দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রচণ্ড মানসিক চাপ আর ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন—সবকিছুর মাঝেও ক্যারিয়ারে দ্রুত সাফল্য পেয়েছিলেন অ্যালেক্স টেলর। কিন্তু একসময় নিজের শরীরই তাকে থামতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে তিনি শুরু করেন নারীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক পুষ্টি-পরিপূরক পণ্যের ব্যবসা।
দ্রুত সাফল্যের পেছনে হারিয়ে যাচ্ছিল স্বাস্থ্য
প্রায় ২৯ বছর বয়সেই অ্যালেক্স টেলর একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও প্রধান সম্পাদক হন। কর্মজীবনের শুরুতেই নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ায় তিনি কাজ নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকতেন। প্রতিদিন সকাল ৭টার দিকে অফিসে ঢুকে সন্ধ্যা ৭টার পর বের হওয়া ছিল তার নিয়মিত রুটিন।
তখন পরিবারের দায়িত্ব না থাকায় রাতের বেলায়ও কাজের বার্তার উত্তর দিতেন তিনি। ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার নেশায় নিজের স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছিল।
২০১৬ সালে তার শরীরে অস্বাভাবিক কিছু উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। চুল পড়া, প্রচণ্ড অবসাদ, ত্বকের সমস্যা, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে ঝাপসা ভাব, আঙুলে তীব্র প্রদাহ এবং দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু শুরুতে এসব উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যান তিনি।
পরে জলবসন্তের মতো তীব্র এক ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে হাশিমোতো রোগ শনাক্ত হয়, যা একটি স্বয়ংপ্রতিরোধী রোগ। চিকিৎসকেরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত মানসিক চাপও তার অবস্থার অবনতিতে ভূমিকা রেখেছিল।

বুঝলেন, কোনো চাকরিই স্বাস্থ্যের চেয়ে বড় নয়
একই সময়ে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রেও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিলেন টেলর। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, নিজের শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর তিনি কতটা চাপ সৃষ্টি করেছেন।
চিকিৎসকের পরামর্শে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনেন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ গ্রহণ শুরু করেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে তার কর্মজীবনে।
টেলরের উপলব্ধি হয়, স্বাস্থ্য নষ্ট করে কোনো চাকরিতে টিকে থাকার অর্থ নেই। তিনি আগের প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্য একটি পোশাক ব্র্যান্ডে নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন। তখন তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
তবে নতুন কর্মক্ষেত্রেও বেশিদিন মন টেকেনি। নিজের কিছু করার তাগিদ ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে।
মাতৃত্ব থেকেই নতুন ব্যবসার ধারণা
সন্তান জন্মের পর টেলর নিজেই বুঝতে পারেন, নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও পুষ্টি-পরিপূরক পণ্য বেছে নেওয়া কতটা জটিল। বিভিন্ন চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে আলাদা আলাদা পরামর্শ পাওয়ায় তাকে একাধিক পণ্যের সমন্বয়ে নিজের দৈনন্দিন পুষ্টির ব্যবস্থা করতে হতো।
এ সময় সহপ্রতিষ্ঠাতা ভিক্টোরিয়া থেইন জিওয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। জিওয়ার মেয়ের জন্মের সময় পুষ্টিসংক্রান্ত একটি জন্মগত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। দুজনই উপলব্ধি করেন, গর্ভাবস্থায় নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
সেখান থেকেই নারীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক পুষ্টি-পরিপূরক পণ্যের ব্যবসার ধারণা আসে।
মহামারির সময় অর্থ ছাড়াই শুরু
ব্যবসা শুরুর জন্য বিনিয়োগ সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন তারা। কিন্তু মহামারি শুরু হওয়ায় বিনিয়োগের পরিবেশ দ্রুত কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বাইরের বড় বিনিয়োগ ছাড়াই নিজেদের অর্থে ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তারা।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে পাঁচ ধরনের পণ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। এসব পণ্য গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের চাহিদা বিবেচনা করে তৈরি করা হয়।
পরে অবশ্য প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ পেতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিধিও বাড়ে। গর্ভাবস্থার পাশাপাশি মধ্যবয়সে হরমোনের পরিবর্তনের সময় এবং কৃত্রিম প্রজনন চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাওয়া নারীদের জন্যও পণ্য ও সেবা যুক্ত করা হয়।
উদ্যোক্তা ও মা—দুই দায়িত্ব সামলানোর নতুন নিয়ম
দুই সন্তানের মা হিসেবে ব্যবসা পরিচালনার চাপ সামলানো সহজ ছিল না টেলরের জন্য। তার স্বামী চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করেন এবং কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। সন্তানদের দেখাশোনায় নিজের মা ও শাশুড়ির সহায়তাও পেয়েছেন তিনি।
বর্তমানে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে তিনি কঠোর দৈনন্দিন রুটিন অনুসরণ করেন। প্রায় প্রতিদিন ধ্যান করেন এবং সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে রাত ৮টার মধ্যেই নিজে ঘুমাতে যান।
আগে আত্মউন্নয়নমূলক বই পড়লেও এখন নিজের জীবনকে সব সময় আরও ভালো করার চাপে না রেখে গল্পের বই পড়তেই বেশি স্বস্তি পান।
মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতেও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। তার উপলব্ধি, সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর মাঝেও কর্মক্ষেত্রের বার্তার উত্তর দিতে গিয়ে তার অনেক মানসিক চাপ তৈরি হতো।
টেলরের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—উচ্চাকাঙ্ক্ষী থাকা সম্ভব, কিন্তু নিজের মূল্যবোধ ও স্বাস্থ্যকে বিসর্জন দিয়ে নয়।
নারীদের স্বাস্থ্য, মাতৃত্ব ও কর্মজীবনের ভারসাম্য নিয়ে তার অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হতে পারে নিজের জন্য সঠিক সময়ে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া।
স্বাস্থ্যকে বিসর্জন দিয়ে ক্যারিয়ার নয়—নিজের জীবন ও স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বুঝে নতুন পথে হাঁটার গল্পই অ্যালেক্স টেলরের যাত্রাকে আলাদা করে তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















