ইতালির ধর্মগুরু সন্ত ফ্রান্সিস অব আসিসির চরিত্রে অভিনয়কে শুধু মঞ্চের একটি ভূমিকা হিসেবে নেননি কানাডীয় গায়ক ফিলিপ স্লি। চরিত্রটিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে তিনি টানা দুই মাসেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসীদের সঙ্গে। তাদের মতোই প্রার্থনা, খাবার ও দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে নিজেকে যুক্ত করে তিনি প্রস্তুত করেছেন নিজের মন ও কণ্ঠ।
অস্ট্রিয়ার সালজবুর্গে এবারের উৎসবে ফরাসি সুরকার অলিভিয়ে মেসিয়ানের বিখ্যাত অপেরা ‘সন্ত ফ্রাঁসোয়া দ’আসিজি’-তে প্রথমবারের মতো সন্ত ফ্রান্সিসের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ৩৭ বছর বয়সী স্লি। চরিত্রটির গভীরে পৌঁছাতে তাঁর এই ব্যতিক্রমী প্রস্তুতি এখন প্রযোজনাটির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
সন্ন্যাসীদের সঙ্গে দুই মাস
সালজবুর্গের নাট্যমঞ্চগুলোর ঠিক ওপারে সালজাখ নদীর তীরে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত কাপুচিন সন্ন্যাসালয়ে অবস্থান করেন স্লি। সেখানকার ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসীদের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজেকে যতটা সম্ভব সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।
স্লির জন্য সেখানে আলাদা একটি কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দিনের বেলায় সন্ন্যাসালয়ে থাকলে তিনি সন্ন্যাসীদের সঙ্গে খাবার খেতেন এবং সন্ধ্যার প্রার্থনায় অংশ নিতেন। মহাপ্রসাদের আয়োজন থাকলে সেখানেও সময় দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। তবে মঞ্চের মহড়ার সময়সূচির সঙ্গে সবকিছু মিলিয়ে চলতে হয়েছে তাঁকে।

স্লি জানান, এক বছর আগে তিনি সন্ন্যাসালয়ে ফোন করে সেখানে থাকার অনুমতি চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, এত সংক্ষিপ্ত কোনো কথোপকথন তিনি আগে কখনো দেখেননি—কারণ অনুমতির উত্তর এসেছিল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
চরিত্রের জন্য আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি
স্লি ক্যাথলিক পরিবারে দীক্ষিত হলেও কানাডার অটোয়ায় এপিসকোপালিয়ান পরিবেশে বড় হয়েছেন। এখন তিনি কুইবেকে বসবাস করেন। কিন্তু সন্ত ফ্রান্সিসের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ধর্মীয় সাধনা ও আত্মসমর্পণের অভিজ্ঞতাকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
সন্ন্যাসীদের সরল জীবন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁদের সঙ্গে থাকতে গিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন, ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ বলতে কী বোঝায়। সেই উপলব্ধি তিনি মঞ্চেও সঙ্গে নিয়ে গেছেন।
স্লির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের বিচার বা চাপ অনুভব না করা। শুরুতে তাঁদের সব অনুশীলনে অংশ নিতে না পারায় তাঁর অপরাধবোধ হচ্ছিল। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, সন্ন্যাসীরা তাঁকে নিয়ে কোনো নেতিবাচক বিচার করছেন না।
বরং প্রতিদিন সকালে একটি সমষ্টিগত আচার ও প্রার্থনার মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করার অনুভূতিই তাঁর কাছে সুন্দর হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের কণ্ঠ ও অভিনয়ের ভেতরে নতুন এক স্বর খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।
আটশ বছর পরও প্রাসঙ্গিক সন্ত ফ্রান্সিস
অলিভিয়ে মেসিয়ানের এই অপেরা প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৯৮৩ সালে প্যারিসে। দীর্ঘ সময়ের এই বিশাল প্রযোজনায় রয়েছে ১১০ জন বাদ্যযন্ত্রী, ৯০ জন কণ্ঠশিল্পী এবং প্রায় ছয় ঘণ্টার পরিবেশনা। মাঝখানে রয়েছে এক ঘণ্টা করে দুটি বিরতি।
এবারের পরিবেশনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সন্ত ফ্রান্সিসের মৃত্যুর আটশতম বার্ষিকীর সঙ্গে এটি মিলেছে। দারিদ্র্য, প্রকৃতিপ্রেম, শান্তি ও আধ্যাত্মিকতার জন্য পরিচিত এই সাধকের জীবনই অপেরাটির মূল বিষয়।
সন্ত ফ্রান্সিসের প্রতি মেসিয়ানের আকর্ষণও ছিল গভীর। পাখির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। ১৯৫২ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের সময় তিনি পাখির ডাক নোটবুকে লিখে রাখতেন। সেই পাখির ডাক তাঁর সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মেসিয়ান সন্ত ফ্রান্সিসের জীবন নিয়ে মধ্যযুগীয় নানা বিবরণ ও সাধকের নিজের লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়েছিলেন। ফলে অপেরাটিতে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রকৃতি ও সংগীতের এক অনন্য সমন্বয় তৈরি হয়েছে।
প্রকৃতিই যেন বিশাল উপাসনালয়
এই প্রযোজনার পরিচালক রোমেও কাস্তেলুচ্চি মনে করেন, মঞ্চের পরিবেশও সন্ত ফ্রান্সিসের জীবন ও দর্শনের সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে গেছে। সালজবুর্গের যে প্রেক্ষাগৃহে অপেরাটি মঞ্চস্থ হচ্ছে, সেটি পাহাড়ের ঢালে পাথর কেটে তৈরি।
সন্ত ফ্রান্সিস জীবনের বিভিন্ন সময় গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাই পাথরের ভেতর নির্মিত এই মঞ্চকে পরিচালকের কাছে যেন এক স্বাভাবিক ও প্রতীকী পরিবেশ বলে মনে হয়েছে।
কাস্তেলুচ্চির মতে, সন্ত ফ্রান্সিস মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখেছিলেন। তাঁর কাছে মানুষ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রাণী, উদ্ভিদ ও প্রকৃতির অন্য সব উপাদানও সমানভাবে মূল্যবান। মেসিয়ানের কাছেও প্রকৃতি ছিল এক ধরনের উপাসনালয়।
দর্শক বদলে যাওয়ার গল্প
এই অপেরায় আগেও সন্ত ফ্রান্সিসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রখ্যাত গায়ক উইলার্ড হোয়াইট। এখন ৮০ বছরে পা দিতে যাওয়া হোয়াইট এবার ছোট একটি সন্ন্যাসীর ভূমিকায় ফিরেছেন।
২০০২ সালে সান ফ্রান্সিসকোর একটি মঞ্চায়নে সন্ত ফ্রান্সিসের ভূমিকায় অভিনয়ের স্মৃতি তাঁর কাছে এখনো উজ্জ্বল। তিনি জানান, সেই পরিবেশনা দেখার পর অনেক দর্শক তাঁকে বলেছিলেন, সংগীত ও নাট্যরূপ তাঁদের জীবনে গভীর পরিবর্তন এনেছে।
কেউ কেউ রাস্তায় বা খাবারের দোকানেও তাঁর সঙ্গে দেখা করে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। তাঁরা ঠিক কী ঘটেছিল তা ব্যাখ্যা করতে পারতেন না, কিন্তু নিজেদের সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া মানুষ হিসেবে অনুভব করেছিলেন।
মঞ্চের বাইরের সাধনাই হয়ে উঠল অভিনয়ের শক্তি
স্লির জন্যও এই পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা এখন অভিনয়ের কেন্দ্রে। সন্ন্যাসীদের সঙ্গে বসবাস তাঁকে শুধু সন্ত ফ্রান্সিসের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে ধারণা দেয়নি, বরং আত্মসমর্পণ, সরলতা ও সমষ্টিগত জীবনের অর্থও উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।
সালজবুর্গ উৎসবে এই বিশাল আয়োজনের কয়েকটি পরিবেশনা দেখতে কাপুচিন সন্ন্যাসালয়ের কয়েকজন সন্ন্যাসীও আসবেন। ফলে যে মানুষটির জীবনকে মঞ্চে তুলে ধরতে স্লি এতদিন তাঁদের সঙ্গে থেকেছেন, সেই সাধনার সাক্ষী থাকবেন তাঁর বাস্তব জীবনের সঙ্গীরাও।
সন্ত ফ্রান্সিসের চরিত্রে অভিনয়ের আগে স্লি যে পথ বেছে নিয়েছেন, তা শেষ পর্যন্ত কেবল একজন গায়কের প্রস্তুতি হয়ে থাকেনি। সন্ন্যাসীদের সরল জীবন, প্রার্থনা, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং আত্মসমর্পণের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে চরিত্রের বাইরেও এক গভীর মানবিক অনুসন্ধানে পরিণত হয়েছে।
সালজবুর্গের পাথরকাটা মঞ্চে তাই সন্ত ফ্রান্সিসের কণ্ঠ যখন প্রতিধ্বনিত হবে, তার পেছনে থাকবে শুধু দীর্ঘ মহড়া বা সংগীতের অনুশীলন নয়—থাকবে দুই মাসের এক বাস্তব সন্ন্যাসজীবনের অভিজ্ঞতাও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















