ফুটবলকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বকাপ এখন আর কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এটি এমন এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র, করপোরেট শক্তি, কূটনীতি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়। মাঠে খেলোয়াড়েরা গোলের জন্য লড়েন, কিন্তু মাঠের বাইরে সমান তীব্র লড়াই চলে প্রভাব বিস্তার, ভাবমূর্তি নির্মাণ এবং রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য।
বিশ্বকাপ আয়োজন বা শিরোপা জয় যে কোনো দেশের জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। জাতীয় গর্বের উচ্ছ্বাস সরকারগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করে। তবে এই প্রভাব সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নাগরিকদের দৈনন্দিন বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা রাজনৈতিক অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত উৎসবের আবহকে ছাপিয়ে যায়। তবু রাষ্ট্রগুলো কেন এই প্রতিযোগিতায় এত আগ্রহী? কারণ বিশ্বকাপ এখন বিশ্বজনমতের সামনে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার বিরল সুযোগ।
ফিফার বিকাশও একই সঙ্গে এই পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। একসময়ের ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা ধীরে ধীরে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে, যার সিদ্ধান্তে জড়িয়ে আছে বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ, বৈশ্বিক ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই প্রতিষ্ঠানের শাসনব্যবস্থা কি তার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পেরেছে?
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, কাগজে-কলমে নানা সংস্কার এলেও বাস্তব পরিচালনায় স্বাধীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়ে গেছে। নিয়ম থাকলেই যে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তা নয়। বরং কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়তে দরকার স্বাধীন তদারকি, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি। যদি এসব উপাদান দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে নিয়ম কেবল আনুষ্ঠানিক নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে।
ফিফার সাম্প্রতিক ইতিহাসও সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব কখনও সরাসরি, কখনও পরোক্ষভাবে ফুটবলের প্রশাসনে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অবস্থান কিংবা রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করছে—এমন ধারণা শক্তিশালী হয়েছে। এতে কেবল একটি ম্যাচ বা একটি টুর্নামেন্ট নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
ক্রীড়া সংস্থার সবচেয়ে বড় সম্পদ বিশ্বাসযোগ্যতা। সমর্থক, খেলোয়াড় এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলো যদি মনে করে যে সবার জন্য একই নিয়ম কার্যকর নয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করে। খেলাধুলার সৌন্দর্যই হলো সমান প্রতিযোগিতার নিশ্চয়তা। সেই বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো ব্যবস্থাই।
বর্তমান ফিফা নেতৃত্বকে ঘিরেও বিতর্কের শেষ নেই। সমর্থকদের একাংশ মনে করেন, সংগঠনটি আর্থিকভাবে আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে, নতুন বাজারে প্রবেশ করেছে এবং ফুটবলের অর্থনৈতিক পরিসর বিস্তৃত করেছে। অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ এবং রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ফিফাকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ব্যবসা ও ভূরাজনীতি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এটি কেবল ব্যক্তিগত নেতৃত্বের প্রশ্ন নয়; বরং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া পরিচালনার কাঠামোগত পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। বিশ্বায়নের নতুন পর্যায়ে বড় ক্রীড়া আয়োজনগুলো এখন অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলের অংশ। ফলে ফিফা যদি বৈশ্বিক ফুটবলের কেন্দ্র হয়, তবে তাকে অনিবার্যভাবেই বিশ্বের রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বিশ্বকাপ আয়োজনের ভূগোলেও বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকেন্দ্রিক যে ধারাটি ছিল, তা এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে এই প্রতিযোগিতাকে ব্যবহার করছে। এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের প্রতিফলনও বটে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—বৃহৎ ক্রীড়া আয়োজন কি সত্যিই একটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করে? এর উত্তর একক নয়। কোথাও এটি ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে, আবার কোথাও উল্টোভাবে শ্রমনীতি, মানবাধিকার কিংবা সামাজিক বিধিনিষেধ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বকাপ আয়োজন নিজেই সুনাম নিশ্চিত করে না; বরং বিশ্বের নজরকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে।
ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত এখানেই। ফিফা কি এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, যার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে থাকবে? নাকি আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতা আরও গভীরভাবে এর ভেতরে প্রবেশ করবে?
প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রশ্নে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য স্পষ্ট—যে সংগঠন পরিবর্তন চাইবে না, তাকে বাইরে থেকে সংস্কার করা কঠিন। তাই কেবল নতুন নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; দরকার এমন নেতৃত্ব, যারা বাস্তব অর্থে স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিকে প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে।
বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজবে, নতুন চ্যাম্পিয়ন ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে, কোটি সমর্থক আবারও পরবর্তী আসরের অপেক্ষায় থাকবে। কিন্তু ফুটবলের গল্প আর শুধুই মাঠের ৯০ মিনিটে সীমাবদ্ধ নেই। আজকের বিশ্বে এই খেলা একই সঙ্গে অর্থ, কূটনীতি, রাষ্ট্রশক্তি এবং বৈশ্বিক প্রভাবেরও প্রতিযোগিতা। তাই ফুটবলকে বোঝার জন্য এখন শুধু স্কোরবোর্ডের দিকে তাকালেই চলে না; নজর রাখতে হয় ক্ষমতার বৃহত্তর খেলাতেও।
মরিয়ম খান 



















