যুক্তরাজ্যে বসবাসরত পাকিস্তানের দুই ভিন্নমতাবলম্বী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, রচডেলের কুখ্যাত গ্রুমিং গ্যাংয়ের নেতা শাবির আহমেদকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে চলা আলোচনায় তাদের ‘দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
পাকিস্তান সরকার প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তারা শাবির আহমেদকে ফেরত নিতে রাজি নয়। ২০১২ সালে ৩০টি শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ২২ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন আহমেদ। ১৪ বছর কারাভোগের পর চলতি মাসের শুরুতে তিনি মুক্তি পান।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকাশ্য অবস্থানের বাইরে দুই দেশের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক বা ‘ব্যাকচ্যানেল’ যোগাযোগ চলছে। সেখানে পাকিস্তান যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত দুই পাকিস্তানি ভিন্নমতাবলম্বীকে নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার বিনিময়ে শাবির আহমেদকে গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
কারা সেই দুই ব্যক্তি?
সূত্রের দাবি, তারা হলেন ইমরান খানের সরকারের সাবেক মন্ত্রী মির্জা শাহজাদ আকবর এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাংবাদিক আদিল রাজা। পাকিস্তান তাদের বিরুদ্ধে ‘ভুয়া খবর’, সরকারবিরোধী প্রচারণা এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ছড়ানোর অভিযোগ এনেছে।
ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে চলে আসেন শাহজাদ আকবর। বর্তমানে তিনি একটি ইউটিউব পডকাস্ট পরিচালনা করেন, যেখানে প্রায়ই অতিথি হিসেবে অংশ নেন আদিল রাজা। তিনিও একই সময়ে পাকিস্তান ছেড়ে ব্রিটেনে আশ্রয় নেন।
দুজনের দাবি, তাদের কাজের মূল লক্ষ্য পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার তুলে ধরা। তাদের মতে, এ কারণেই ইসলামাবাদ তাদের প্রত্যর্পণ চায়।
প্রত্যর্পণ চেষ্টার পেছনের প্রেক্ষাপট
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরেই প্রথমবার এই দুই ব্যক্তিকে ফেরত চাওয়ার উদ্যোগ নেয় ইসলামাবাদ। শাবির আহমেদের কারামুক্তির বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসার পর সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
শাহজাদ আকবর বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা তাকে নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
তার ভাষায়, “আইনগতভাবে আমাদের প্রত্যর্পণ করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আগেরবার যখন এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তখনই আমি হামলার শিকার হই।”
গত বছরের বড়দিনের আগের রাতে মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তি তার বাড়ির সামনে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। হামলার সময় তার স্ত্রী ও সন্তান উপস্থিত ছিলেন। হামলাকারীরা তাকে নাম ধরে খুঁজছিল বলে তিনি জানান।

এছাড়া কেমব্রিজশায়ারে তার বাড়িতে আরও দুটি হামলার ঘটনা ঘটে। একটিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয় এবং অন্যটিতে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
বর্তমানে তিনি একটি নিরাপদ গোপন স্থানে বসবাস করছেন। তবে নতুন করে হামলার আশঙ্কা এখনো কাটেনি।
তিনি বলেন, “যদি এবারও প্রত্যর্পণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা কি আবার একই ধরনের হামলা চালাবে? মাত্র চার দিন আগে আমার গাড়িতে চুরি হয়েছে।”
তার দাবি, গাড়ি থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি চুরি হয়েছে এবং ঘটনাটি পরিকল্পিত হামলা হতে পারে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।
‘তারা এখনো হাল ছাড়েনি’
আকবর বলেন, “এটা স্পষ্ট যে তারা আমাকে নিয়ে হাল ছাড়েনি।”
তিনি আরও বলেন, যদি তাকে এবং আদিল রাজাকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে তাদের পরিণতি ইমরান খানের মতোই হতে পারে।
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে আছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। রাষ্ট্রের উপহার সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হলেও তার দল এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। একই সঙ্গে তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করা বহু সমর্থকও গ্রেপ্তার হয়েছেন।
আকবরের ভাষায়, “আমরা জানি যারা ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে না, তাদের কী পরিণতি হয়। আমাদের ক্ষেত্রে আরও ভয়াবহ কিছু ঘটতে পারে।”
তিনি জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের গত ডিসেম্বরের বিবৃতির কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে ইমরান খানের দীর্ঘ একাকী কারাবাস ও চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল।
অবশ্য পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, ইমরান খান যথাযথ চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।

‘পাকিস্তানে এখন আইনের শাসন নেই’
শাহজাদ আকবর বলেন, “যদি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও আইনের শাসন থাকত, তাহলে অভিযোগের মুখোমুখি হতে পাকিস্তানে ফিরতে আমার আপত্তি থাকত না। কিন্তু বর্তমানে সেখানে আইনের শাসনের বদলে কার্যত সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের আইন চলছে।”
তার মতে, রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি পাকিস্তানের আচরণ সম্পর্কে যুক্তরাজ্য অবগত। ফলে সেটিই প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে বড় আইনি বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
আদিল রাজার নিরাপত্তা
শাহজাদ আকবরের ওপর হামলার সময়ের কাছাকাছি আদিল রাজার চেশামের বাড়িতেও জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা হয়। পরে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অভিযোগ আনা হয় যে তারা এই দুই ভিন্নমতাবলম্বীকে লক্ষ্য করে ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
আদিল রাজা জানান, পাকিস্তানের প্রত্যর্পণ দাবির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি তার নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য সারা গ্রিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তার ভাষ্যমতে, গ্রিন সে সময়ের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড্যান জারভিসকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানান। জবাবে জানানো হয়, যুক্তরাজ্য নিয়মিত পাকিস্তানের সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা করে এবং ব্রিটেনে অবস্থানরত ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে ভয় দেখানো, হয়রানি বা ক্ষতিগ্রস্ত করার যেকোনো বিদেশি প্রচেষ্টা সহ্য করা হবে না।

৪৮ বছর বয়সী রাজাও বর্তমানে নিরাপত্তার কারণে গোপন স্থানে বসবাস করছেন।
তিনি বলেন, “পুলিশ আমাকে জানিয়েছে আমি এখনো হামলার লক্ষ্যবস্তু। তাই আমাকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সঙ্গে বৈঠকে আমার নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
তার দাবি, “আমার বিরুদ্ধে এখনো সক্রিয় হুমকি রয়েছে। তাই আমাকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”
‘পাকিস্তান পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে’
রচডেল গ্যাং নেতাকে ঘিরে ব্রিটিশ সরকারের ওপর যে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে, তা তিনি উপলব্ধি করেন বলে জানান আদিল রাজা।
তবে তার বিশ্বাস, পাকিস্তান এই পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্য সরকারের ওপর অবশ্যই তীব্র চাপ রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত আমি দেখিনি যে তারা পাকিস্তানের এই চাপ বা ব্ল্যাকমেইলের কাছে নতি স্বীকার করবে।”
শিভাম প্যাটেল ও ম্যাট ড্যাথান 



















