প্যারিসের আট শতকের পুরোনো নটর ডেম ক্যাথেড্রালের পুনর্নির্মাণে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে একেবারে নতুন শিল্পকর্ম। ২০১৯ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সাড়ে সাত বছর পর ক্যাথেড্রালের দক্ষিণ পাশের বিশাল নাভে বসানো হবে ছয়টি নতুন রঙিন কাচের জানালা। তবে এই জানালা ঘিরেই পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের সবচেয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ফরাসি শিল্পী ক্লেয়ার তাবুরের নকশা করা জানালাগুলোতে খ্রিষ্টীয় পবিত্র উৎসব পেন্টেকস্টের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শোভাযাত্রা ও প্রাকৃতিক দৃশ্যকে আধুনিক শিল্পরীতিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এসব নকশায়।
পুরোনো জানালা সরানো নিয়েই আপত্তি
নতুন জানালাগুলো উনিশ শতকে স্থাপিত রঙিন কাচের জানালার জায়গা নেবে। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে তিন লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছিলেন একটি আবেদনে। ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী বিভিন্ন সংগঠনও জানালা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি পদক্ষেপ নেয়।
তাদের যুক্তি ছিল, আটশ বছরের ঐতিহাসিক স্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরিয়ে সেখানে সমকালীন শিল্পকর্ম বসানো ফ্রান্সের ঐতিহ্য সংরক্ষণনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ঐতিহ্য সংরক্ষণকর্মীদের মতে, ইতিমধ্যে ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত কোনো স্থাপনার অতীতকে সরিয়ে নতুন কিছু বসানোর নজির খুবই বিরল।
তবে এসব আপত্তি শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি ঠেকাতে পারেনি। নতুন জানালার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সেগুলো নটর ডেমে স্থাপন করার কথা রয়েছে।

ঐতিহ্যের ভেতরেই আধুনিকতার জায়গা
নটর ডেম পুনর্নির্মাণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা আশা করছেন, জানালাগুলো স্থাপনের পর সমালোচকদের মনোভাবও বদলাতে পারে। তাঁদের ধারণা, কোনো নতুন শিল্পকর্ম নিয়ে দূর থেকে বিতর্ক যতটা তীব্র হয়, বাস্তবে স্থাপনাটি দেখার পর মানুষের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় ততটা নেতিবাচক থাকে না।
প্যারিসের নটর ডেমের সহকারী ধর্মীয় নেতা লরাঁ উলরিশই প্রথম উনিশ শতকের জানালাগুলোর জায়গায় নতুন শিল্পকর্ম বসানোর প্রস্তাব দেন। পরে তিনি বিষয়টি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর কাছে তুলে ধরেন। নটর ডেমের পুনর্নির্মাণে নিজের ছাপ রাখার ব্যাপারে আগ্রহী মাক্রোঁও প্রস্তাবটি সমর্থন করেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজটি পান ৪৪ বছর বয়সী ক্লেয়ার তাবুরে। তিনি বলেন, নতুন জানালা বসানো নিয়ে বিতর্ক তাঁকে নিরুৎসাহিত করেনি; বরং বিষয়টি তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁর মতে, ফ্রান্সে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া নিজেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা।
আট শতকের স্থাপনায় নতুন শিল্প
নটর ডেমের ইতিহাসে পরিবর্তন নতুন কিছু নয়—এমন যুক্তিই দিয়েছেন লরাঁ উলরিশ। তাঁর মতে, ১৩৪৫ সালে ক্যাথেড্রালটির নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে এতে সংযোজন ও পরিবর্তন হয়েছে এবং সেগুলোকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
নতুন জানালাগুলো তৈরি হচ্ছে প্যারিসের পূর্বদিকে অবস্থিত প্রাচীন শহর রেঁসে একটি কয়েক শতাব্দী পুরোনো কারিগরি প্রতিষ্ঠানে। ১৬৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওই কর্মশালাটি বর্তমানে একটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক গির্জার ভূগর্ভস্থ অংশে অবস্থিত।
দৃশ্যটি যেন ইতিহাসের এক অদ্ভুত প্রতীক। বিংশ শতকের মাঝামাঝি নির্মিত একটি আধুনিক গির্জার নিচে ইউরোপের প্রাচীনতম রঙিন কাচ তৈরির কর্মশালাগুলোর একটি। আর সেই কর্মশালাতেই তৈরি হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত গোথিক ক্যাথেড্রালের নতুন জানালা, যার প্রথম পাথর স্থাপন করা হয়েছিল ১১৬৩ সালে।

শিল্পী ও কারিগরদের দীর্ঘ প্রস্তুতি
কর্মশালার কারিগররা আলোযুক্ত টেবিলে বসে কাটা কাচের টুকরোর ওপর রং ও নকশা তৈরি করছেন। পরে সেগুলো বিশেষ চুল্লিতে পোড়ানো হবে এবং একত্র করে বিশাল জানালায় রূপ দেওয়া হবে।
এই কর্মশালাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দক্ষ কাচশিল্পী পিয়ের সিমোঁ। দীর্ঘ সময় তাঁর পরিবারই এটি পরিচালনা করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিষ্ঠানটি মার্ক শাগাল ও জোয়ান মিরোর মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত রেঁস ক্যাথেড্রালের রঙিন কাচের জানালা পুনরুদ্ধারেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা ছিল।
অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পরিবারটি ২০১১ সালে কর্মশালাটি বিক্রি করে দেয়। পরে রেঁসের দুই ব্যবসায়ী পিয়ের-এমানুয়েল তাইতাঁজে ও ফিলিপ ভারাঁ এটি কিনে নেন। বড় জায়গার প্রয়োজন হওয়ায় তাইতাঁজে একটি পরিত্যক্ত গির্জাকে কর্মশালায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন।
পুরোনো জানালাগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে না
নতুন জানালা বসানো হলেও উনিশ শতকের পুরোনো জানালাগুলো পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। সেগুলো সংরক্ষণ করে প্রদর্শন করা হবে। এর দুটি রাখা হবে প্যারিসের একটি স্থাপত্য জাদুঘরে এবং চারটি থাকবে উত্তর ফ্রান্সের একটি দুর্গে।
পুরোনো জানালাগুলোর নকশাকার ইউজিন ভিওলে-লে-দুকের সবচেয়ে দৃশ্যমান অবদানও অবশ্য অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। ২০১৯ সালের অগ্নিকাণ্ডে নটর ডেমের চূড়ার কাঠের মিনারটি ধসে পড়ার পর সেটি আগের নকশা অনুসারেই পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, নটর ডেমের পুনর্নির্মাণে আধুনিকতার জায়গা তৈরি হলেও অতীতকে মুছে ফেলার পরিকল্পনা নেই—বরং পুরোনো ও নতুনকে পাশাপাশি রাখার চেষ্টা চলছে।

শেষ মুহূর্তের নকশাতেও পরিবর্তন
ক্লেয়ার তাবুরে এখনো তাঁর কাজ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। প্রায় প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর তিনি রেঁসের কর্মশালায় গিয়ে কারিগরদের সঙ্গে কাজ দেখছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নকশায় পরিবর্তন আনছেন।
নতুন জানালাগুলোর শেষটির কাজও এখন চলছে। সেখানে থাকবে একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রার দৃশ্য। ক্যাথেড্রাল থেকে বের হওয়ার আগে দর্শনার্থীদের চোখে পড়বে এটিই শেষ চিত্র।
বছরের শেষে যখন নতুন জানালাগুলো উন্মোচন করা হবে, তখনই বোঝা যাবে বহু মাসের বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়। শিল্পী নিজেও জানেন, নটর ডেমে প্রতিবছর প্রায় দেড় কোটি মানুষ আসেন—তাই সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। তবু তাঁর বিশ্বাস, নতুন জানালাগুলো পুরোনো ঐতিহ্যকে মুছে দেবে না; বরং আট শতকের ইতিহাসের সঙ্গে সমকালীন ফ্রান্সের একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত করবে।
নটর ডেমের এই নতুন রূপ তাই শুধু কাচের জানালা বদলের ঘটনা নয়। এটি আসলে একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে ফ্রান্সকে—ঐতিহাসিক স্থাপনা কি কেবল অতীতকে সংরক্ষণ করবে, নাকি সময়ের সঙ্গে নতুন শিল্প ও নতুন ভাবনাকেও ধারণ করবে?
নটর ডেমের নতুন রঙিন কাচের জানালা
প্যারিসের নটর ডেম ক্যাথেড্রালে ২০১৯ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর পুনর্নির্মাণে বসানো হচ্ছে ছয়টি নতুন রঙিন কাচের জানালা। ঐতিহ্য বনাম আধুনিক শিল্প নিয়ে তীব্র বিতর্কের মধ্যেই ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ কাজ শেষ হওয়ার কথা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















