একটি দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য সব সময় যুদ্ধ, মহামারি বা বৈশ্বিক মন্দাই যথেষ্ট নয়। অনেক সময় সবচেয়ে বড় আঘাত আসে তখন, যখন বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক বাজার সেই দেশের নীতিনির্ধারকদের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে। মুদ্রার মান, শেয়ারবাজার কিংবা বিনিয়োগ প্রবাহ তখন কেবল অর্থনৈতিক সূচকের প্রতিফলন থাকে না; এগুলো পরিণত হয় বিশ্বাস ও প্রত্যাশার পরীক্ষায়।
ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সুদের হার বাড়িয়েছে রুপিয়াহর পতন ঠেকাতে। প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী উচ্চ সুদের হার বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ করে এবং মুদ্রার ওপর চাপ কমায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। রুপিয়াহর দরপতন অব্যাহত রয়েছে, যা ইঙ্গিত করছে সমস্যাটি কেবল আর্থিক নীতির নয়; এর গভীরে রয়েছে আস্থার সংকট।
মুদ্রাবাজারে প্রত্যাশা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যদি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন একটি মুদ্রার মূল্য আরও কমবে, তাহলে তারা দ্রুত সেই মুদ্রা বিক্রি করে নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকবেন। ফলে যে পতনের আশঙ্কা ছিল, সেটিই বাস্তবে আরও দ্রুত ঘটতে শুরু করে। অর্থাৎ বাজারে ভয়ের মনস্তত্ত্ব একসময় নিজেই নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।
এই কারণেই শুধু সুদের হার বাড়িয়ে বড় ধরনের মুদ্রা সংকট মোকাবিলা করা যায় না। সুদের হার যত বাড়ানো হয়, ঋণের ব্যয়ও তত বৃদ্ধি পায়, বিনিয়োগ কমে যায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়ে। একটি পর্যায়ের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও আর খুব বেশি পথ খোলা থাকে না।
ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটে রুপিয়াহর নজিরবিহীন পতনের সময় সুদের হার অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুধু সেই পদক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বরং অর্থনীতি গভীর মন্দায় পড়ে। স্থিতিশীলতা ফিরে আসে তখনই, যখন সরকার ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলাসহ বিস্তৃত কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত বাজারকে আশ্বস্ত করেছিল নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা, শুধু সুদের হার নয়।
অর্থনৈতিক ইতিহাসের এই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আস্থা গড়ে তোলেন তখনই, যখন তারা আইনের শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দেখতে পান। নীতিগত অনিশ্চয়তা, বারবার অবস্থান পরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা সেই আস্থাকে দ্রুত ক্ষয় করে।
ইন্দোনেশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এমন কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, ব্যয়বহুল সামাজিক কর্মসূচির আর্থিক টেকসইতা নিয়ে উদ্বেগ এবং আর্থিক খাতসংক্রান্ত কিছু আইনি সংশোধন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন সংশয় তৈরি করেছে। বিশেষ করে এমন আইন, যা আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে নেতিবাচক বার্তা পাঠায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুঁজিবাজারের সুশাসন নিয়ে উদ্বেগ। তালিকাভুক্ত কোম্পানির মালিকানা কাঠামোর অস্বচ্ছতা, সীমিত মুক্ত শেয়ার এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সমালোচনা ইন্দোনেশিয়ার বাজারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে, শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ বেড়েছে এবং মূলধন দেশ ছাড়তে শুরু করেছে।
এখন সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো আন্তর্জাতিক সূচকে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান অবনমিত হওয়ার সম্ভাবনা। যদি তা ঘটে, তাহলে বৈশ্বিক তহবিলের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নেবে। এতে শুধু শেয়ারবাজার নয়, নতুন শিল্প বিনিয়োগ, কোম্পানির মূলধন সংগ্রহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও কঠিন চাপে পড়বে।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথও পরিষ্কার। সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বাজারে স্থায়ী আস্থা ফিরিয়ে আনা। তার জন্য আর্থিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন, সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান উন্নয়ন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রতিযোগিতা বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা জোরদার করতে হবে এবং পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
অর্থনীতিতে আস্থা কখনো আইন করে তৈরি করা যায় না, আবার জোর করেও ধরে রাখা যায় না। এটি অর্জিত হয় ধারাবাহিক, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নীতির মাধ্যমে। একবার সেই আস্থা ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় এবং কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়।
আজ ইন্দোনেশিয়ার সামনে যে চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে, তা মূলত একটি আস্থার লড়াই। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে সুদের হার বাড়ানোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা, যা বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের কাছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন করে বিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির শক্তি নির্ভর করবে ঠিক সেই বিশ্বাসের ওপরই।
উইনার্নো জেইন 



















