মাত্র ৪০ বছর বয়সে হঠাৎ জানা গেল, তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে বিরল এক ধরনের ক্যানসার। এরপর একের পর এক অস্ত্রোপচার, দীর্ঘ চিকিৎসা, বিবাহবিচ্ছেদ, আবার নতুন করে সম্পর্ক ও সংসার—সব মিলিয়ে জীবনের কঠিন সময়গুলো পেরিয়ে আজ নতুনভাবে বাঁচার অর্থ খুঁজে পেয়েছেন সিঙ্গাপুরের উদ্যোক্তা মার্কাস চিয়াং।
২০১৯ সালের জুনে বিয়ের মাত্র ছয় মাস পর তীব্র পেটব্যথায় কাবু হয়ে পড়েন চিয়াং। তখন তিনি মালয়েশিয়ার ইপোহে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সঙ্গে ছিলেন। হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর ক্ষুদ্রান্ত্রে একটি অস্বাভাবিক পিণ্ডের সন্ধান মেলে।
সিঙ্গাপুরে ফিরে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে যাওয়ার পর তাঁকে জাতীয় ক্যানসার কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানেই ধরা পড়ে বিরল ক্যানসার—পরিপাকতন্ত্রের স্ট্রোমাল টিউমার।
বিরল ক্যানসার, কঠিন বাস্তবতা
এই রোগটি এক ধরনের সারকোমা, যা সাধারণত পাকস্থলী বা অন্ত্রে শুরু হয়। জিনগত পরিবর্তনের কারণে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি থেকে এ ধরনের টিউমার তৈরি হতে পারে।
রোগটি বিরল হলেও দ্রুত শনাক্ত করা গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে ভালো। অনেক সময় রোগের শুরুতে কোনো উপসর্গও দেখা যায় না। পরে পেট ফাঁপা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা কিংবা মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
চিয়াংয়ের বয়সও ছিল অস্বাভাবিকভাবে কম। সাধারণত এই রোগ ষাট বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে অস্ত্রোপচার করে তাঁর ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে টিউমারটি অপসারণ করা হয়। তবে তাঁর ক্ষেত্রে পুনরায় টিউমার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকায় কয়েক বছর ধরে মুখে খাওয়ার ওষুধ ইমাটিনিব নিতে হয়।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের মাঝেই ভেঙে যায় সংসার
রোগ নির্ণয়ের পর চিয়াং নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন। রোগটি এতটাই বিরল ছিল যে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মতো মানুষও খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
এর কিছুদিন পরই কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হয়। সিঙ্গাপুরের স্থলসীমান্ত বন্ধসহ নানা ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তাঁর দাম্পত্য জীবনও ভেঙে যায়। ২০২২ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়।
তবু পরিস্থিতির কাছে হার মানেননি তিনি। জাতীয় ক্যানসার কেন্দ্রের মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসা-সামাজিক কর্মীদের কাছ থেকে মানসিক সহায়তা নেন। পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে স্মার্ট নগর নকশা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
অসুস্থতা থেকেই স্বাস্থ্যসচেতনতার নতুন শুরু
ক্যানসার ধরা পড়ার আগে শরীরচর্চা বা স্বাস্থ্য নিয়ে খুব একটা ভাবতেন না চিয়াং। কিন্তু রোগ তাঁকে নিজের জীবনযাপন নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
খাদ্যাভ্যাস বদলানোর পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করেন। স্বাস্থ্য ও শরীরচর্চা নিয়ে পড়াশোনা করেন, বিভিন্ন আলোচনা শোনেন। এর ফলও আসে দ্রুত। প্রায় ২০ কেজি ওজন কমিয়ে বহু বছরের মধ্যে নিজের সবচেয়ে ভালো শারীরিক অবস্থায় পৌঁছে যান তিনি।
২০২২ সালে একটি বিষয়বস্তু নির্মাণের প্রশিক্ষণ কোর্সে র্যাচেল টানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাঁদের সম্পর্ক গভীর হয়।
সুখের মুহূর্তের মাঝেই আবার ফিরে আসে টিউমার
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ইমাটিনিব বন্ধ করার প্রায় ছয় মাস পর নিয়মিত পরীক্ষায় ক্ষুদ্রান্ত্রে পাঁচ সেন্টিমিটারের আরেকটি টিউমার ধরা পড়ে।
টান জানতেন রোগটি আবার ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে। তারপরও খবরটি তাঁদের দুজনকেই ভেঙে দেয়। পরিচয়ের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই আবার ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই—পরিস্থিতিটিকে তাঁর কাছে অবাস্তব মনে হয়েছিল।
২০২৩ সালের নভেম্বরে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করে টিউমার অপসারণ করা হয়। এরপর আবার শুরু হয় ইমাটিনিব সেবন।
কিন্তু লড়াই তখনও শেষ হয়নি।
২০২৪ সালের আগস্টে নিয়মিত পরীক্ষায় যকৃত ও ডান কিডনির মধ্যবর্তী অংশে আরেকটি টিউমার ধরা পড়ে। ওষুধের মাত্রা বাড়ানো হয় এবং প্রায় নয় মাস নিবিড়ভাবে টিউমারটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাতেও টিউমার বাড়তে থাকায় ২০২৫ সালের মে মাসে তৃতীয়বার অস্ত্রোপচার করতে হয়।
এবারও অপসারণ করা হয় প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটারের টিউমার।
বর্তমানে চিয়াং ইমাটিনিব চালিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রতি চার মাস পরপর নিয়মিত পরীক্ষা করাচ্ছেন। সর্বশেষ পরীক্ষায় তাঁর শরীরে দৃশ্যমান কোনো টিউমার পাওয়া যায়নি।
মৃত্যুচিন্তা বদলে দিল জীবনের লক্ষ্য
ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই চিয়াংকে নিজের জীবন সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।
বিয়ের আগে সাধারণ দম্পতিরা যেখানে সন্তান, সংসার বা ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন, সেখানে চিয়াং ও টানকে আলোচনা করতে হয়েছে উইল এবং মৃত্যুর পর কী হবে—এসব কঠিন বিষয় নিয়ে।
অনেকের আপত্তি ও সতর্কবার্তা সত্ত্বেও তাঁরা একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁদের বিয়ে হয়।
এখন তাঁরা একসঙ্গে দুটি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। একটি স্বাস্থ্যকর খাবারভিত্তিক উদ্যোগ, অন্যটি আত্মঅনুসন্ধানমূলক কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ আয়োজন করে।
চিয়াংয়ের কাছে ক্যানসার শুধু একটি অসুস্থতার নাম নয়; এটি তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। এখন তিনি সময়কে আরও মূল্যবানভাবে কাজে লাগাতে চান।
তাঁর উপলব্ধি—পৃথিবীতে মানুষের হাতে থাকা সময় সীমিত। তাই সেই সময়টুকু কীভাবে অর্থবহ করে তোলা যায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















