক’-এর পাশাপাশি ‘সিনসিয়ারলি’, ‘লাভ সিক’ এবং ‘মি-চিও মি-চিও’ গানগুলোতেও তিনি সৃজনশীলভাবে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন অভিজ্ঞ সংগীতকর্মীর সঙ্গে কাজ করে অ্যালবামটির বৈচিত্র্যও বাড়িয়েছেন তিনি।
সেভেনটিনের সব সদস্যকে নিয়ে ‘পার্টি রক রক’ গানের নৃত্যচিত্র প্রকাশের পর সেটি দ্রুত ১ কোটি ২০ লাখের বেশি বার দেখা হয়। এতে ডিনোর একক পরিচয়ের পাশাপাশি দলটির জনপ্রিয়তারও বড় প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে।
ইভানের একক যাত্রায় প্রযোজনার বড় ভূমিকা
তৃতীয় শিল্পী ইভান আগামী সেপ্টেম্বরে প্রকাশ করতে যাচ্ছেন তাঁর প্রথম ক্ষুদ্র অ্যালবাম ‘ডেথ অব মি’। গত জুনে প্রথম একক গান ‘রাইড অর ডাই’ প্রকাশের পর এটি হবে তাঁর পরবর্তী বড় প্রকল্প।
অ্যালবামের আটটি গানের সবগুলোর কথা লিখেছেন ইভান এবং সাতটি গানের সুর তৈরিতে অংশ নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, পুরো অ্যালবামের সংগীত প্রযোজনার দায়িত্বও তিনি নিজেই সামলেছেন। এতে গায়ক হিসেবে তাঁর পরিচয়ের পাশাপাশি গীতিকার ও সংগীত প্রযোজক হিসেবেও তাঁর সক্ষমতা ফুটে উঠছে।
প্রথম একক গানেই আন্তর্জাতিক সাফল্য
‘রাইড অর ডাই’ গানটি প্রকাশের পর নয়টি দেশ ও অঞ্চলের আইটিউনসের শীর্ষ গানের তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করে। চীনের টেনসেন্ট মিউজিকের সাপ্তাহিক কোরীয় গানের তালিকাতেও গানটি শীর্ষে ওঠে। পাশাপাশি ইউটিউবের দৈনিক বৈশ্বিক জনপ্রিয় সংগীতচিত্রের তালিকায় এটি নবম অবস্থান অর্জন করে।
ইভান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যামি জাদুঘরের ‘স্পটলাইট’ পরিবেশনা ও সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানেও অংশ নেন। আগামী রোববার হংকংয়ের কাই তাক প্রধান স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ তিমিইলাইভ আন্তর্জাতিক সংগীত পুরস্কারেও তাঁর পরিবেশনের কথা রয়েছে। এ ছাড়া ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ কে-ওয়ার্ল্ড ড্রিম পুরস্কারেও উপস্থিত থাকবেন তিনি।
একক সংগীতে বদলে যাচ্ছে কে-পপের ধারা
ইওনজুন, ডিনো ও ইভানের কাজ শুধু তিনটি আলাদা একক প্রকল্প নয়; এগুলো কে-পপের বৃহত্তর পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে যেখানে অনেক শিল্পী মূলত নির্ধারিত গান ও পরিবেশনা উপস্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন, এখন তাঁরা গান লেখা, সুর, নৃত্য পরিকল্পনা ও সংগীত প্রযোজনার মতো সৃজনশীল কাজেও সরাসরি অংশ নিচ্ছেন।
ফলে একক শিল্পী হিসেবে তাঁদের নিজস্ব পরিচয় আরও শক্তিশালী হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছেও কে-পপ শিল্পীদের বহুমাত্রিক প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা কে-পপের একক সংগীতকে আরও ব্যক্তিনির্ভর ও সৃজনশীল করে তুলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















