যুক্তরাষ্ট্রে টেজার অস্ত্রের বাজারে দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব ধরে রাখা একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়িয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করতে চায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মনে করছেন, ভবিষ্যতের পুলিশিং শুধু অস্ত্র বা নজরদারির ওপর নির্ভর করবে না, বরং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত, স্বয়ংক্রিয় সহায়তা এবং উন্নত প্রযুক্তিই হবে মূল চালিকাশক্তি।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় প্রতি ৩০ সেকেন্ডে তাদের তৈরি একটি টেজার ব্যবহার করা হয়, যার বেশিরভাগই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে। গত দুই দশকে তারা শুধু বৈদ্যুতিক শক অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, পুলিশি সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন তাদের লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দ্রুত অগ্রগতি
প্রতিষ্ঠানটি এমন একাধিক প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা পুলিশ সদস্যদের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করবে। এর মধ্যে রয়েছে দেহে ধারণ করা ক্যামেরার শব্দ বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুলিশি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা এবং অভিযান চলাকালে তাৎক্ষণিকভাবে নীতিমালা বা নির্দেশনা জানিয়ে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পণ্য থেকে তাদের আয় গত বছরের তুলনায় ৭০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক এবং বিস্তৃত প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে সহজে প্রতিদ্বন্দ্বীরা সরিয়ে দিতে পারবে না।
বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ব্যবহার
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের ১৮ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা সংস্থা প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করছে। অধিকাংশ সংস্থা প্রতি সদস্যের জন্য বার্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে সেবা গ্রহণ করে। ভার্চুয়াল বাস্তবতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ড্রোন এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তির জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পুলিশ বিভাগে দেহে ধারণ করা ক্যামেরা, প্রমাণ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা এখন নিয়মিত কাজের অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, এসব প্রযুক্তি তদন্তে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি পুলিশ সদস্য ও সাধারণ নাগরিক—উভয় পক্ষের স্বার্থই রক্ষা করছে।
সবাই এখনো প্রস্তুত নয়
তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংশয়ও রয়েছে। অনেক পুলিশ বিভাগ এখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন ব্যবস্থায় পুরোপুরি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। তাদের মতে, প্রযুক্তির কার্যকারিতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যবহারকারীদের গ্রহণযোগ্যতা আরও স্পষ্ট হওয়ার পরই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অবশ্য আশাবাদী। তাঁর মতে, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে শুরুতে আপত্তি থাকলেও সময়ের সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। দেহে ধারণ করা ক্যামেরাও প্রথম দিকে অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও এখন তা আধুনিক পুলিশিংয়ের অপরিহার্য অংশ।
বিতর্কের মুখেও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে রোবট এবং টেজার-সজ্জিত ড্রোন ব্যবহারের ধারণা। তবে অতীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ড্রোন ব্যবহারের প্রস্তাব তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বিদ্যালয়ের জন্য টেজার-সজ্জিত ড্রোন তৈরির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
তবুও তারা বিশ্বাস করে, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও রোবট ভবিষ্যতে জননিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিরাপদ পুলিশিংয়ের নতুন লক্ষ্য
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর মতে, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যদের আরও কার্যকর তথ্য, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রের বিকল্প সরঞ্জাম দেওয়া সম্ভব। তাঁর বিশ্বাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে ভবিষ্যতের পুলিশিং হবে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং দক্ষ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি শুধু নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ধরন বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় পুলিশিংয়ে নতুন প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাতে বড় বিনিয়োগ করছে টেজার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, যদিও নিরাপত্তা ও নৈতিকতা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















