আকিকো ইয়ানো জাপানের পপ ও জ্যাজ সংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এ পর্যন্ত তিনি ৫০টি অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন এবং হিরোমি উয়েহারা, রেই হারাকামি, প্যাট মেথেনি, থমাস ডলবি, সুইং আউট সিস্টার, লিটল ফিট এবং ইয়েলো ম্যাজিক অর্কেস্ট্রা (ওয়াইএমও)-এর মতো খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন।
সংগীতের পাশাপাশি তিনি সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও বহু চলচ্চিত্র নির্মাতার সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্টুডিও জিবলির অ্যানিমেশন কিংবদন্তি হায়াও মিয়াজাকি। ইয়ানোর সংগীত তার কল্পনাপ্রবণতা, দুষ্টুমি-মেশানো স্বতন্ত্র আবহ এবং নিরন্তর নতুনত্বের জন্য পরিচিত।
আকিকো ইয়ানোর সরাসরি কনসার্টে উপস্থিত হওয়া যেন এক ধরনের রূপান্তরময় অভিজ্ঞতা। তাঁর পরিবেশনা দর্শকদের আনন্দিত ও মুগ্ধ করে এবং একই সঙ্গে নিজের অনুভূতিকে তাঁর মতোই অকৃত্রিম ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করার অনুপ্রেরণা দেয়।
বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী এবং ওয়াইএমওর পথিকৃৎ সদস্য প্রয়াত রিউইচি সাকামোতোর সঙ্গে একসময় তাঁর বিয়ে হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে তিনি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংগীতাঙ্গনে নিজের প্রতিভা ও সুরের মাধ্যমে প্রভাব রেখে চলেছেন। ২০২৫ সালে হিরোমি উয়েহারার সঙ্গে তাঁর সরাসরি পরিবেশনার অ্যালবাম ‘স্টেপ ইনটু প্যারাডাইস’ জ্যাজ অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার হিসেবে জাপান গোল্ড ডিস্ক অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

আকিকোর সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে কথা বলেন ‘টোকিও জার্নাল’-এর প্রধান সম্পাদক অ্যান্থনি আল-জামি।
প্রশ্ন: সংগীতে আপনার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
আকিকো ইয়ানো: আমার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল প্রায় ১৪ বছর বয়সে। আমার বাবা-মা আমার স্বপ্নকে সবসময় সমর্থন করেছেন। ১৫ বছর বয়সে তাঁরা আমাকে টোকিওতে ফিরে গিয়ে দাদা-দাদির সঙ্গে থাকার অনুমতি দেন।
হাইস্কুলে আমি শিক্ষার্থীদের জ্যাজ ক্লাবে সংগীত করতাম। পাশাপাশি টোকিওর ইয়োৎসুয়া ও আওয়ামোরি এলাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁ এবং খোলা আকাশের নিচে আয়োজিত ক্লাবে একক পরিবেশনাও করতাম। এরপর ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসি। তারপর থেকে এখানেই বসবাস করছি এবং সংগীতচর্চা করছি।
প্রশ্ন: আপনি কোন কোন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারেন? আর আপনার সংগীতজীবনে কারা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন?
আকিকো ইয়ানো: আমি শুধু পিয়ানো বাজাতে পারি। সংগীতের প্রভাবের কথা বলতে গেলে, ১২ বছর বয়সে রেডিওতে স্ট্যান গেটজ ও ম্যাক্স রোচের সংগীত শোনা শুরু করি। আমার কোনো আনুষ্ঠানিক জ্যাজ শিক্ষক বা গুরু ছিলেন না। তাই তাঁদের সংগীত অনুশীলন করেই আমি শিখেছি এবং ধীরে ধীরে নিজের একটি নিজস্ব ধারা তৈরি করেছি।
প্রশ্ন: সংগীতের বাইরে আপনার সৃজনশীলতার অনুপ্রেরণার উৎস কী?
আকিকো ইয়ানো: সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে মহাকাশ, মহাবিশ্ব এবং প্রকৃতি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার উৎস। এগুলোই আমাকে সৃষ্টি করতে এবং গান লিখতে প্রয়োজনীয় প্রেরণা দেয়।
প্রশ্ন: আপনার সংগীতের ধরন ও পরিবেশনার মধ্যে কী এমন বৈশিষ্ট্য আছে, যা একে বিশেষ বা অনন্য করে তোলে?
আকিকো ইয়ানো: আমার সংগীতের প্রতিটি দিকের শিকড় আমার ব্যক্তিগত সত্তার মধ্যে। আর সেটিই আমার সংগীতকে স্বতন্ত্র করে তোলে। আমি মনে করি, প্রতিটি সংগীতশিল্পীর নিজস্ব পরিবেশনাভঙ্গি রয়েছে বলেই প্রতিটি সংগীতের আলাদা সৌন্দর্য আছে।
অবশ্যই এমন অনেক শিল্পী আছেন, যাঁরা আমার চেয়ে ভালো বাজাতে পারেন। কিন্তু আমার নিজের সংগীতের ক্ষেত্রে আমি বিশ্বাস করি, সেটি পরিবেশনের জন্য আমিই সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষ।
প্রশ্ন: আপনার গান লেখার প্রক্রিয়াটি কেমন? অ্যানিমে ও চলচ্চিত্রের মতো দৃশ্যশিল্পের সঙ্গে কাজ করার সময় সেই প্রক্রিয়ায় কীভাবে পরিবর্তন আনেন?
আকিকো ইয়ানো: সেখানে সুর করার বিষয়টির ওপর অবশ্যই বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। আমার কাছে মনে হয়, এ ধরনের কাজের সৃজনশীল প্রক্রিয়া পেশাগত নির্দেশনার মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি আবদ্ধ থাকে।
চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন যেহেতু পরিচালকের সৃষ্টিকর্ম, তাই তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী আমাকে কাজ করতে হয়, যাতে আমার কাজ তাঁদের কল্পিত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
হায়াও মিয়াজাকির সঙ্গে কাজ করার সময় তিনি আমাকে মাছ ও ইয়োকাই—অর্থাৎ জাপানি লোককথার অতিপ্রাকৃত সত্তা—সহ বিভিন্ন চরিত্রের কণ্ঠ দিতে বলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করা খুবই আকর্ষণীয় ছিল, যদিও সহজ ছিল না। এতে অনেক সময়, নিষ্ঠা এবং সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি মনোযোগ প্রয়োজন হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কাজটি সম্পূর্ণ অবস্থায় দেখার আনন্দ সবসময়ই আলাদা। তাই পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।
প্রশ্ন: বছরের পর বছর যেসব শিল্পীর সঙ্গে আপনি কাজ করেছেন, তাঁরা আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছেন?

আকিকো ইয়ানো: যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাঁরা প্রত্যেকেই অসাধারণ সংগীতশিল্পী এবং তাঁদের চিন্তাভাবনাও ছিল অসাধারণ। তাঁদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেছি।
শুধু একজন মানুষ আমাকে প্রভাবিত করেছেন—এমন নয়; বরং অনেকেই আমাকে প্রভাবিত করেছেন। রেই হারাকামি তাঁর অকালমৃত্যু পর্যন্ত আমার সঙ্গে কাজ করেছেন। রিউইচি সাকামোতোর সঙ্গেও কাজ করেছি। সাকামোতোর সংগীত অসাধারণ সুন্দর—তা ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব।
প্রশ্ন: দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও কি আপনি নিজেকে এখনো জাপানি মনে করেন? আপনার জাপানি ঐতিহ্য কীভাবে সংগীতে প্রভাব ফেলে?
আকিকো ইয়ানো: অবশ্যই! আমি মনে করি, জাপানি পরিচয় আমার সংগীতে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে জাপানের ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত মিনইয়ো এবং ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র শামিসেনের প্রতি আমার ভালোবাসা আমার কিছু সংগীতের মধ্যে মিশে আছে।
প্রশ্ন: আজকের তরুণ জাপানি সংগীতশিল্পীদের আপনি কীভাবে দেখেন? তাঁদের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ আছে?
আকিকো ইয়ানো: আমি মনে করি তাঁরা দারুণ করছেন! সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশি জাপানি ব্যান্ড ও সংগীতশিল্পীকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে পরিবেশন করতে দেখছি। বিষয়টি সত্যিই অসাধারণ।
তরুণ শিল্পীদের আমি বলব, ঘরে থেকেও অনেক জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু পৃথিবীর বাইরে আরও অসংখ্য অসাধারণ সুযোগ অপেক্ষা করছে। তাই পৃথিবীকে দেখো এবং পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে পরিচিত হও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















