জার্মানির পারিবারিক মালিকানাধীন সাইকেল হেলমেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কেড (KED) চলতি বছরের শেষ দিকে তাদের সম্পূর্ণ উৎপাদন কার্যক্রম চীনে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন স্থানান্তরের ঘটনা নয়, বরং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং ইউরোপে উৎপাদন ধরে রাখার ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেড ছিল জার্মানির শেষ সাইকেল হেলমেট নির্মাতা, যারা দেশেই উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছিল। এর আগে উভেক্স (Uvex) ও আলপিনা (Alpina) একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে উৎপাদন বিদেশে সরিয়ে নিয়েছিল।
উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপ
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ভিক্টর বোরশে জানান, গত চার বছরে জার্মানিতে ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টাপ্রতি ১৩.৯০ ইউরোতে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে কাঁচামালের ব্যয় বেড়েছে। এর পাশাপাশি চীনে তৈরি তুলনামূলক কমদামের হেলমেট বিক্রি করা ডিসকাউন্ট সুপারমার্কেটগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার ভাষায়, জার্মানিতে উৎপাদন ধরে রাখতে হলে প্রতিটি হেলমেটের দাম প্রায় ২০ ইউরো বাড়াতে হতো, যা বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত। তাই প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন বন্ধ করে একটি প্রতিষ্ঠিত চীনা চুক্তিভিত্তিক নির্মাতার কাছে উৎপাদন স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গবেষণা থাকবে জার্মানিতে
উৎপাদন চীনে গেলেও গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জার্মানিতেই থাকবে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, উৎপাদন বজায় রাখতে যে অর্থ ব্যয় হতো, তা এখন নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা হবে।
কর্মসংস্থানে প্রভাব
প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের জার্মান কারখানায় প্রায় ২৫ জন কর্মী কাজ করতেন। উৎপাদন স্থানান্তরের ফলে দীর্ঘদিনের অনেক কর্মী চাকরি হারাবেন। তবে বিক্রয়, মান নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে প্রায় ১৫ জন কর্মী কাজ চালিয়ে যাবেন।
প্রধান নির্বাহী বলেন, দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের ছাঁটাই করতে হওয়ায় সিদ্ধান্তটি আবেগগতভাবে কঠিন ছিল।
ইইউ সুরক্ষার বাইরে ছিল হেলমেট শিল্প
সাইকেল হেলমেট খাতটি ইইউর অ্যান্টি-ডাম্পিং সুরক্ষার আওতায় নয়। ফলে চীনের কম উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কেডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বড় চাপের মুখে পড়ে।
অন্যদিকে সাইকেল ও ই-বাইক শিল্প ইইউর দীর্ঘদিনের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক সুবিধা পায়। বর্তমানে চীন থেকে আমদানি করা সাধারণ সাইকেলের ওপর ৪৮.৫ শতাংশ এবং ই-বাইকের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সাইকেল যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে আংশিক সংযোজিত সাইকেল আমদানির মাধ্যমে শুল্ক এড়ানো না যায়।
জার্মান সাইকেল শিল্প সমিতি (ZIV) জানিয়েছে, এসব সুরক্ষার কারণে দেশটির সাইকেল ও ই-বাইকের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। গত বছর জার্মানিতে প্রায় ১৯ লাখ সাইকেল ও ই-বাইক উৎপাদিত হয়েছে।
‘মেড ইন জার্মানি’র বাড়তি মূল্য কমছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, জার্মানি এখনও হ্যান্ডেলবার, চাকা, স্পোক, লাইট, লক, মাডগার্ড ও হাব ডায়নামোর মতো বিভিন্ন সাইকেল যন্ত্রাংশের উৎপাদন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে ফ্রেমের বড় অংশ এখনও তাইওয়ান, চীন বা ভিয়েতনামে তৈরি হয়।
ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হরভাথের শিল্প বিশেষজ্ঞ রালফ সাউটার বলেন, ছোট জার্মান নির্মাতাদের জন্য ভবিষ্যতে ব্র্যান্ডের স্বাতন্ত্র্য এবং গ্রাহকের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্কই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান উপায় হতে পারে।
এদিকে কেডের প্রধান নির্বাহীও মনে করেন, “মেড ইন জার্মানি” লেবেলের জন্য আগে যে অতিরিক্ত মূল্য পাওয়া যেত, এখন তা আগের মতো সহজে অর্জন করা যাচ্ছে না। কারণ ক্রেতা ও খুচরা বিক্রেতারা এখন বিশ্বাস করেন, চীনেও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চমানের হেলমেট উৎপাদন সম্ভব।
জার্মানির শেষ সাইকেল হেলমেট নির্মাতা কেড উৎপাদন চীনে সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাড়তি ব্যয়, মূল্য প্রতিযোগিতা ও বাজারের চাপে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















