০১:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
শ্রীলঙ্কায় ৩ কেজির বেশি ওজনের বিশাল মূত্রথলির পাথর অপসারণ, রেকর্ডের দাবি নোনতা বাদাম ও চকোলেটের খসখসে কুকি রুটি-বিদ্যুৎহীন কিউবা: আর কতটা সহ্য করতে পারবেন সাধারণ মানুষ? মঞ্চে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন তারা এরাউট: সমালোচনা পেরিয়ে রসিনির অপেরায় নতুন সাফল্য সন্ত ফ্রান্সিসের চরিত্রে ডুব দিতে দুই মাস সন্ন্যাসীদের সঙ্গে শিল্পীর জীবন প্রযুক্তি জায়ান্টদের মুনাফায় নতুন ঝুঁকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজার কি ‘চক্রাকার’ ফাঁদে? নটর ডেমে নতুন রঙিন কাচের জানালা, ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতার তীব্র বিতর্ক জর্জ মাইকেলের হারিয়ে যাওয়া কনসার্ট ফিরছে পর্দায় তুরস্কের পাহাড়ি নির্জনতায় সাত দিন-রাতের ঘূর্ণি, সবার জন্য উন্মুক্ত সুফি সাধনা চীনের তথ্যভাণ্ডার দিয়ে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা

মলদোভা দখলের নীলনকশা! নির্বাচন ঘিরে রাশিয়ার ভয়ংকর ষড়যন্ত্র ফাঁস

ইউরোপের ছোট দেশ মলদোভাকে অস্থিতিশীল করে নিজেদের প্রভাববলয়ে নেওয়ার জন্য রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে যে ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত তৎপরতা চালিয়েছে, তার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। নির্বাচনে হস্তক্ষেপ, ভোট কেনাবেচা, অপপ্রচার, সাইবার হামলা, ধর্মীয় নেতাদের ব্যবহার এবং সহিংসতার প্রশিক্ষণ—সব মিলিয়ে মস্কোর এই পরিকল্পনা ছিল বহুমাত্রিক।

মলদোভা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ায় দেশটিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে বলে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই দেশটি ইউক্রেন ও পশ্চিমা জোটভুক্ত দেশগুলোর মাঝখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

অবকাশযাপনের আড়ালে সহিংসতার প্রশিক্ষণ

রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সার্বিয়ার একটি প্রত্যন্ত অবকাশকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তুলেছিল। বাইরে থেকে সেটি অনেকটা গ্রীষ্মকালীন আনন্দভ্রমণের আয়োজনের মতোই মনে হতো। সেখানে ছিল বারবিকিউ, সমুদ্রসৈকতে খেলাধুলা এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা।

কিন্তু আড়ালে চলত সম্পূর্ণ ভিন্ন কর্মকাণ্ড। অংশগ্রহণকারীদের পুলিশি বাধা ভেঙে এগিয়ে যাওয়া, ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। সামরিক পোশাক পরে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও।

তিন দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষকদের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক ছিল। লক্ষ্য ছিল নির্বাচনের দিন বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য প্রশিক্ষিত একটি সংঘবদ্ধ দল গড়ে তোলা।

Moldovans face drinking water cut-off after Dniester oil spill

মস্কোর বাইরে আরও প্রশিক্ষণ শিবির

সার্বিয়ার শিবিরটি ছিল এমন কয়েকটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের একটি। মস্কোর কাছেও একটি শিবির পরিচালিত হচ্ছিল, যেখানে শতাধিক তরুণ মলদোভানকে আগুন ধরানোর উপকরণ ও ঘরে তৈরি বিস্ফোরক তৈরি ও ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে মলদোভান কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া বিস্ফোরক বা অগ্নিসংযোগের কাজে বিশেষভাবে পরিবর্তিত যন্ত্রচালিত উড়ন্ত যন্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে ফেরার সময় তিন মলদোভানকে আটক করা হয়। তাদের কাছে এমন উড়ন্ত যন্ত্রের যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়, যেগুলো দিয়ে বিস্ফোরক নিক্ষেপ করা সম্ভব ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

ভোট কেনাবেচায় কোটি কোটি ডলার

রাশিয়ার পরিকল্পনার আরেকটি বড় অংশ ছিল অর্থের বিনিময়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা। এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাশিয়ায় বসবাসরত মলদোভান ধনকুবের ইলান শোরের নাম উঠে এসেছে।

তদন্তে পাওয়া নথি অনুযায়ী, শোরের সহযোগীরা হাজার হাজার মলদোভানের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তাদের নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো এবং প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু ও তাঁর দলকে বিরোধিতা করার নির্দেশ দেওয়া হতো।

২০২৪ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রশ্নে গণভোটের আগের চার মাসে প্রায় ৩৮ হাজার কর্মীকে মোট প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়া হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

আরও বড় পরিসরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মলদোভানকে এই প্রভাব বিস্তারকারী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়েছিল বলে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও মলদোভান তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

Moldova says briefly shut airspace after fresh drone breach | Arab News

সাজানো বিক্ষোভে ঝাড়ু হাতে মানুষ

২০২৫ সালের জুলাইয়ে মলদোভার তারাক্লিয়া শহরে একটি বিক্ষোভ হয়েছিল। বাইরে থেকে সেটিকে স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন মনে হলেও তদন্তে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে।

রাশিয়া থেকে পরিচালিত শোরের সহযোগীরা বিক্ষোভের আগে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের জেলা পরিষদ ভবনের সামনে ঝাড়ু হাতে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল প্রতীকীভাবে সরকারবিরোধী বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।

তদন্তকারীদের হাতে আসা নথিতে দেখা যায়, মস্কো থেকে এই কর্মকাণ্ড সমন্বয় করা হচ্ছিল এবং অর্থ, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

ধর্মীয় নেতাদেরও ব্যবহারের অভিযোগ

রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনায় ধর্মীয় নেতাদেরও যুক্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্ম থেকে কয়েকশ মলদোভান ধর্মযাজক রাশিয়া সফর করেন। সেখানে ধর্মীয় স্থাপনা পরিদর্শনের পাশাপাশি রুশ ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ হয়।

ফেরার আগে অনেক ধর্মযাজক রুশ একটি ব্যাংকের অর্থকার্ডসংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বলে তদন্তে পাওয়া নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বিনিময়ে তাদের মলদোভায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিরোধিতা এবং রাশিয়াপন্থী রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচারের জন্য অর্থ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিজনকে প্রায় এক হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল বলে মলদোভান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

নির্বাচনের দিন বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার প্রস্তুতি

Ilan Shor: The Kremlin's New Man In Moldova

২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মলদোভার সংসদীয় নির্বাচনের দিন রাশিয়ার বিভিন্ন তৎপরতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

সার্বিয়ায় প্রশিক্ষিত কর্মীদের রাজধানী কিশিনাউসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তাদের আলাদা করে শনাক্ত করার জন্য হলুদ ও নীল বাহুবন্ধনী ব্যবহারের পরিকল্পনাও ছিল। কয়েকজনের কাছে অগ্নিসংযোগের উপকরণ ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

একই সময়ে রুশ সাইবার হামলাকারীরা মলদোভার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল এবং হাজার হাজার ব্যক্তিগত ইন্টারনেট যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে মলদোভান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় পরিকল্পনা

তবে মলদোভান কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে পুলিশ শত শত বাড়িতে অভিযান চালায়। প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নেওয়া কিংবা অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়।

পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় মলদোভার সাইবার বিশেষজ্ঞরা সাইবার হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হন। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হলেও বড় ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েনি।

শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দুর দল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়। বিদেশে থাকা মলদোভানদের ভোট এই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Moldova pursues neutrality, EU membership amid Ukraine war

মলদোভা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেনের পর মলদোভা রুশ নেতৃত্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা উত্তর আটলান্টিক জোটের সদস্য না হলেও ইউক্রেনের পাশেই অবস্থিত এবং পশ্চিমা জোটের সদস্য দেশগুলোর কাছাকাছি।

রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে মলদোভা গেলে ইউক্রেন কিংবা ইউরোপের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ আগ্রাসনের জন্য দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চল দখল করে রাশিয়া মলদোভার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার সঙ্গে একটি স্থলপথ তৈরির পরিকল্পনা ধরে রেখেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

রাশিয়ার অস্বীকার

মলদোভায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।

অন্যদিকে মলদোভার পশ্চিমাপন্থী সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় রুশ চাপ আরও বাড়ছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা মনে করছেন।

মলদোভার নির্বাচন শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার পরিকল্পনাকে পুরোপুরি সফল হতে দেয়নি। কিন্তু নির্বাচনের আগে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা, জনমত ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর যে ব্যাপক চাপ তৈরি করা হয়েছিল, তাতে স্পষ্ট—ছোট এই দেশটিকে ঘিরে মস্কোর কৌশল কেবল একটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং দীর্ঘমেয়াদে মলদোভার রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দেওয়াই ছিল এর বড় লক্ষ্য।

 

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীলঙ্কায় ৩ কেজির বেশি ওজনের বিশাল মূত্রথলির পাথর অপসারণ, রেকর্ডের দাবি

মলদোভা দখলের নীলনকশা! নির্বাচন ঘিরে রাশিয়ার ভয়ংকর ষড়যন্ত্র ফাঁস

১২:৪৭:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

ইউরোপের ছোট দেশ মলদোভাকে অস্থিতিশীল করে নিজেদের প্রভাববলয়ে নেওয়ার জন্য রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে যে ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত তৎপরতা চালিয়েছে, তার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। নির্বাচনে হস্তক্ষেপ, ভোট কেনাবেচা, অপপ্রচার, সাইবার হামলা, ধর্মীয় নেতাদের ব্যবহার এবং সহিংসতার প্রশিক্ষণ—সব মিলিয়ে মস্কোর এই পরিকল্পনা ছিল বহুমাত্রিক।

মলদোভা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ায় দেশটিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে বলে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই দেশটি ইউক্রেন ও পশ্চিমা জোটভুক্ত দেশগুলোর মাঝখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

অবকাশযাপনের আড়ালে সহিংসতার প্রশিক্ষণ

রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সার্বিয়ার একটি প্রত্যন্ত অবকাশকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তুলেছিল। বাইরে থেকে সেটি অনেকটা গ্রীষ্মকালীন আনন্দভ্রমণের আয়োজনের মতোই মনে হতো। সেখানে ছিল বারবিকিউ, সমুদ্রসৈকতে খেলাধুলা এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা।

কিন্তু আড়ালে চলত সম্পূর্ণ ভিন্ন কর্মকাণ্ড। অংশগ্রহণকারীদের পুলিশি বাধা ভেঙে এগিয়ে যাওয়া, ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। সামরিক পোশাক পরে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও।

তিন দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষকদের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক ছিল। লক্ষ্য ছিল নির্বাচনের দিন বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য প্রশিক্ষিত একটি সংঘবদ্ধ দল গড়ে তোলা।

Moldovans face drinking water cut-off after Dniester oil spill

মস্কোর বাইরে আরও প্রশিক্ষণ শিবির

সার্বিয়ার শিবিরটি ছিল এমন কয়েকটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের একটি। মস্কোর কাছেও একটি শিবির পরিচালিত হচ্ছিল, যেখানে শতাধিক তরুণ মলদোভানকে আগুন ধরানোর উপকরণ ও ঘরে তৈরি বিস্ফোরক তৈরি ও ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে মলদোভান কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া বিস্ফোরক বা অগ্নিসংযোগের কাজে বিশেষভাবে পরিবর্তিত যন্ত্রচালিত উড়ন্ত যন্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে ফেরার সময় তিন মলদোভানকে আটক করা হয়। তাদের কাছে এমন উড়ন্ত যন্ত্রের যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়, যেগুলো দিয়ে বিস্ফোরক নিক্ষেপ করা সম্ভব ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

ভোট কেনাবেচায় কোটি কোটি ডলার

রাশিয়ার পরিকল্পনার আরেকটি বড় অংশ ছিল অর্থের বিনিময়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা। এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাশিয়ায় বসবাসরত মলদোভান ধনকুবের ইলান শোরের নাম উঠে এসেছে।

তদন্তে পাওয়া নথি অনুযায়ী, শোরের সহযোগীরা হাজার হাজার মলদোভানের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তাদের নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো এবং প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু ও তাঁর দলকে বিরোধিতা করার নির্দেশ দেওয়া হতো।

২০২৪ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রশ্নে গণভোটের আগের চার মাসে প্রায় ৩৮ হাজার কর্মীকে মোট প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়া হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

আরও বড় পরিসরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মলদোভানকে এই প্রভাব বিস্তারকারী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়েছিল বলে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও মলদোভান তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

Moldova says briefly shut airspace after fresh drone breach | Arab News

সাজানো বিক্ষোভে ঝাড়ু হাতে মানুষ

২০২৫ সালের জুলাইয়ে মলদোভার তারাক্লিয়া শহরে একটি বিক্ষোভ হয়েছিল। বাইরে থেকে সেটিকে স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন মনে হলেও তদন্তে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে।

রাশিয়া থেকে পরিচালিত শোরের সহযোগীরা বিক্ষোভের আগে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের জেলা পরিষদ ভবনের সামনে ঝাড়ু হাতে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল প্রতীকীভাবে সরকারবিরোধী বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।

তদন্তকারীদের হাতে আসা নথিতে দেখা যায়, মস্কো থেকে এই কর্মকাণ্ড সমন্বয় করা হচ্ছিল এবং অর্থ, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

ধর্মীয় নেতাদেরও ব্যবহারের অভিযোগ

রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনায় ধর্মীয় নেতাদেরও যুক্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্ম থেকে কয়েকশ মলদোভান ধর্মযাজক রাশিয়া সফর করেন। সেখানে ধর্মীয় স্থাপনা পরিদর্শনের পাশাপাশি রুশ ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ হয়।

ফেরার আগে অনেক ধর্মযাজক রুশ একটি ব্যাংকের অর্থকার্ডসংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বলে তদন্তে পাওয়া নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বিনিময়ে তাদের মলদোভায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিরোধিতা এবং রাশিয়াপন্থী রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচারের জন্য অর্থ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিজনকে প্রায় এক হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল বলে মলদোভান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

নির্বাচনের দিন বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার প্রস্তুতি

Ilan Shor: The Kremlin's New Man In Moldova

২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মলদোভার সংসদীয় নির্বাচনের দিন রাশিয়ার বিভিন্ন তৎপরতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

সার্বিয়ায় প্রশিক্ষিত কর্মীদের রাজধানী কিশিনাউসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তাদের আলাদা করে শনাক্ত করার জন্য হলুদ ও নীল বাহুবন্ধনী ব্যবহারের পরিকল্পনাও ছিল। কয়েকজনের কাছে অগ্নিসংযোগের উপকরণ ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

একই সময়ে রুশ সাইবার হামলাকারীরা মলদোভার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল এবং হাজার হাজার ব্যক্তিগত ইন্টারনেট যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে মলদোভান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় পরিকল্পনা

তবে মলদোভান কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে পুলিশ শত শত বাড়িতে অভিযান চালায়। প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নেওয়া কিংবা অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়।

পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় মলদোভার সাইবার বিশেষজ্ঞরা সাইবার হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হন। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হলেও বড় ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েনি।

শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দুর দল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়। বিদেশে থাকা মলদোভানদের ভোট এই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Moldova pursues neutrality, EU membership amid Ukraine war

মলদোভা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেনের পর মলদোভা রুশ নেতৃত্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা উত্তর আটলান্টিক জোটের সদস্য না হলেও ইউক্রেনের পাশেই অবস্থিত এবং পশ্চিমা জোটের সদস্য দেশগুলোর কাছাকাছি।

রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে মলদোভা গেলে ইউক্রেন কিংবা ইউরোপের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ আগ্রাসনের জন্য দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চল দখল করে রাশিয়া মলদোভার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার সঙ্গে একটি স্থলপথ তৈরির পরিকল্পনা ধরে রেখেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

রাশিয়ার অস্বীকার

মলদোভায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।

অন্যদিকে মলদোভার পশ্চিমাপন্থী সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় রুশ চাপ আরও বাড়ছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা মনে করছেন।

মলদোভার নির্বাচন শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার পরিকল্পনাকে পুরোপুরি সফল হতে দেয়নি। কিন্তু নির্বাচনের আগে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা, জনমত ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর যে ব্যাপক চাপ তৈরি করা হয়েছিল, তাতে স্পষ্ট—ছোট এই দেশটিকে ঘিরে মস্কোর কৌশল কেবল একটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং দীর্ঘমেয়াদে মলদোভার রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দেওয়াই ছিল এর বড় লক্ষ্য।