চীন আরও ২০টি জাপানি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। বেইজিংয়ের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠান জাপানের ‘পুনরায় সামরিকীকরণ’ বা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। ফলে দুই দেশের মধ্যে চলমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সোমবার জানায়, নতুন তালিকায় জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ, একাধিক মিতসুবিশি-সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা ঠিকাদার এবং সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞায় কী থাকছে
এই তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে চীনা রপ্তানিকারকরা আর দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (ডুয়াল-ইউজ) পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন না। একই সঙ্গে বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও চীনা উৎসের এসব পণ্য তাদের কাছে স্থানান্তর করতে পারবেন না। বর্তমানে চলমান লেনদেনও অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, এই পদক্ষেপ ‘সম্পূর্ণ ন্যায্য, যৌক্তিক ও আইনসম্মত’। তাঁর ভাষ্য, জাপানের পুনরায় সামরিকীকরণ এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রচেষ্টা ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ডুয়াল-ইউজ পণ্য বলতে এমন প্রযুক্তি, উপকরণ বা সামগ্রীকে বোঝায়, যা বেসামরিক ও সামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায়। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে ব্যবহৃত বিরল খনিজ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চুম্বক তৈরির উপকরণও রয়েছে।
জাপানের কড়া প্রতিক্রিয়া
জাপানের চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি মিনোরু কিহারা এই সিদ্ধান্তকে ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, টোকিও আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কাছে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং এই ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার নতুন নিষেধাজ্ঞার বিষয়বস্তু ও সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

আরও ২০ প্রতিষ্ঠান নজরদারি তালিকায়
এর পাশাপাশি চীন আরও ২০টি জাপানি প্রতিষ্ঠানকে একটি বিশেষ নজরদারি তালিকায় যুক্ত করেছে। এই তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রপ্তানির আগে শেষ ব্যবহারকারী ও পণ্যের ব্যবহার সম্পর্কে কঠোর যাচাই করতে হবে।
রপ্তানিকারকদের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং লিখিত নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, এসব পণ্য জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হবে না।
কেন বাড়ছে উত্তেজনা
গত বছরের নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংকটে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করার পর থেকেই বেইজিং জাপানের বিরুদ্ধে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে শুরু করে।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতেও চীন ২০টি জাপানি প্রতিষ্ঠানকে একই ধরনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় যুক্ত করেছিল। সেই পদক্ষেপের ফলে জাপানের জন্য চীনা বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জাপান দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন এবং ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় প্রথমবারের মতো ভূমি থেকে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এসব পদক্ষেপকে কেন্দ্র করেই বেইজিং জাপানের প্রতিরক্ষা নীতির সমালোচনা আরও জোরালো করেছে।
চাপ আরও বাড়তে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে চাপ আরও বাড়তে পারে।
একজন নিরাপত্তা গবেষকের মতে, চীন সমন্বিতভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে এবং জাপানকে নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং জাপানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপও সেই কৌশলের অংশ বলে তিনি মনে করেন।
চলমান পরিস্থিতিতে টোকিও ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পরিবর্তে আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কাই বেশি বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 









