যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিবাসন নীতি, কাজের অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাইয়ের কারণে দেশটিতে কর্মরত ভারতীয় ও চীনা প্রযুক্তি পেশাজীবীদের একটি অংশ এখন নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে এইচ-১বি কর্মভিসাকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা অনেক দক্ষ কর্মীকে যুক্তরাষ্ট্রে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
১৫ বছর পর দেশে ফিরলেন দীপক
ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবী দীপক ১৫ বছর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর চলতি বছরের মে মাসে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ভারতে ফিরে গেছেন। গত বছরের অক্টোবরে চাকরি হারানোর পর তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ পেয়েছিলেন। তবুও যুক্তরাষ্ট্রে থাকার ঝুঁকি আর অভিবাসন নীতির অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত তাকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
এইচ-১বি ভিসায় থাকা কোনো কর্মী চাকরি হারালে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন নিয়োগকর্তা খুঁজে না পেলে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার ঝুঁকিতে পড়েন। দীপকের কাছে এই অনিশ্চয়তার তুলনায় ভারতে ফিরে যাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ মনে হয়েছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বাড়ি বিক্রির জন্য দিয়েছেন, আসবাবপত্র বিক্রি করেছেন এবং সন্তানদের জন্য ভারতে নতুন স্কুলের ব্যবস্থা করেছেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচটি ব্যাগ নিয়ে পরিবারটি কেরালায় পৌঁছায়।

দীপক এখন বেঙ্গালুরুর একটি প্রতিষ্ঠানে মাননিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জীবন ছেড়ে আসার কিছু অসুবিধা থাকলেও পরিবারের কাছাকাছি থাকার সুযোগ তাকে স্বস্তি দিয়েছে। তার ভাষায়, দেশে ফিরে আসাই ছিল তার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত।
বাড়ছে দেশে ফেরার সংখ্যা
বেঙ্গালুরুভিত্তিক জনবল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এক্সফেনোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৯ হাজার ৮০০ ভারতীয় পেশাজীবী বিদেশ থেকে ভারতে ফিরে এসেছিলেন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার ১০০। চলতি বছরেও এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার ৩০০ জন ফিরে এসেছেন।
প্রযুক্তি খাতের চাকরির বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ভারতে বেতন কম হতে পারে। তবে দেশে ফিরে আসা অনেক পেশাজীবী এখন ভারতের বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ও গবেষণাকেন্দ্রে সুযোগ পাচ্ছেন।
ভারতে প্রায় দুই হাজার বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ২০২৩ সাল থেকে প্রতিবছর সম্মিলিতভাবে প্রায় এক লাখ কর্মী নিয়োগ হয়েছে। গত এক বছরে শীর্ষ ১২৫টি কেন্দ্রে এক দশকের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রায় সাত হাজার মধ্য ও জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের প্রযুক্তি পেশাজীবী যোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮০০ জন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরেছেন।
ভিসা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এই ভিসার মাধ্যমে ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করে থাকে।
তবে নতুন নীতির কারণে নিয়োগকর্তাদের জন্য বিদেশি কর্মী নিয়োগ আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠছে। নতুন এইচ-১বি আবেদনের জন্য এক লাখ মার্কিন ডলার ফি নির্ধারণের প্রস্তাব একসময় ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। পরে একটি মার্কিন ফেডারেল আদালত ওই নীতিকে বেআইনি ঘোষণা করলেও প্রশাসন বিদেশি কর্মীদের জন্য নিয়ম আরও কঠোর করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
এ ছাড়া এইচ-১বি ভিসার মেয়াদ বাড়ানো ও নবায়নের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত চার হাজার ডলার সারচার্জ আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
চাকরি কমছে, বাড়ছে প্রতিযোগিতা
ভিসা নীতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের দুর্বল চাকরির বাজারও বিদেশি কর্মীদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পুনর্গঠন, ছাঁটাই এবং নতুন নিয়োগ স্থগিত করার প্রবণতার কারণে বহু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ কমেছে।
চীনা নাগরিক ক্যারি এমন পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রতিষ্ঠানে তথ্য বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। তৃতীয় বছরে এইচ-১বি ভিসায় থাকা অবস্থায় জুনে তার চাকরি শেষ হয়ে যায়।
নতুন চাকরি খুঁজতে একসময় প্রতিদিন ৩০টি পর্যন্ত আবেদন করেছিলেন ক্যারি। এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে দিনে প্রায় পাঁচটিতে। আগস্টের শেষ নাগাদ নতুন নিয়োগকর্তা না পেলে তাকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হতে পারে।
তার ভাষায়, এইচ-১বি ভিসার পৃষ্ঠপোষকতা দিতে রাজি এমন প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।
চীনের প্রযুক্তি খাতও হয়ে উঠছে আকর্ষণীয়
চীনা প্রযুক্তি পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে নিজ দেশের দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি খাতও দেশে ফেরার বড় কারণ হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসাধারীদের মধ্যে ভারতীয়দের অংশ প্রায় ৭০ শতাংশ এবং চীনাদের প্রায় ১২ শতাংশ। তাদের বড় অংশই প্রযুক্তি খাতে কাজ করেন।
চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পড়াশোনা শেষ করে প্রায় ৫ লাখ ৩৬ হাজার শিক্ষার্থী দেশে ফিরে গেছেন। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
সিলিকন ভ্যালি থেকে চীনের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিভাদের দেশে ফেরার প্রবণতা শুধু অভিবাসন পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
‘গ্রিন কার্ডের’ অপেক্ষা আর আকর্ষণীয় নয়
চীনা প্রযুক্তি কর্মী বব যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। কর্মস্থল বদল ও ভিসা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতার পর তিনি আবার চীনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তার মতে, স্থায়ী বসবাসের অনুমতির আশায় ছয়-সাত বছর একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে আটকে রাখার বিষয়টি তার পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখন তিনি বেইজিংয়ে একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনে তার জীবনযাত্রার মান এখন অনেক ভালো।
নতুন বাস্তবতায় বদলে যাচ্ছে ‘আমেরিকান স্বপ্ন’
একসময় বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি প্রতিভাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ছিল উচ্চ বেতন, উন্নত গবেষণা ও উদ্ভাবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য। কিন্তু অভিবাসন নীতির কঠোরতা, চাকরি হারানোর পর ভিসা নিয়ে উদ্বেগ, প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাই এবং সামাজিক বৈরিতার কারণে সেই আকর্ষণ কিছুটা হলেও কমছে।
ভারত ও চীনের প্রযুক্তি খাত একই সময়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হওয়া অনেক দক্ষ কর্মীর কাছে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া এখন আর ক্যারিয়ারের পিছিয়ে পড়া নয়; বরং নতুন সুযোগের শুরু হিসেবে দেখা হচ্ছে।




















