ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর হাজারো মানুষ এখন জরুরি সহায়তার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। ১৫ আগস্ট ভোরে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ৫৩ জন নিহত এবং ১৩৫ জন আহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে শত শত বাড়িঘর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ভূমিকম্পের পর প্রায় এক হাজারবার পরাঘাত অনুভূত হওয়ায় আতঙ্কে অনেক মানুষ ঘরে ফিরতে পারছেন না।
পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছেন হাজারো মানুষ
ভূমিকম্পের পর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে যান। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সড়কও এখনো ব্যবহার অনুপযোগী রয়েছে।
ফ্লোরেসের উত্তর উপকূলের নাঙ্গাহালে গ্রামের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী উমরি জানান, তিনি অন্যদের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পাহাড়ের ওপর আশ্রয় নিয়ে আছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন তারা।
তার ভাষায়, শিশুদের জন্য খাবার, পানীয়, ওষুধ ও ন্যাপির জরুরি প্রয়োজন।

কিসোল গ্রামের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী বের্তোলোমেউস তিগার বাড়িও ভূমিকম্পে ধসে পড়েছে। স্থানীয় গির্জার একটি অংশও ভেঙে পড়ে। তিনি জানান, পুলিশ ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করলেও তখনো তাদের কাছে কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। গ্রামের মানুষের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন খাবার, পানি ও ওষুধ।
শত শত বাড়ি ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র বের্তন সুয়ার পেলিতা পানজাইতান জানান, দ্বীপটিতে অন্তত ৯১৪টি বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরও কয়েক শ বাড়ি অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতির শিকার হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সরকারি কার্যালয়সহ বহু জনসেবামূলক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৩৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৩৮টি সরকারি কার্যালয় রয়েছে।
উদ্ধারকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্গতদের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জরুরি তাঁবু, খাবার, ওষুধ, কম্বল, শয্যা, মাদুর, বিশুদ্ধ পানি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্র।
দুর্গত এলাকায় যাচ্ছে উদ্ধারকারী দল
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান সুহারিয়ান্তো জানান, অন্তত পাঁচটি হেলিকপ্টার, কয়েকটি বিমান, একটি নৌবাহিনীর জাহাজ এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী জাহাজ দুর্গত এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার ত্রাণসামগ্রীর প্যাকেট পাঠানো হয়েছে, যার মোট ওজন প্রায় ২৭৫ টন। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা হাজারো মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে উপগ্রহভিত্তিক ভূমি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।
হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁবুতে চলছে চিকিৎসা
রুতেং শহরের একটি হাসপাতাল ভূমিকম্পে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রোগীদের বাইরে স্থাপন করা তাঁবুতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই একটি অক্ষত গুদামঘরকে অস্থায়ী অস্ত্রোপচারকক্ষে রূপান্তর করে এক নারীর জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়।
হাসপাতালের মুখপাত্র জানান, অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে এবং মা ও নবজাতক দুজনেই নিরাপদ আছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরাঘাত কখন থামবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে না গিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সুনামির আশঙ্কায় উপকূল ছেড়েছিলেন বাসিন্দারা
মূল ভূমিকম্পের পর ফ্লোরেসের বাসিন্দাদের একটি অংশ পাহাড়ের দিকে ছুটে যান। সে সময় সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে সরে যাওয়ায় সম্ভাব্য সুনামির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। পরে সুনামির সতর্কতা প্রত্যাহার করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে না যাওয়ার নির্দেশ বহাল রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, নতুন করে শক্তিশালী পরাঘাত হলে দুর্বল হয়ে পড়া ভবন ও স্থাপনা আরও ধসে পড়তে পারে। ফলে হাজারো মানুষকে আপাতত খোলা আকাশের নিচে কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হচ্ছে।
ফ্লোরেসে এখন উদ্ধারকাজের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও নিরাপদ আশ্রয় পৌঁছে দেওয়া।
ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেসে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ৫৩ জন নিহত এবং ১৩৫ জন আহত হয়েছেন। হাজারো মানুষ ঘরছাড়া হয়ে জরুরি ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















