চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শুধু উন্নত প্রযুক্তি ও শক্তিশালী যন্ত্র তৈরির ওপর নির্ভর করতে চাইছে না; বরং বিশ্বের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল তথ্যের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হতে চাইছে। দেশটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইতিহাস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, আইন, সাহিত্য, শিল্প ও সমসাময়িক ঘটনাসহ নানা বিষয়ের বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্বের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
চীনের এই উদ্যোগকে বিশ্লেষকেরা একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাঁদের আশঙ্কা, চীনের রাষ্ট্রীয় বয়ানসমৃদ্ধ তথ্য যদি ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার প্রশিক্ষণ উপকরণের বড় অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ যে তথ্য ও উত্তর পাবে, তাতেও বেইজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব বাড়তে পারে।
ইংরেজিনির্ভর তথ্যের ভারসাম্য বদলাতে চায় বেইজিং
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান ব্যবস্থাগুলোর বড় অংশই ইংরেজি ভাষার বিপুল তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত। চীনের দৃষ্টিতে এটি একটি কৌশলগত দুর্বলতা। কারণ মানবাধিকার, তাইওয়ানের অবস্থান কিংবা চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে এসব ব্যবস্থার উত্তর দিতে গিয়ে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের গবেষকেরা কয়েক বছর আগে একটি পরীক্ষায় দেখেছিলেন, তৎকালীন কথোপকথনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চীনা ভাষার প্রশ্নের উত্তরে বেশ কিছু মৌলিক ভুল করছিল। এমনকি বাস্কেটবলের সাবেক তারকা ইয়াও মিংকে যুক্তরাষ্ট্রে পেশাদার বাস্কেটবল খেলা প্রথম চীনা নারী হিসেবে বর্ণনা করেছিল। চীনা সাহিত্যের দুটি বিখ্যাত রচনাকেও গুলিয়ে ফেলেছিল সেটি।

চীনা গবেষকদের অভিযোগ ছিল, ব্যবস্থাটি চীন সম্পর্কে পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য তৈরি করছিল এবং চীনের রাজনৈতিক বিষয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছিল না। যদিও এরপর প্রযুক্তিটি বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে, ওই পরীক্ষা চীনের একটি মৌলিক উদ্বেগকে স্পষ্ট করেছিল—ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত কোন দেশের তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শেখবে।
২০২৮ সালের মধ্যে তথ্যশক্তিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য
চীনের জাতীয় তথ্য প্রশাসন চলতি বছর এমন একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যার লক্ষ্য ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ দেশটিকে বৈশ্বিক তথ্যশক্তিতে পরিণত করা। পরিকল্পনায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা, শিল্প উৎপাদন, স্বয়ংক্রিয় যানসহ দুই ডজনের বেশি কৌশলগত ক্ষেত্রে উচ্চমানের তথ্যভাণ্ডার তৈরির কথা বলা হয়েছে।
এসব তথ্য শুধু দেশের ভেতরে ব্যবহারের জন্য রাখা হবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। সাংহাইয়ে আয়োজিত বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে অংশ নেওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তথ্য সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বেইজিং।
এরই মধ্যে চীনের সরকারি গবেষণাগার ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সংগৃহীত বিপুল তথ্যের কিছু অংশ বিশ্বব্যাপী ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
তথ্যের ঘাটতি কাটাতেও বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ
চীনে বিপুল পরিমাণ তথ্য থাকলেও সেই তথ্য সহজে ব্যবহার করা যায় না। সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থায় সংরক্ষিত। ফলে গবেষকদের প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন তথ্য এক জায়গায় পাওয়া কঠিন।
চীনের জাতীয় তথ্য প্রশাসন এই বিচ্ছিন্ন তথ্যভাণ্ডারগুলোকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য ভাগাভাগির সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে চীন তথ্য বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী তৈরির দিকেও নজর দিচ্ছে। আগে যেখানে সাধারণ ও তুলনামূলক কম দক্ষতার তথ্য চিহ্নিতকরণের কাজ বেশি গুরুত্ব পেত, এখন গণিত, আইন ও অন্যান্য বিশেষায়িত ক্ষেত্রে জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে উন্নতমানের তথ্য প্রস্তুত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের তথ্য প্রস্তুতির প্রশিক্ষণ চালুর কথাও পরিকল্পনায় রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রচারণা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
চীনের তথ্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার উদ্যোগ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রচারণার প্রভাব নিয়ে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চীনের সরকারি বয়ানসমৃদ্ধ বিপুল তথ্য ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থায় ঢুকে পড়লে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি পরোক্ষভাবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।

চীনের নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাগুলোকে দেশটির কঠোর রাজনৈতিক নীতিমালা মেনে চলতে হয়। সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়ে সেগুলো অনেক সময় সরাসরি উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যায়। ফলে চীনা রাষ্ট্রীয় তথ্যভাণ্ডার যদি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাগুলোর প্রশিক্ষণে বড় ভূমিকা নেয়, তাহলে তথ্যের বৈচিত্র্য ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণাতেও দেখা গেছে, চীনা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কিছু উত্তর ইংরেজি উত্তরের তুলনায় চীনের প্রতি অনেক বেশি ইতিবাচক। গবেষকদের ধারণা, চীনা ভাষার তথ্যের ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে।
বিশাল তথ্যভাণ্ডার উন্মুক্ত করছে চীন
চীন ইতিমধ্যে কয়েকটি বড় তথ্যভাণ্ডার বিনা মূল্যে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়গুলোর একটি হলো ‘ওয়ানজুয়ান’, যার অর্থ প্রায় ‘দশ হাজার পুঁথি’। সাংহাইয়ের রাষ্ট্রসমর্থিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার তৈরি করা এই তথ্যভাণ্ডারে ইতিহাস, খেলাধুলা, আইন, সাম্প্রতিক ঘটনা, চিকিৎসা ও সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপকরণ রয়েছে।
তথ্যভাণ্ডারটি চীনের ‘মূলধারার মূল্যবোধের’ সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। চীনা ভাষার পাশাপাশি আরবি, কোরীয়, রুশ, থাই ও ভিয়েতনামি ভাষাতেও এর তথ্য রয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তুলনামূলক কম খরচের চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়তে থাকায় এসব তথ্যভাণ্ডারের আকর্ষণও বাড়তে পারে। এর ফলে প্রযুক্তিগত সুবিধার পাশাপাশি চীনা কোম্পানি ও বেইজিংয়ের প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা এখন তথ্যেরও
চীনের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা শুধু উন্নত মডেল, কম্পিউটিং ক্ষমতা কিংবা বিপুল অর্থ বিনিয়োগের লড়াই নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে উচ্চমানের তথ্যের নিয়ন্ত্রণ।
চীন যদি বিপুল ও বৈচিত্র্যময় তথ্যের একটি বড় বৈশ্বিক সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে, তাহলে একদিকে নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে পারবে, অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি অবকাঠামোর সঙ্গে নিজেদের তথ্য ও প্রযুক্তিকে গভীরভাবে যুক্ত করার সুযোগ পাবে।
এই কারণে চীনের তথ্যভাণ্ডার উন্মুক্ত করার উদ্যোগকে কেবল প্রযুক্তিগত সহযোগিতা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এটি ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর বিশ্বে তথ্য, প্রযুক্তি ও মতাদর্শ—তিন ক্ষেত্রেই চীনের প্রভাব বাড়ানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















