মিসরের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত প্রাচীন নগরী মেরিনা এল আলামেইনে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে ১৮টি নতুন সমাধি, একাধিক ভূমিস্থ কবর, পাথরের সারকোফেগাস (কফিন) এবং মূল্যবান প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। সর্বশেষ এই আবিষ্কার ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন উপকূলীয় শহর হিসেবে মেরিনা এল আলামেইনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আরও জোরালো করেছে।
খনন পরিচালনাকারী মিসরীয় প্রত্নতাত্ত্বিক দল শহরটির আরও বিস্তৃত নগরায়ণের চিহ্ন ও স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশও শনাক্ত করেছে। ১৯৮৬ সালে স্থানটি আবিষ্কারের পর থেকে এখন পর্যন্ত এখানে মোট ৪৪টি সমাধির সন্ধান মিলেছে।

ইতিহাসের নতুন অধ্যায়
মিসরের পর্যটন ও প্রত্নসম্পদবিষয়ক মন্ত্রী শরিফ ফাথি বলেন, এই আবিষ্কার শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং মেরিনা এল আলামেইনের প্রাচীন অধিবাসীদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জীবনধারা সম্পর্কে নতুন ধারণা দেবে। একই সঙ্গে এটি ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের সঙ্গে মিসরের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সংযোগে শহরটির ভূমিকা নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করবে।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে স্থানটিকে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করতে সরকার পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে উত্তর উপকূলের সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের পাশাপাশি একটি নতুন সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে।

আধুনিক পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হিশাম এল-লেইথি জানান, উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় একটি দর্শনার্থী কেন্দ্র, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও পথচারীদের জন্য পৃথক চলাচলের পথ, জাদুঘর-সংরক্ষণাগার, প্রশাসনিক ভবন এবং একটি উন্মুক্ত নাট্যমঞ্চ নির্মাণ করা হবে। আগামী বছরের প্রথমার্ধের মধ্যেই এই কাজ শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
১৮টি নতুন সমাধির সন্ধান
মিসরের প্রত্নসম্পদ পরিষদের মিসরীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আবদেল বাদি জানান, নতুন আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে প্রায় আট মিটার গভীর ১১টি শিলাকাটা ভূগর্ভস্থ সমাধি এবং সাতটি চুনাপাথরের নির্মিত ভূমিস্থ সমাধি।
এসব সমাধির কয়েকটি অত্যন্ত ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। কিছু সমাধির কক্ষ এখনও প্রাচীনকালের মতোই পাথরের স্ল্যাব দিয়ে সম্পূর্ণ সিল করা অবস্থায় রয়েছে এবং কখনও খোলা হয়নি।

সমাজের বৈচিত্র্যের প্রমাণ
সমাধিগুলোর আশপাশে বহু ভূমিস্থ কবরও পাওয়া গেছে, যা প্রাচীন নগরীর সামাজিক বৈচিত্র্যের ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়া একটি পুরোনো পানির কূপকে পরবর্তী সময়ে কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রত্নতাত্ত্বিকরা নিশ্চিত হয়েছেন। এটি টলেমীয় ও রোমান যুগেও প্রাচীন মিসরীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ঐতিহ্য বহাল থাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মূল্যবান প্রত্নবস্তুর সন্ধান
খননে বিপুল সংখ্যক প্রত্নবস্তু উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় অক্ষত ও সম্পূর্ণ মাটির পাত্র, অ্যাম্ফোরা, তেলের প্রদীপ, থালা, চুনাপাথরের বেদি ও পাত্র এবং সমাধির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্থাপত্য উপাদান।
লোয়ার ইজিপ্ট অ্যান্টিকুইটিজ বিভাগের প্রধান হিশাম হুসেইন জানান, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারগুলোর একটি হলো একটি চুনাপাথরের উৎসর্গ-বেদি, যার নকশা প্রাচীন মিসরীয় ‘ফলস ডোর’ বা প্রতীকী দরজার আদলে নির্মিত। এটি প্রাচীন মিসরীয় ধর্মীয় বিশ্বাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
এছাড়া একটি অসমাপ্ত মার্বেল ভাস্কর্য, যা সম্ভবত গ্রিক দেবী অ্যাফ্রোদিতির প্রতিকৃতি, একটি চুনাপাথরের সমাধিফলক যাতে একটি পাখি হাতে বসে থাকা ব্যক্তির চিত্র রয়েছে এবং কয়েকটি কাচের অশ্রুপাত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।

সিল করা গ্রানাইট সারকোফেগাস
প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের প্রধান ও মেরিনা এল আলামেইন সাইটের পরিচালক ইমান আবদেল খালেক জানান, প্রায় আড়াই মিটার দীর্ঘ একটি গ্রানাইটের সারকোফেগাস উদ্ধার করা হয়েছে, যা এখনও মূল ঢাকনাসহ সম্পূর্ণ সিল অবস্থায় রয়েছে।
এর ভেতরে পাওয়া মানব কঙ্কালের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চলছে। সারকোফেগাসের পাশেই প্লাস্টার দিয়ে তৈরি একটি স্ফিংক্স মূর্তির ভাঙা অংশ উদ্ধার হয়েছে, যা হেলেনিস্টিক ও রোমান যুগেও মিসরীয় ধর্মীয় ও শিল্প-ঐতিহ্যের প্রভাব অব্যাহত থাকার প্রমাণ বহন করে।
‘সোনার জিহ্বা’সহ ২৪টি স্বর্ণবস্তু
সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবিষ্কারগুলোর একটি হলো মৃতদের মুখে রাখা ২৪টি স্বর্ণের বস্তু। এগুলো ‘গোল্ডেন টাং’ বা ‘সোনার জিহ্বা’ নামে পরিচিত একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া প্রথার অংশ, যা সে সময়কার ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
এসবের মধ্যে হোরাসের চোখের আকৃতির একটি স্বর্ণের তাবিজও রয়েছে। প্রাচীন মিসরীয় ধর্মে এটি সুরক্ষা ও অমঙ্গলের বিরুদ্ধে রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় নগরী
মেরিনা এল আলামেইন আলেকজান্দ্রিয়া থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত। ধারণা করা হয়, এটি গ্রিক ভূগোলবিদ স্ট্র্যাবোর উল্লেখ করা প্রাচীন লিউকাসপিস নগরী।
হেলেনিস্টিক যুগ থেকে বাইজেন্টাইন আমল পর্যন্ত শহরটি সমৃদ্ধ ছিল। বিশেষ করে খ্রিস্টীয় প্রথম তিন শতকে এটি নগরায়ণ, বাণিজ্য ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।

১৯৮৬ সালে আবিষ্কার
১৯৮৬ সালে মেরিনা এলাকায় নির্মাণকাজের সময় এই প্রত্নস্থলের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণা ও খননে এটি মিসরের সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত প্রাচীন উপকূলীয় নগরীগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
এখানে পরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা, আবাসিক এলাকা, জনসাধারণের ভবন, বন্দর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বিস্তৃত কবরস্থান আবিষ্কৃত হয়েছে, যা হেলেনিস্টিক ও রোমান যুগে মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সাক্ষ্য বহন করে।
সর্বশেষ এই আবিষ্কার মেরিনা এল আলামেইনের ইতিহাসকে আরও পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি মিসরের উত্তর উপকূলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক গন্তব্য হিসেবে এর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















