২০২৬ সালের ১৯ জুলাই—তারিখটি হয়তো চিরদিনের জন্য ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ হয়ে থাকবে। প্রতিটি বিশ্বকাপ ফাইনালই ঐতিহাসিক, কিন্তু রবিবার শেষ বাঁশি বাজলে আরেকটি প্রশ্নও সামনে চলে আসবে—এটাই কি বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ?
ফুটবলের প্রতি মেসির ভালোবাসা কখনোই শুধু খেলাটির অংশ হয়ে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি সবসময় মাঠে, বল পায়ে খেলতে চেয়েছেন। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার।
কোচিংয়ে যাওয়ার আগ্রহ তিনি প্রায় কখনোই দেখাননি। তাই মনে করা হয়, যতদিন সম্ভব খেলোয়াড় হিসেবেই ক্যারিয়ার বাড়িয়ে নেওয়াই তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। তবে বিদায়ের ইঙ্গিতও বহুদিন ধরেই মিলছে।

২০৩০ বিশ্বকাপ কি প্রলোভন হতে পারে?
২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হবে মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেনে। তবে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়েতেও একটি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বুয়েনস আইরেসে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার সুযোগ মেসিকে হয়তো আরও চার বছর খেলে যাওয়ার প্রেরণা দিতে পারে।
তবে প্রশ্ন হলো, তিনি কি তা চাইবেন? আর চাইলেও শারীরিকভাবে পারবেন?
২০৩০ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সময় রোজারিওতে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তির বয়স হবে প্রায় ৪৩ বছর।
যদিও তার খেলার ধরন আর আগের মতো গতিনির্ভর নয়, তবুও দীর্ঘ সময় ধরে ফিট থাকা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
আনন্দ না থাকলে খেলবেন না
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ম্যাচের পর মেসি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, তিনি ততদিনই খেলবেন, যতদিন খেলা তাকে আনন্দ দেবে।
তার ভাষায়,
“আমি নিজের সঙ্গে সৎ থাকি। যখন ভালো অনুভব করি, তখন খেলাটা উপভোগ করি। কিন্তু যখন পারি না, তখন অনেক কষ্ট হয়। তাই সে অবস্থায় খেলতে চাই না।”

সেই ম্যাচের আগে হাজারো সমর্থক স্টেডিয়ামে এসে বিশাল পতাকা, ট্যাটু ও নানা উপায়ে তাকে সম্মান জানালে আবেগে ভেঙে পড়েছিলেন মেসি।
তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরোকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামার পর তিনি বলেছিলেন,
“মাঠে ঢোকার সময় অনেক স্মৃতি মনে পড়ছিল। জানতাম, আর্জেন্টিনায় এটাই সম্ভবত আমার শেষ অফিসিয়াল ম্যাচ। এই মাঠে অনেক কিছু দেখেছি—ভালোও, খারাপও। কিন্তু নিজের দেশের দর্শকদের সামনে খেলতে পারা সবসময়ই বিশেষ আনন্দের।”
অবসরের ইঙ্গিত নতুন নয়
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের আগেও মেসি বলেছিলেন,
“সম্ভবত এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ।”
তখন তার বয়স ছিল ৩৫ বছর। তিনি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন এবং প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের হয়ে খেলছিলেন। কাতারে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ের পর মনে হয়েছিল, তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,
“যেটা সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলাম, ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে সেটা পেয়েছি। কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ—দুটোই জিতেছি। যেন জীবনের একটি পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন হয়েছে।”
অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এরপর ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেওয়া ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত জীবন বেছে নেওয়ার অংশ এবং অবসর আর বেশি দূরে নয়।
কিন্তু মেসি আবারও সবাইকে চমকে দেন।
ইন্টার মিয়ামিতে দ্রুত সাফল্য পাওয়ার পর তিনি ২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকা জেতেন। যদিও ফাইনালে চোট পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, তবুও সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করে শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ভেনেজুয়েলা ম্যাচের পরও যখন তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলেছিলেন, তখনও খুব কম মানুষই ধারণা করতে পেরেছিল যে তিনি আবারও অসাধারণ একটি বিশ্বকাপ খেলবেন। এই আসরে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার নতুন রেকর্ড গড়েছেন এবং আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছেন।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা
রবিবারের ফাইনালের ফল যাই হোক, বিশ্বকাপ ইতিহাসে মেসির অবস্থান ইতোমধ্যেই নিশ্চিত।
স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামলেই তিনি ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর সঙ্গে বিশ্বকাপের তিনটি ফাইনাল খেলা মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হবেন। তবে তিনটি ফাইনালেই শুরুর একাদশে থাকা একমাত্র খেলোয়াড় হবেন মেসিই।
২০০৬ থেকে ২০২৬: এক অবিশ্বাস্য যাত্রা
২০০৬ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে হোসে পেকারম্যানের দলে বিশ্বকাপ অভিষেক হয় মেসির। তিন ম্যাচে এক গোল ও এক অ্যাসিস্ট করে তিনি টুর্নামেন্টের অন্যতম উদীয়মান তারকায় পরিণত হন। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে।
২০১০ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে প্রথমবার বিশ্বকাপে ১০ নম্বর জার্সি পরেন তিনি। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হয়েও অসংখ্য সুযোগ তৈরি করলেও গোল পাননি। আর্জেন্টিনা জার্মানির কাছে ৪-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়।
২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন আসরের উজ্জ্বলতম তারকা। চারটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন এবং জিতেছিলেন গোল্ডেন বল। কিন্তু ফাইনালে আবারও জার্মানির কাছে পরাজয়।
২০১৬ সালে কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সমর্থকদের ভালোবাসায় মাত্র ৬৬ দিন পরই ফিরে আসেন।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে একটি অগোছালো আর্জেন্টিনা দলের মধ্যে তিনি নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত গোল করে কিশোর, বিশ ও ত্রিশ—এই তিন দশকে বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় হন। তবে শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে হেরে স্বপ্ন ভেঙে যায়।

স্কালোনির হাত ধরে নতুন সূচনা
২০১৮ বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর জর্জ সাম্পাওলির বিদায় এবং লিওনেল স্কালোনির দায়িত্ব গ্রহণ আর্জেন্টিনা ফুটবলের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের প্রধান কোচ হওয়া স্কালোনি নতুন দল গড়ে তোলেন, তরুণদের সুযোগ দেন এবং মেসিকে নতুন আত্মবিশ্বাস এনে দেন। সেই পথ ধরেই আসে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ এবং এরপর আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার সাফল্য।
চার বছর পরও মেসি আবারও বিশ্বফুটবলের শীর্ষে দাঁড়িয়ে। তাই তার ভবিষ্যৎ যাই হোক না কেন, ফুটবলপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ এখন একটাই—এই কিংবদন্তির প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















