জাপানের সঙ্গে ভারতের সর্বশেষ যৌথ বিবৃতিতে ‘পাকিস্তান থেকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ’ উল্লেখকে ঘিরে পাকিস্তানে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। ইসলামাবাদে নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এই ভাষা দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে টোকিওর দীর্ঘদিনের সতর্ক অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত হতে পারে। তবে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমন ব্যাখ্যাকে বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত ২ জুলাই নয়াদিল্লিতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে অনুষ্ঠিত ১৬তম জাপান-ভারত বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের নিন্দা জানিয়েছেন, যার মধ্যে ‘পাকিস্তান থেকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ’-এর উল্লেখও রয়েছে।
পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া
যৌথ বিবৃতি প্রকাশের পর পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এটিকে সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমবারের মতো জাপানের আনুষ্ঠানিক নথিতে পাকিস্তানকে সরাসরি উল্লেখ হিসেবে তুলে ধরা হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ভারতের প্রতি জাপানের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ শোয়াইবের ভাষ্য, বিবৃতির ভাষা থেকে বোঝা যায় জাপান তার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিচারে ভারতের দিকে আরও স্পষ্টভাবে ঝুঁকছে।
জাপানের কাছে পাকিস্তানের প্রতিবাদ
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বিষয়ে তারা জাপানের কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ (ডিমার্শ) জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, জাপানি কর্তৃপক্ষ তাদের আশ্বস্ত করেছে যে পাকিস্তানের প্রতি জাপানের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
দীর্ঘদিনের সম্পর্ক
পাকিস্তান ও জাপান ১৯৫২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর দুই দেশের সম্পর্ক মূলত বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং জাপানের বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। বিশেষ করে পাকিস্তানের মোটরগাড়ি শিল্পে জাপানি কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে। পাশাপাশি জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) উন্নয়ন সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
তবে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সর্বশেষ সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয় ২০০৫ সালে। এরপর আর প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে মুখোমুখি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি বৃহত্তর এশীয় ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটেও দেখা দরকার। তাইওয়ানের ন্যাশনাল চুং হসিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গুলাম আলীর মতে, আঞ্চলিক রাজনীতিতে পাকিস্তানকে চীনের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে জাপানের কৌশলগত সম্পর্ক ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছে। ফলে টোকিওর অবস্থান নয়াদিল্লির দিকে বেশি ঝুঁকে আছে বলে ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তার মতে, দক্ষিণ এশিয়া থেকে উদ্ভূত সন্ত্রাসবাদ জাপানের জন্য সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি নয়। তাই বিবৃতির ভাষা মূলত ভারতের অবস্থানের প্রতি সমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে।
জাপানের ব্যাখ্যা
তবে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নিক্কেই এশিয়াকে জানান, জাপান-ভারত যৌথ বিবৃতিতে সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ নতুন নয়। ২০১৭ ও ২০২২ সালের যৌথ বিবৃতিতেও পাকিস্তানের উল্লেখ ছিল।
ওই কর্মকর্তা বলেন, অতীতে এমন ভাষাও ব্যবহৃত হয়েছে যেখানে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এবারের বিবৃতিতে পাকিস্তানকে কেবল ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানের কিছু সংবাদমাধ্যম এটিকে জাপানের দক্ষিণ এশিয়া নীতির বড় পরিবর্তন হিসেবে যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তা সঠিক নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সামনের পথ
বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যুতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিকল্প সীমিত। কেউ কেউ মনে করেন, উদ্বেগ প্রকাশের বাইরে ইসলামাবাদের হাতে খুব বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নেই। আবার অন্যদের মতে, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতে জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপান-ভারত যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তান থেকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের উল্লেখ ঘিরে ইসলামাবাদের উদ্বেগ তৈরি হলেও টোকিও বলছে, তাদের পাকিস্তান নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
জাপান-ভারত যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তান থেকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ
জাপান-ভারত যৌথ বিবৃতিতে ‘পাকিস্তান থেকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ’ উল্লেখ নিয়ে ইসলামাবাদের উদ্বেগ বাড়লেও জাপান বলছে, তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















