০৪:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
তেল কি আবার ১০০ ডলারে উঠবে? মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে সরবরাহ ঝুঁকিতে বাড়ছে দাম হামসদৃশ উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা ৯২২ ইউরোপে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের আশঙ্কা, তীব্র দাবদাহে ধস নামছে কৃষি উৎপাদনে ২০ বছর পূর্তিতে নতুন গান নিয়ে ফিরছে বিগব্যাং বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী ছবি ‘দ্য টেবিল: ডে অ্যান্ড নাইট’ বিলবোর্ডে নতুন ইতিহাস গড়ল স্ট্রে কিডস, ‘দিস অ্যান্ড দ্যাট’ উঠল ৩৮ নম্বরে ইওনজুন, ডিনো থেকে ইভান—একক সংগীতে নিজেদের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণে কে-পপ তারকারা রূপকথার গল্পে ১৭ গানের মহাকাব্য, নতুন অ্যালবামে ওয়ানউইয়ের নতুন অধ্যায় চার বছর পর জেওয়াইপি-ঘনিষ্ঠ নতুন কন্যাদল ‘আওয়ার বার্থডে’র অভিষেক গুয়াহাটিতে ফের বন্যা, চিড়িয়াখানার দেয়াল ধসে আতঙ্ক

মার্কিন বিমানবাহী রণতরীতে চরম সংকট: খাবার-সরবরাহের ঘাটতি, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছেন নাবিকরা

ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণুচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন সমুদ্রে অবস্থান, সরবরাহ সংকট, নিম্নমানের খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি এবং নাবিকদের মানসিক অবসাদ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অভিযোগের কারণে নাবিকদের পরিবারের পাশাপাশি মার্কিন আইনপ্রণেতারাও প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে জবাবদিহি দাবি করেছেন।

রণতরীটি প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও সদস্য বহনে সক্ষম। একই সঙ্গে এতে সর্বোচ্চ প্রায় ৯০টি যুদ্ধবিমান রাখা যায় এবং পূর্ণ সক্ষমতায় দিনে শতাধিক যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করতে পারে। গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে যাত্রা করা জাহাজটি ইতোমধ্যে ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েনে রয়েছে। এর মধ্যে ২০০ দিনের বেশি সময় টানা সমুদ্রে কাটিয়েছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর স্বাভাবিক মোতায়েনের তুলনায় অত্যন্ত দীর্ঘ।

নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি

নাবিক ও তাঁদের পরিবারের অভিযোগ শুধু দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার স্বাভাবিক অস্বস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাবান, দাঁত মাজার সামগ্রী ও শরীরের দুর্গন্ধ প্রতিরোধের সামগ্রীর মতো মৌলিক জিনিসের ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও গরম ও নিরাপদ পানির সমস্যা, কোথাও নষ্ট শৌচাগার ও অনিয়মিত কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থার কথাও জানা গেছে।

US warns Iran it will step up economic pressure; two more ships attacked in  Hormuz | The Business Standard

চিঠিপত্র ও পরিবারের পাঠানো প্যাকেট পৌঁছাতেও দীর্ঘ বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে। কিছু পারিবারিক প্যাকেট মাসের পর মাস আটকে থাকার কথাও বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি ছত্রাক, নষ্ট পাইপলাইন এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে জাহাজের বিভিন্ন অংশে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।

খাবার নিয়েও সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক মার্কিন আইনপ্রণেতার দাবি, কোনো কোনো সময় নাবিকদের খাবার নেমে এসেছে মাত্র আধা কাপ ভাত ও দুটি রুটির টুকরোয়। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আগে খাদ্যসংকটের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।

মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা

দীর্ঘ সময়ের টানা দায়িত্ব ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও চাপ ফেলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

৩ আগস্ট আব্রাহাম লিংকন থেকে এক নাবিক সমুদ্রে পড়ে যান। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁকে উদ্ধার করা হয়। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে। পরে ওই নাবিককে চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও গুরুতর তথ্য সামনে এসেছে। এক নাবিকের স্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী প্রচণ্ড মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং জাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আরেক নাবিক তাঁর স্ত্রীকে এমন বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে তিনি পরদিন ঘুম থেকে না উঠলেই ভালো হতো।

নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। তাঁদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত গুরুতর দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

তবে মার্কিন নৌবাহিনী আত্মহত্যার প্রবণতা বা প্রচেষ্টার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

উত্তেজনা থেকে সহিংসতার গুঞ্জন

জাহাজটির ভেতরে উত্তেজনা এতটাই বেড়েছে যে সেখানে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের একটি অভিযোগও ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের একটি সংবাদমাধ্যমের দাবি ছিল, দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে ক্ষোভের জেরে জাহাজে কয়েকজন মার্কিন নৌসদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন।

US deploys aircraft carrier as Iran warns against attack - The Economic  Times

তবে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, ইরানের যুদ্ধ চলাকালে আব্রাহাম লিংকনে কোনো নৌসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।

ইরানের হামলার চাপ

আব্রাহাম লিংকন শুধু দীর্ঘ মোতায়েনের চাপেই নেই; যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব ঝুঁকিও তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

ইরান বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছে, তারা রণতরীটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান পাঠিয়েছে। মার্চের শুরুতে তেহরান দাবি করে, চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রণতরীটির দিকে ছোড়া হয়েছিল। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জাহাজটির কাছাকাছিও পৌঁছায়নি।

পরবর্তী সময়ে ইরান আরও কয়েক দফা হামলার দাবি করে। কোথাও ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমানের হামলা, কোথাও রসদ সরবরাহ কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাতের কথা বলা হয়েছে। ওয়াশিংটন এসব দাবির বড় অংশ প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে মার্কিন বাহিনী যে দীর্ঘ ও তীব্র সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তার মাত্রা নিয়ে সন্দেহ নেই। মার্কিন সামরিক হিসাব অনুযায়ী, অভিযানের সময় প্রায় ১০ হাজার উড্ডয়ন পরিচালিত হয়েছে এবং প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে।

আইনপ্রণেতাদের প্রশ্নের মুখে প্রতিরক্ষা দপ্তর

রণতরীটির পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসেও উদ্বেগ বাড়ছে। সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির এক সদস্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান অবস্থা এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।

আরেক সিনেটর রণতরীটি পরিদর্শনে দ্বিদলীয় কংগ্রেসীয় প্রতিনিধিদল পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিরক্ষা দপ্তরের আশ্বাসের বাইরে সরাসরি পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।

এদিকে বিরোধী দলের শীর্ষ এক সিনেট নেতা প্রতিরক্ষা দপ্তরের ব্যর্থতার জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করেছেন এবং তাঁর পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।

প্রতিরক্ষা দপ্তরের বক্তব্য

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জাহাজটির খাবার ও জীবনযাত্রার দুরবস্থার অভিযোগকে অতিরঞ্জিত ও ভুলভাবে উপস্থাপিত বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিটি জাহাজ, নাবিকদল ও অধিনায়ককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন যে নাবিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে, সেটিও অস্বীকার করা হয়নি।

এদিকে আব্রাহাম লিংকনের জায়গা নিতে আরেকটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কিছুটা দুর্বল হতে পারে, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা চলার সময়ে।

সামনে বড় প্রশ্ন

মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ বলছে, আব্রাহাম লিংকন এখনও তার দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি সক্ষম। ইরানও রণতরীটিকে ধ্বংস বা অচল করে দিয়েছে—এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনো নেই।

কিন্তু দীর্ঘ আট মাসের বেশি সময় ধরে চলা মোতায়েন রণতরীটির সরবরাহব্যবস্থা ও নাবিকদের ওপর যে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। পর্যাপ্ত খাবার, বিশ্রাম ও মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

বিশেষ করে তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযান চালিয়েও যদি একটি বিশাল ও আধুনিক মার্কিন রণতরীর নাবিকদের মনোবল ও সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সামরিক সংঘাত টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

তেল কি আবার ১০০ ডলারে উঠবে? মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে সরবরাহ ঝুঁকিতে বাড়ছে দাম

মার্কিন বিমানবাহী রণতরীতে চরম সংকট: খাবার-সরবরাহের ঘাটতি, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছেন নাবিকরা

০৩:৫৭:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণুচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন সমুদ্রে অবস্থান, সরবরাহ সংকট, নিম্নমানের খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি এবং নাবিকদের মানসিক অবসাদ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অভিযোগের কারণে নাবিকদের পরিবারের পাশাপাশি মার্কিন আইনপ্রণেতারাও প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে জবাবদিহি দাবি করেছেন।

রণতরীটি প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও সদস্য বহনে সক্ষম। একই সঙ্গে এতে সর্বোচ্চ প্রায় ৯০টি যুদ্ধবিমান রাখা যায় এবং পূর্ণ সক্ষমতায় দিনে শতাধিক যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করতে পারে। গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে যাত্রা করা জাহাজটি ইতোমধ্যে ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েনে রয়েছে। এর মধ্যে ২০০ দিনের বেশি সময় টানা সমুদ্রে কাটিয়েছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর স্বাভাবিক মোতায়েনের তুলনায় অত্যন্ত দীর্ঘ।

নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি

নাবিক ও তাঁদের পরিবারের অভিযোগ শুধু দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার স্বাভাবিক অস্বস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাবান, দাঁত মাজার সামগ্রী ও শরীরের দুর্গন্ধ প্রতিরোধের সামগ্রীর মতো মৌলিক জিনিসের ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও গরম ও নিরাপদ পানির সমস্যা, কোথাও নষ্ট শৌচাগার ও অনিয়মিত কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থার কথাও জানা গেছে।

US warns Iran it will step up economic pressure; two more ships attacked in  Hormuz | The Business Standard

চিঠিপত্র ও পরিবারের পাঠানো প্যাকেট পৌঁছাতেও দীর্ঘ বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে। কিছু পারিবারিক প্যাকেট মাসের পর মাস আটকে থাকার কথাও বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি ছত্রাক, নষ্ট পাইপলাইন এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে জাহাজের বিভিন্ন অংশে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।

খাবার নিয়েও সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক মার্কিন আইনপ্রণেতার দাবি, কোনো কোনো সময় নাবিকদের খাবার নেমে এসেছে মাত্র আধা কাপ ভাত ও দুটি রুটির টুকরোয়। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আগে খাদ্যসংকটের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।

মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা

দীর্ঘ সময়ের টানা দায়িত্ব ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও চাপ ফেলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

৩ আগস্ট আব্রাহাম লিংকন থেকে এক নাবিক সমুদ্রে পড়ে যান। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁকে উদ্ধার করা হয়। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে। পরে ওই নাবিককে চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও গুরুতর তথ্য সামনে এসেছে। এক নাবিকের স্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী প্রচণ্ড মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং জাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আরেক নাবিক তাঁর স্ত্রীকে এমন বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে তিনি পরদিন ঘুম থেকে না উঠলেই ভালো হতো।

নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। তাঁদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত গুরুতর দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

তবে মার্কিন নৌবাহিনী আত্মহত্যার প্রবণতা বা প্রচেষ্টার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

উত্তেজনা থেকে সহিংসতার গুঞ্জন

জাহাজটির ভেতরে উত্তেজনা এতটাই বেড়েছে যে সেখানে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের একটি অভিযোগও ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের একটি সংবাদমাধ্যমের দাবি ছিল, দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে ক্ষোভের জেরে জাহাজে কয়েকজন মার্কিন নৌসদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন।

US deploys aircraft carrier as Iran warns against attack - The Economic  Times

তবে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, ইরানের যুদ্ধ চলাকালে আব্রাহাম লিংকনে কোনো নৌসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।

ইরানের হামলার চাপ

আব্রাহাম লিংকন শুধু দীর্ঘ মোতায়েনের চাপেই নেই; যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব ঝুঁকিও তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

ইরান বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছে, তারা রণতরীটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান পাঠিয়েছে। মার্চের শুরুতে তেহরান দাবি করে, চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রণতরীটির দিকে ছোড়া হয়েছিল। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জাহাজটির কাছাকাছিও পৌঁছায়নি।

পরবর্তী সময়ে ইরান আরও কয়েক দফা হামলার দাবি করে। কোথাও ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমানের হামলা, কোথাও রসদ সরবরাহ কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাতের কথা বলা হয়েছে। ওয়াশিংটন এসব দাবির বড় অংশ প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে মার্কিন বাহিনী যে দীর্ঘ ও তীব্র সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তার মাত্রা নিয়ে সন্দেহ নেই। মার্কিন সামরিক হিসাব অনুযায়ী, অভিযানের সময় প্রায় ১০ হাজার উড্ডয়ন পরিচালিত হয়েছে এবং প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে।

আইনপ্রণেতাদের প্রশ্নের মুখে প্রতিরক্ষা দপ্তর

রণতরীটির পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসেও উদ্বেগ বাড়ছে। সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির এক সদস্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান অবস্থা এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।

আরেক সিনেটর রণতরীটি পরিদর্শনে দ্বিদলীয় কংগ্রেসীয় প্রতিনিধিদল পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিরক্ষা দপ্তরের আশ্বাসের বাইরে সরাসরি পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।

এদিকে বিরোধী দলের শীর্ষ এক সিনেট নেতা প্রতিরক্ষা দপ্তরের ব্যর্থতার জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করেছেন এবং তাঁর পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।

প্রতিরক্ষা দপ্তরের বক্তব্য

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জাহাজটির খাবার ও জীবনযাত্রার দুরবস্থার অভিযোগকে অতিরঞ্জিত ও ভুলভাবে উপস্থাপিত বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিটি জাহাজ, নাবিকদল ও অধিনায়ককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন যে নাবিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে, সেটিও অস্বীকার করা হয়নি।

এদিকে আব্রাহাম লিংকনের জায়গা নিতে আরেকটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কিছুটা দুর্বল হতে পারে, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা চলার সময়ে।

সামনে বড় প্রশ্ন

মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ বলছে, আব্রাহাম লিংকন এখনও তার দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি সক্ষম। ইরানও রণতরীটিকে ধ্বংস বা অচল করে দিয়েছে—এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনো নেই।

কিন্তু দীর্ঘ আট মাসের বেশি সময় ধরে চলা মোতায়েন রণতরীটির সরবরাহব্যবস্থা ও নাবিকদের ওপর যে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। পর্যাপ্ত খাবার, বিশ্রাম ও মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

বিশেষ করে তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযান চালিয়েও যদি একটি বিশাল ও আধুনিক মার্কিন রণতরীর নাবিকদের মনোবল ও সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সামরিক সংঘাত টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।