০২:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
আকিকো ইয়ানো ঃজ্যাজ, পপ ও চলচ্চিত্রের ভুবনে এক জীবন এলিফ্যান্ট রোডে শপিংব্যাগে ককটেল সদৃশ ৪ বস্তু, ঘিরে রেখেছে পুলিশ চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নতুন ব্যবসা—অ্যালেক্স টেলরের বদলে যাওয়ার গল্প বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক সুবিধা স্পষ্ট করল এনবিআর শ্রীলঙ্কায় ৩ কেজির বেশি ওজনের বিশাল মূত্রথলির পাথর অপসারণ, রেকর্ডের দাবি নোনতা বাদাম ও চকোলেটের খসখসে কুকি রুটি-বিদ্যুৎহীন কিউবা: আর কতটা সহ্য করতে পারবেন সাধারণ মানুষ? মঞ্চে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন তারা এরাউট: সমালোচনা পেরিয়ে রসিনির অপেরায় নতুন সাফল্য সন্ত ফ্রান্সিসের চরিত্রে ডুব দিতে দুই মাস সন্ন্যাসীদের সঙ্গে শিল্পীর জীবন প্রযুক্তি জায়ান্টদের মুনাফায় নতুন ঝুঁকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজার কি ‘চক্রাকার’ ফাঁদে?

রুটি-বিদ্যুৎহীন কিউবা: আর কতটা সহ্য করতে পারবেন সাধারণ মানুষ?

কিউবার মানুষ যেন এখন অপেক্ষার এক অন্তহীন চক্রে আটকে আছেন। দিনের রুটির বরাদ্দ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা, অতিরিক্ত ভিড়ের বাস, বিদেশে যাওয়ার অনুমতি—সবকিছুর জন্যই তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মহামারি-পরবর্তী গভীর অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠেছে অপেক্ষা

কিউবার বহু পরিবার বিদেশে থাকা স্বজনদের পাঠানো খাবার ও সাধারণ ওষুধের অপেক্ষায় থাকে। বিদ্যুৎ এলেও তা অনেক সময় দিনে মাত্র এক-দুই ঘণ্টার জন্য ফিরে আসে। প্রচণ্ড গরমে সামান্য বাতাসের আশায় মানুষ রাত কাটান, যাতে অন্তত শিশুরা কয়েক ঘণ্টা ঘুমাতে পারে।

দেশটির সরকার পরিস্থিতিকে সামাল দিতে নানা উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে। প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলার জন্য ‘সৃজনশীল প্রতিরোধের’ কথা বলছেন। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ যে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তা আর আড়াল করা কঠিন।

পরিবর্তনের আশায় নানা হিসাব

কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সম্ভাবনা সামনে এসেছে। কেউ মনে করছেন কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটতে পারে। কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে আলোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা দেখছেন। আবার সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

Some Cubans depend on sugar water as food shortages bite

কিউবার বাইরে বসবাসকারী অনেকেই ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট সরকারগুলোর পতনের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করছেন। তবে সেই সময়ের সঙ্গে কিউবার বাস্তবতার বড় পার্থক্য রয়েছে। পূর্ব ইউরোপে শাসকগোষ্ঠীর ভেতর বিভাজন এবং শক্তিশালী জনভিত্তিসম্পন্ন বিরোধী আন্দোলন ছিল। কিউবায় এখনো নিরাপত্তা কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী এবং দমন-পীড়নের কারণে বিরোধীদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ সীমিত।

দেশ ছাড়ছেন লাখ লাখ মানুষ

অভ্যন্তরীণ সংকটের আরেকটি বড় পরিণতি হলো ব্যাপক অভিবাসন। ২০২০ সালের পর থেকে প্রায় ২০ লাখ কিউবান দ্বীপটি ছেড়ে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দেশের ভেতরে ব্যাপক জনসমাবেশের পরিবর্তে মানুষের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সাল থেকে কিউবানদের প্রবেশ কার্যত কঠোরভাবে সীমিত করায় অনেক অভিবাসী এখন অন্য গন্তব্যের দিকে যাচ্ছেন। এতে দেশের ভেতরের অসন্তোষ থাকলেও তা সরাসরি সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে না।

রাজপথে বাড়ছে ক্ষোভ

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত নয়। সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর বিভিন্ন এলাকায় সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। রাতে অনেক এলাকায় হাঁড়ি-পাতিল পিটিয়ে প্রতিবাদ এবং জ্বলন্ত আবর্জনা দিয়ে রাস্তা বন্ধ করার ঘটনা ঘটছে।

সরকারের একটি টেলিভিশন ব্রিফিংয়ে ভুল করে প্রদর্শিত একটি স্লাইডেও কর্মকর্তাদের সামাজিক বিস্ফোরণের আশঙ্কার কথা উঠে আসে। অর্থাৎ প্রশাসনের ভেতরেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আরও বাড়ছে

Cubans say their focus in on scarcity amid news about China

কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। মার্কিন প্রশাসন দেশটির নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক কমানোর মতো দাবি জানিয়েছে।

কিউবা এসব দাবিতে বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে অনেক বিদেশি কোম্পানি কিউবা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

জুনে কিউবার পক্ষ থেকে অর্থনীতি কিছুটা উদার করার উদ্যোগ এবং জুলাইয়ে আলোচিত রাজনৈতিক বন্দি শিল্পী লুইস মানুয়েল ওতেরো আলকান্তারার মুক্তিও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।

সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিউবাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা বেড়েছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে হাভানার গোয়েন্দা সম্পর্ক, ইরান থেকে চালকবিহীন বিমান সংগ্রহের অভিযোগ এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতায় কিউবার ভূমিকার মতো বিষয় সামনে আনা হচ্ছে।

কিউবার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মার্কিন আইনি পদক্ষেপও সামরিক বা কঠোর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা বাড়িয়েছে। তবে কিউবায় সামরিক অভিযান হলে তা দেশটির জন্য নতুন ও গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।

১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। পরবর্তী চার বছরের দখলদারিত্বের পর যে কিউবান প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল, সেটি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে ছিল। সেই ইতিহাসের কারণে নতুন কোনো মার্কিন হস্তক্ষেপ কিউবার মানুষের কাছে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে।

Soaring international prices aggravate Cuban food crisis | Reuters

‘বন্ধুত্বপূর্ণ দখল’ কি নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দখল’-এর কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন। এরই মধ্যে নিষেধাজ্ঞার কারণে কিউবার বড় বড় হোটেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অংশীদার সরে যাওয়ায় দেশটির সম্পদের মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো কম দামে কিউবার সম্পদ কিনে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

কিন্তু সামরিক হস্তক্ষেপ করলেই যে কিউবায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বরং নতুন কোনো ক্ষমতাকেন্দ্র, অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী ও বিদেশি প্রভাবের সমন্বয়ে ভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

অপেক্ষার ভার সাধারণ মানুষের

এই মুহূর্তে এসব সম্ভাবনার বেশির ভাগই বাস্তবতার চেয়ে অনুমানের পর্যায়ে রয়েছে। কিউবার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে আগ্রহী নয়। কারণ বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার অর্থ হতে পারে বর্তমান শাসনব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল করে দেওয়া।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও কিউবায় নতুন করে বড় ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক অভিযানে জড়ানোর ঝুঁকি নিতে দ্বিধায় রয়েছে। ইরান সংঘাতের মতো অন্য আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যেই কিউবায় নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন প্রকল্প শুরু করা মার্কিন প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনও সেই হিসাবকে আরও জটিল করছে।

ফলে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে আছে। দুই পক্ষই চাইছে, অন্য পক্ষ আগে বড় কোনো ছাড় দিক।

কিন্তু এই অপেক্ষার সময় সবার জন্য সমান নয়। সরকার চাইলে আরও অপেক্ষা করতে পারে, রাজনৈতিক হিসাব কষতে পারে, নতুন কৌশল নিতে পারে। সাধারণ কিউবান তা পারেন না। তারা অনির্দিষ্টকাল খাবার, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে পারবেন না। কিউবার সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে সেই সাধারণ মানুষকেই, যারা বছরের পর বছর ধরে শুধু অপেক্ষা করেই যাচ্ছেন।

In Cuba, families fear shortages will worsen as coronavirus affects the  economy

 

জনপ্রিয় সংবাদ

আকিকো ইয়ানো ঃজ্যাজ, পপ ও চলচ্চিত্রের ভুবনে এক জীবন

রুটি-বিদ্যুৎহীন কিউবা: আর কতটা সহ্য করতে পারবেন সাধারণ মানুষ?

০১:২৪:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

কিউবার মানুষ যেন এখন অপেক্ষার এক অন্তহীন চক্রে আটকে আছেন। দিনের রুটির বরাদ্দ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা, অতিরিক্ত ভিড়ের বাস, বিদেশে যাওয়ার অনুমতি—সবকিছুর জন্যই তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মহামারি-পরবর্তী গভীর অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠেছে অপেক্ষা

কিউবার বহু পরিবার বিদেশে থাকা স্বজনদের পাঠানো খাবার ও সাধারণ ওষুধের অপেক্ষায় থাকে। বিদ্যুৎ এলেও তা অনেক সময় দিনে মাত্র এক-দুই ঘণ্টার জন্য ফিরে আসে। প্রচণ্ড গরমে সামান্য বাতাসের আশায় মানুষ রাত কাটান, যাতে অন্তত শিশুরা কয়েক ঘণ্টা ঘুমাতে পারে।

দেশটির সরকার পরিস্থিতিকে সামাল দিতে নানা উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে। প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলার জন্য ‘সৃজনশীল প্রতিরোধের’ কথা বলছেন। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ যে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তা আর আড়াল করা কঠিন।

পরিবর্তনের আশায় নানা হিসাব

কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সম্ভাবনা সামনে এসেছে। কেউ মনে করছেন কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটতে পারে। কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে আলোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা দেখছেন। আবার সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

Some Cubans depend on sugar water as food shortages bite

কিউবার বাইরে বসবাসকারী অনেকেই ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট সরকারগুলোর পতনের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করছেন। তবে সেই সময়ের সঙ্গে কিউবার বাস্তবতার বড় পার্থক্য রয়েছে। পূর্ব ইউরোপে শাসকগোষ্ঠীর ভেতর বিভাজন এবং শক্তিশালী জনভিত্তিসম্পন্ন বিরোধী আন্দোলন ছিল। কিউবায় এখনো নিরাপত্তা কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী এবং দমন-পীড়নের কারণে বিরোধীদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ সীমিত।

দেশ ছাড়ছেন লাখ লাখ মানুষ

অভ্যন্তরীণ সংকটের আরেকটি বড় পরিণতি হলো ব্যাপক অভিবাসন। ২০২০ সালের পর থেকে প্রায় ২০ লাখ কিউবান দ্বীপটি ছেড়ে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দেশের ভেতরে ব্যাপক জনসমাবেশের পরিবর্তে মানুষের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সাল থেকে কিউবানদের প্রবেশ কার্যত কঠোরভাবে সীমিত করায় অনেক অভিবাসী এখন অন্য গন্তব্যের দিকে যাচ্ছেন। এতে দেশের ভেতরের অসন্তোষ থাকলেও তা সরাসরি সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে না।

রাজপথে বাড়ছে ক্ষোভ

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত নয়। সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর বিভিন্ন এলাকায় সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। রাতে অনেক এলাকায় হাঁড়ি-পাতিল পিটিয়ে প্রতিবাদ এবং জ্বলন্ত আবর্জনা দিয়ে রাস্তা বন্ধ করার ঘটনা ঘটছে।

সরকারের একটি টেলিভিশন ব্রিফিংয়ে ভুল করে প্রদর্শিত একটি স্লাইডেও কর্মকর্তাদের সামাজিক বিস্ফোরণের আশঙ্কার কথা উঠে আসে। অর্থাৎ প্রশাসনের ভেতরেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আরও বাড়ছে

Cubans say their focus in on scarcity amid news about China

কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। মার্কিন প্রশাসন দেশটির নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক কমানোর মতো দাবি জানিয়েছে।

কিউবা এসব দাবিতে বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে অনেক বিদেশি কোম্পানি কিউবা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

জুনে কিউবার পক্ষ থেকে অর্থনীতি কিছুটা উদার করার উদ্যোগ এবং জুলাইয়ে আলোচিত রাজনৈতিক বন্দি শিল্পী লুইস মানুয়েল ওতেরো আলকান্তারার মুক্তিও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।

সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিউবাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা বেড়েছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে হাভানার গোয়েন্দা সম্পর্ক, ইরান থেকে চালকবিহীন বিমান সংগ্রহের অভিযোগ এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতায় কিউবার ভূমিকার মতো বিষয় সামনে আনা হচ্ছে।

কিউবার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মার্কিন আইনি পদক্ষেপও সামরিক বা কঠোর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা বাড়িয়েছে। তবে কিউবায় সামরিক অভিযান হলে তা দেশটির জন্য নতুন ও গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।

১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। পরবর্তী চার বছরের দখলদারিত্বের পর যে কিউবান প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল, সেটি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে ছিল। সেই ইতিহাসের কারণে নতুন কোনো মার্কিন হস্তক্ষেপ কিউবার মানুষের কাছে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে।

Soaring international prices aggravate Cuban food crisis | Reuters

‘বন্ধুত্বপূর্ণ দখল’ কি নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দখল’-এর কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন। এরই মধ্যে নিষেধাজ্ঞার কারণে কিউবার বড় বড় হোটেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অংশীদার সরে যাওয়ায় দেশটির সম্পদের মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো কম দামে কিউবার সম্পদ কিনে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

কিন্তু সামরিক হস্তক্ষেপ করলেই যে কিউবায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বরং নতুন কোনো ক্ষমতাকেন্দ্র, অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী ও বিদেশি প্রভাবের সমন্বয়ে ভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

অপেক্ষার ভার সাধারণ মানুষের

এই মুহূর্তে এসব সম্ভাবনার বেশির ভাগই বাস্তবতার চেয়ে অনুমানের পর্যায়ে রয়েছে। কিউবার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে আগ্রহী নয়। কারণ বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার অর্থ হতে পারে বর্তমান শাসনব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল করে দেওয়া।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও কিউবায় নতুন করে বড় ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক অভিযানে জড়ানোর ঝুঁকি নিতে দ্বিধায় রয়েছে। ইরান সংঘাতের মতো অন্য আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যেই কিউবায় নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন প্রকল্প শুরু করা মার্কিন প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনও সেই হিসাবকে আরও জটিল করছে।

ফলে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে আছে। দুই পক্ষই চাইছে, অন্য পক্ষ আগে বড় কোনো ছাড় দিক।

কিন্তু এই অপেক্ষার সময় সবার জন্য সমান নয়। সরকার চাইলে আরও অপেক্ষা করতে পারে, রাজনৈতিক হিসাব কষতে পারে, নতুন কৌশল নিতে পারে। সাধারণ কিউবান তা পারেন না। তারা অনির্দিষ্টকাল খাবার, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে পারবেন না। কিউবার সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে সেই সাধারণ মানুষকেই, যারা বছরের পর বছর ধরে শুধু অপেক্ষা করেই যাচ্ছেন।

In Cuba, families fear shortages will worsen as coronavirus affects the  economy