তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাইনবনে ঘেরা এক নিরিবিলি আশ্রয়কেন্দ্রে সম্প্রতি বসেছিল ব্যতিক্রমী এক আধ্যাত্মিক সমাবেশ। সেখানে টানা সাত দিন ও সাত রাত ধরে চলেছে ঘূর্ণনের মাধ্যমে প্রার্থনার প্রাচীন সুফি সাধনা ‘সেমা’। ধর্মীয় আচার, লোকসংগীত, আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও সামষ্টিক জীবনযাপনের এক অনন্য মিশেলে এই আয়োজন টেনে এনেছিল তুরস্কসহ ফ্রান্স, ইতালি, বুলগেরিয়া, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও আরও কয়েকটি দেশের মানুষকে।
নারী-পুরুষ সবার জন্য উন্মুক্ত সাধনা
সেমা সাধারণত তুরস্কে পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত আচারানুষ্ঠান হিসেবেই বেশি পরিচিত। ঐতিহ্যগতভাবে সাদা পোশাক ও লম্বা টুপি পরা পুরুষ দরবেশরা নির্দিষ্ট নিয়ম ও ছন্দে ঘুরতে ঘুরতে এই প্রার্থনা করেন। কিন্তু ইয়েনিচে অনুষ্ঠিত এবারের সমাবেশটি ছিল অনেকটাই ভিন্ন।
এখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ অংশ নিতে পেরেছেন। অনেক নারীই ছিলেন পুরুষদের তুলনায় বেশি। কারও পরনে ছিল ঢিলেঢালা পোশাক, কারও জিনস বা সাধারণ জামা, আবার কারও পোশাকে ছিল লোকজ নকশা। ঐতিহ্যবাহী পোশাকের কঠোরতা ছাড়িয়ে আয়োজকেরা সেমাকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও উন্মুক্ত করে তুলেছেন।
সমাবেশের অন্যতম সংগীতদল তুমাতা। দুই বোনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই দলে নারী ও পুরুষ উভয়েই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছেন। বাঁশির সুরের সঙ্গে ঢোল ও লোকজ বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে একের পর এক মানুষ ঘূর্ণনে অংশ নিয়েছেন।

‘যে আসে, তাকেই ডাকা হয়েছে’
সমাবেশে অংশ নেওয়ার জন্য কোনো বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল না। সুফি পথপ্রদর্শক ৬৯ বছর বয়সী জেম আয়দোগদুকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সেমায় অংশ নেওয়ার কোনো পূর্বশর্ত আছে কি না, তিনি বলেছিলেন, “যে আসে, তাকেই ডাকা হয়েছে।”
তার ব্যাখ্যায়, টানা সাত দিন ঘূর্ণনের মাধ্যমে এক ধরনের শক্তির ঘূর্ণিবলয় তৈরি হয়। সেই শক্তি কোথায় যাবে, তা মানুষের নিয়ন্ত্রণে নয়। যে শক্তির উৎস এই শক্তি সৃষ্টি করছে, সে-ই জানে তার গন্তব্য কোথায়।
এই আয়োজনের লক্ষ্য ছিল এমনভাবে ঘূর্ণন চালিয়ে যাওয়া, যাতে সাত দিন ও সাত রাতের কোনো সময়েই মেঝেতে ঘূর্ণনরত মানুষের সংখ্যা দুইয়ের নিচে না নামে।
আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে লোকউৎসবের আবহ
পাইনবনে ঘেরা আশ্রয়কেন্দ্রটির পরিবেশ ছিল একদিকে গ্রামীণ ও সাদামাটা, অন্যদিকে আধ্যাত্মিকতার আবহে ভরা। সেখানে আয়োজনটি অনেকটা লোকউৎসব ও আধ্যাত্মিক অবকাশযাপনের সংমিশ্রণের মতো হয়ে উঠেছিল।

অংশগ্রহণকারীদের থাকার জন্য ছিল কক্ষ, ছোট ঘর ও বিশেষ তাঁবু। তবে অধিকাংশ মানুষ নিজেরাই তাঁবু নিয়ে এসেছিলেন। অংশগ্রহণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্য ছিল না। কিন্তু আয়োজকদের ব্যয় মেটাতে সবাইকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করতে বলা হয়েছিল। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে রান্না, পরিবেশন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজেও অংশ নিতে হয়েছে।
প্রতিদিন তিনবার ছিল সামষ্টিক নিরামিষ খাবারের আয়োজন। অংশগ্রহণকারীদের কেউ সবজি কাটেছেন, কেউ রান্নায় সহযোগিতা করেছেন, আবার কেউ খাবারের পর থালা-বাসন ধুয়েছেন।
ঘূর্ণনের মাঝেও ছিল নানা আধ্যাত্মিক শিক্ষা
দিনের বেলায় একটি উইলো গাছের নিচে চলেছে আধ্যাত্মিক আলোচনা। নতুনদের জন্য ছিল ঘূর্ণনের প্রশিক্ষণও। সেখানে ধীরে শুরু করা, চোখের দৃষ্টি কিছুটা অস্পষ্ট রাখা এবং অসুস্থ বোধ করলে গতি কমিয়ে দেওয়ার মতো সতর্কতা শেখানো হয়েছে।
একদিন বাইরের একটি বাজারের উদ্বোধনেও সংগীত বাজানো হয় এবং মানুষ ঘূর্ণনে অংশ নেন। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল রুমির একটি পুরোনো কাহিনি। কথিত আছে, এক বাজারে স্বর্ণকারদের হাতুড়ির শব্দ শুনে রুমি হঠাৎ ঘুরতে শুরু করেছিলেন।
ঘূর্ণনকক্ষেই ছিল আয়োজনের প্রাণ
সমাবেশের মূল আকর্ষণ ছিল পাথরের দেয়ালঘেরা একটি বড় কক্ষ। সেখানে দিন-রাত পালা করে সংগীত বাজিয়েছেন শিল্পীরা। কখনো কয়েকজন মানুষ ঘুরেছেন, আর অন্যরা দেয়ালের পাশে বসে বিশ্রাম নিয়েছেন। আবার কখনো দুই ডজনের মতো মানুষ একই সঙ্গে ঘূর্ণনে মেতে উঠেছেন।

কেউ দ্রুত, কেউ ধীরে ঘুরেছেন। কারও মুখে ছিল গভীর আবেগের ছাপ। মাঝে মাঝে তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে “আল্লাহ” ধ্বনি। একপর্যায়ে একটি কিশোরীও ঘূর্ণনে যোগ দেয়। কিছুক্ষণ পর মাথা ঘুরে সে মেঝেতে পড়ে যায়।
অস্ট্রেলিয়ার ২৯ বছর বয়সী সোফি ফিটজপ্যাট্রিক প্রথমবার অভিজ্ঞ ঘূর্ণনকারীদের দেখে বিস্মিত ও কিছুটা ভীত হয়েছিলেন। পরে নিজেও চেষ্টা করেন। প্রথমবার বমি বমি ভাব হওয়ায় তাকে বিরতি নিতে হয়। দ্বিতীয়বার ঘূর্ণন তার কাছে তুলনামূলক সহজ মনে হয় এবং তার মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি হয় যে তিনি যেন নিজের চেয়ে অনেক বড় কোনো কিছুর অংশ হয়ে উঠেছেন।
রুমির ঐতিহ্য নতুনভাবে ধারণ করছে নতুন প্রজন্ম
সেমার শিকড় সুফিবাদে। ত্রয়োদশ শতকের সুফি সাধক ও কবি জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমির সঙ্গে এই সাধনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রুমির অনুসারীদের প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ধারার মাধ্যমে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তুরস্ক ও অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সেমার চর্চা ছড়িয়ে পড়ে।
তবে আধুনিক তুরস্ক প্রতিষ্ঠার পর ১৯২৩ সালে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার সুফি খানকা বন্ধ করে দেয় এবং সেমাসহ বিভিন্ন সুফি আচার নিষিদ্ধ করে। কয়েক দশক পর জনসমক্ষে সেমা পরিবেশনের ওপর বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে শিথিল করা হয়।
ইস্তাম্বুলের ২৫ বছর বয়সী শিল্পী মেলিকে কিলিচ ছোটবেলা থেকে ইসলামের একটি কঠোর রূপের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু প্রথমবার সেমার আসরে এসে সংগীত ও উন্মুক্ত পরিবেশ তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তার কাছে ধর্মের ধারণাটিও বদলে যায়। তার ভাষায়, আল্লাহ তখন আর কেবল শাসন ও বিচার করা কোনো দূরের সত্তা ছিলেন না; বরং নিজের ভেতরে অনুভব করা এক সত্তায় পরিণত হয়েছিলেন।
ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতার বার্তা
সেমার এই নতুন ধারাকে শুধু ইসলামি আচার হিসেবে দেখছেন না অনেক অংশগ্রহণকারী। তাদের কাছে এটি বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ধারার মিলনস্থল। বৌদ্ধধর্ম, যোগচর্চা, জ্যোতিষ, শামানবাদসহ নানা বিশ্বাস ও অনুশীলনের সঙ্গে তারা এই অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দেখছেন।

তুমাতা সংগীতদলের প্রতিষ্ঠাতা সুফি গবেষক ও সংগীতবিশারদ রাহমি ওরুচ গুভেঞ্চ ১৯৭০-এর দশকে দলটি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি একসময় ৯৯ দিন ও ১১৪ দিন পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী সেমার আয়োজন করেছিলেন। ২০১৭ সালে তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও অন্য শিষ্যরা সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
তার মেয়ে কানিকেয় গুভেঞ্চ আকচায়ের মতে, তাদের লক্ষ্য রুমির সেমার যে চেতনাকে তারা উপলব্ধি করেন, সেটিকে ধরে রাখা। সেখানে কঠোর নিয়ম বা নির্দিষ্ট নৃত্যভঙ্গির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উন্মাদনাময় আনন্দ ও হৃদয়ের আহ্বানে সাড়া দেওয়া।
নানা সংকটের মধ্যেও থামেনি ঘূর্ণন
সাত দিনের এই আয়োজনে কিছু সমস্যাও দেখা দিয়েছিল। আয়োজকদের বারবার পোশাকবিধি মনে করিয়ে দিতে হয়েছে। বিশেষ করে ছোট পোশাক কিংবা স্বচ্ছ কাপড় এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বেচ্ছাসেবকের সংকট ছিল, আর বিপুলসংখ্যক মানুষের তুলনায় অনুদানও পর্যাপ্ত হচ্ছিল না।
একপর্যায়ে ঘূর্ণনকক্ষে মাত্র দুজন মানুষ অবশিষ্ট থাকলে আয়োজকেরা বাইরে খাবারের জায়গায় গিয়ে আরও অংশগ্রহণকারীকে ঘূর্ণনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তবু সেমার ধারাবাহিকতা ভাঙেনি। সপ্তম দিনের শেষ রাত পর্যন্ত চলেছে ঘূর্ণন।

অভিজ্ঞতার বাইরে সেমাকে বোঝা কঠিন
বুলগেরিয়া থেকে আসা ৫৯ বছর বয়সী এলেনা বোগোস্লোভোভা বহু বছর আগে মাদকাসক্তির জীবন থেকে বেরিয়ে এসে মৃত্যুর কাছাকাছি এক অভিজ্ঞতার পর সুফিবাদের সন্ধান পান। পরে তুমাতার সংগীতের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং তিনি তুরস্কে এই ধরনের সমাবেশে আসতে শুরু করেন।
গত ১৭ বছরে তিনি বহুবার এমন আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। তার কাছে এই ধারার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ভালোবাসা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের বাস্তব অনুভূতি।
তিনি মনে করেন, সেমা নিয়ে শুধু কথা বলে এর প্রকৃত অর্থ বোঝানো সম্ভব নয়। এটি দেখতে পাওয়া যায়, এর ইতিহাস জানা যায়, কিন্তু নিজের ভেতরে অনুভব করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। সেই অভিজ্ঞতা ছাড়া বাইরে থেকে তাকালে হয়তো মনে হতে পারে, কিছু মানুষ কেবল উন্মাদের মতো ঘুরছে।
তুরস্কের এই সাত দিন-রাতের সমাবেশ তাই শুধু একটি ধর্মীয় আচার বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না। প্রাচীন সুফি ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, সংগীত, নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ এবং মুক্ত আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার এক ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা হিসেবেই এটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তুরস্কের পাইনবনের নীরবতার মধ্যে অবিরাম ঘূর্ণনের সেই দৃশ্য যেন একই সঙ্গে অতীত ও বর্তমানকে যুক্ত করেছে—যেখানে শতাব্দীপ্রাচীন এক সাধনা নতুন মানুষের হৃদয়ে নতুন অর্থ খুঁজে নিচ্ছে।
সাত দিন-রাতের ঘূর্ণি থেমেছে, কিন্তু সেই আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান থামেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















