দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা, ভয়ভীতি ও জোরপূর্বক এলাকা ছাড়ার চাপ বাড়তে থাকায় হাজারো শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী ও অভিবাসী সরকারি ভবন, গির্জা এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও সহিংসতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনো সংগ্রাম করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
ডারবানে অনিশ্চয়তার দিন
মোজাম্বিক থেকে পালিয়ে আসা ৩৫ বছর বয়সী এক শরণার্থী দীর্ঘদিন ধরে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করছিলেন। সম্প্রতি একটি অভিবাসীবিরোধী সংগঠনের সদস্যরা তাকে কর্মস্থলের বাইরে ঘিরে মারধর করে বলে অভিযোগ। আহত হওয়ার পর তিনি আর কাজে ফিরতে পারেননি। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাসাভাড়াও দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের থাকার জায়গা হারান। নিরাপত্তার আশায় তিনি এখন অভিবাসন দপ্তরের বাইরে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন।
তার অভিযোগ, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তিনি যথাযথ সুরক্ষা পাচ্ছেন না। পুলিশের সঙ্গেও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার আলটিমেটাম
অভিবাসীবিরোধী একটি সংগঠন দাবি করছে, বিদেশিরা দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের কর্মসংস্থান ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নিচ্ছে। সংগঠনটি কাগজপত্রবিহীন বিদেশিদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, দেশের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা রক্ষায় কঠোর অভিবাসন নীতি প্রয়োজন।
এদিকে ক্রমবর্ধমান আতঙ্কের কারণে বহু বিদেশি নাগরিক সরকারি ভবনের সামনে অবস্থান করছেন কিংবা গির্জা ও পার্কে আশ্রয় নিচ্ছেন। বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের অভিবাসীর মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে।
সরকারের আশ্বাস, প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্বেগ
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, অন্যান্য আফ্রিকান দেশকে আশ্বস্ত করতে বিশেষ প্রতিনিধি পাঠানো হবে, যাতে তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমে। তবে কয়েকটি আফ্রিকান দেশ নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে বিমান ও বাসের ব্যবস্থা করেছে।
প্রেসিডেন্টের মতে, বেকারত্ব, অপরাধ ও দুর্বল জনসেবা ব্যবস্থার জন্য বিদেশিদের দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেছেন, এসব সমস্যার মূল কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধীরগতির প্রবৃদ্ধি এবং সেবাখাতের সীমাবদ্ধতা। তাই দুর্বল জনগোষ্ঠীকে দোষারোপ না করে কার্যকর সমাধানের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে বাড়ছে উত্তেজনা
আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি হলেও দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ বেকারত্ব বড় সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন আফ্রিকান দেশ থেকে আসা শ্রমিক এবং তাদের নিয়োগদাতারা হামলা, হুমকি ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতেও দেশটিতে অভিবাসীবিরোধী সহিংসতা দেখা গেছে। তবে এবার পরিস্থিতির বিস্তার ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা আগের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগজনক। ফলে শুধু বিদেশি নাগরিক নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক সম্পর্কও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ বেকারত্ব এবং সামাজিক অসন্তোষ একসঙ্গে মিলিত হলে অভিবাসন ইস্যু কত দ্রুত সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। পরিস্থিতি শান্ত করতে সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক সংহতি ও আইনের কার্যকর প্রয়োগকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় হাজারো বিদেশি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 









