বিদ্যালয়ে সহিংসতা, বুলিং এবং কিশোর অপরাধের ঘটনা বাড়লে রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিক্রিয়া সাধারণত নিরাপত্তা জোরদার করা। কোথাও স্কুলে নিরাপত্তারক্ষী বাড়ানোর প্রস্তাব আসে, কোথাও ধাতব অস্ত্র শনাক্তকারী যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনা হয়, আবার কোথাও পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি বা কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। এসব পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে কিছু ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব কি সমস্যার মূল কারণ দূর করতে পারে?
শিশুদের আচরণ, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রশ্নকে যদি নিরাপত্তা নীতির বাইরে রাখা হয়, তাহলে কেবল কঠোর নজরদারি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সহিংসতামুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কারণ একটি নিরাপদ বিদ্যালয় শুধু দেয়াল, গেট বা নিরাপত্তারক্ষীর ওপর দাঁড়ায় না; এটি দাঁড়ায় শিক্ষার্থী, পরিবার ও শিক্ষকদের মধ্যে গড়ে ওঠা বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক সম্পর্কের ওপর।
অনেক দেশে এখন স্কুলভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তা, অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারপাশে কঠোর নিরাপত্তা—এসব উদ্যোগের যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না। এগুলো সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে বা অপরাধের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
কিন্তু একই সঙ্গে একটি বাস্তবতাও সামনে আসে। যখন পুরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে অপরাধীকে শনাক্ত করা, গ্রেপ্তার করা বা শাস্তি দেওয়া, তখন শিশুদের মানসিক বিকাশ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক আচরণ এবং চরিত্র গঠনের বিষয়টি আড়ালে চলে যায়। ফলে সমস্যার চিকিৎসার বদলে আমরা কেবল তার লক্ষণ মোকাবিলা করি।
বিদ্যালয়ের ভেতরে যে সংকটটি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়, তা হলো পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিংয়ের অভাব। একজন শিশু কখন বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে, কখন সে নিজেই সহিংস আচরণের দিকে ঝুঁকছে, কিংবা কোন পারিবারিক বা সামাজিক চাপ তার আচরণকে প্রভাবিত করছে—এসব বুঝতে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর এবং সংবেদনশীল শিক্ষক অপরিহার্য। কিন্তু বহু শিক্ষা ব্যবস্থায় এই অবকাঠামো এখনও অত্যন্ত দুর্বল।
শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়ে যায়। অনেক শিশু অপরাধপ্রবণ হয়ে জন্মায় না; তারা ভুল পরিবেশ, অবহেলা, মানসিক চাপ বা সামাজিক প্রভাবের কারণে ভুল পথে যায়। সময়মতো সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তাদের বড় অংশই ইতিবাচক জীবনে ফিরে আসতে পারে। তাই পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা এবং চরিত্র গঠনের উদ্যোগকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এখানে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অন্যের প্রতি সম্মান এবং দায়িত্ববোধ—এসব মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঘর থেকেই। অথচ শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই অভিভাবকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইতিবাচক অভিভাবকত্ব বা পারিবারিক সহায়তার বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে পরিবারকে এই কাজে সহায়তা করার। অভিভাবকদের জন্য প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক কর্মসূচি, পরিবারভিত্তিক পরামর্শসেবা এবং বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কার্যকর ব্যবস্থা শিশুদের সুস্থ বিকাশে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কেবল সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না; শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের অংশীদার হতে হয় পরিবারকেও।

একইভাবে শিক্ষকদের অবস্থানও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। শিশু সুরক্ষার নীতিমালা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই সঙ্গে শিক্ষকদেরও এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে তারা ন্যায্য, মানবিক ও গঠনমূলক শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন। শিক্ষক যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সংশোধনমূলক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ছোট সমস্যা বড় সংকটে রূপ নেয়।
আজ অনেক অভিভাবকও চান, তাদের সন্তান কোনো ভুল করলে সেটি প্রথমে বিদ্যালয়ের ভেতরেই সংশোধনের সুযোগ পাক। তারা চান না শিশুদের খুব দ্রুত অপরাধবিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হোক বা এমনভাবে আচরণ করা হোক যেন তারা প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী। কারণ শিশুদের ক্ষেত্রে সংশোধন ও পুনর্গঠনের সুযোগই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে নিরাপত্তা যদি কেবল ক্যামেরা, পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী কিংবা আইনের কঠোরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বিদ্যালয় গড়তে হলে শিশুদের নৈতিক বিকাশ, মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক সহায়তা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক চরিত্র গঠনের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হয়, যখন তার শিশুরা শুধু শাস্তির ভয়ে নয়, সঠিক মূল্যবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সহমর্মিতার চর্চার মাধ্যমে বেড়ে ওঠে। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিশু গঠনের প্রকল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ।
জোসেফ নোয়েল এম. এস্ট্রাডা 



















