পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানকে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় ইসলামাবাদ বিশ্বাস করেছে, এই ভূগোল তাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, অন্যদিকে সেটিই দেশটিকে স্থায়ী নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে আটকে রাখতে পারে।
আজ পাকিস্তান এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কেবল সীমান্তের হুমকি নয়, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাও জাতীয় নিরাপত্তার সমান গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। ফলে নিরাপত্তা নীতির পুরোনো কাঠামো আর বর্তমান বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে পারছে না।
নিরাপত্তা সংকটের নতুন মানচিত্র
দীর্ঘ সময় ধরে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল একটি ধারণা—একসঙ্গে যেন দুইটি সক্রিয় সীমান্তে সংঘাতে জড়াতে না হয়। পূর্বে ভারতের সঙ্গে বৈরিতা এবং পশ্চিমে আফগানিস্তান-সংলগ্ন অস্থিতিশীলতা দেশটির সামরিক কৌশলকে সেই অনুযায়ী গড়ে তুলেছিল।
কিন্তু এখন সেই হিসাব পাল্টে গেছে। সীমান্তের দুই দিকের চাপের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মিলে তৃতীয় এক নিরাপত্তা ফ্রন্ট তৈরি করেছে। এর অর্থ, পাকিস্তানকে এখন একই সঙ্গে বহুমাত্রিক সংকট সামাল দিতে হচ্ছে।
খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা শুধু অব্যাহতই নয়, তাদের কার্যক্রমের পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে। হামলার ধরন, লক্ষ্যবস্তু এবং ভৌগোলিক বিস্তার—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন স্পষ্ট। একই সময়ে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরেও ব্যাপক জনঅসন্তোষ এমন এক রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে, যা অতীতে এই মাত্রায় দেখা যায়নি।
বেলুচিস্তান: নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক সংকট
বেলুচিস্তানের পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বা সন্ত্রাসবাদের সমস্যা হিসেবে দেখলে প্রকৃত সংকট আড়াল হয়ে যায়। কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি, উন্নয়নের বৈষম্য এবং কেন্দ্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস সেখানে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি ক্রমশ বাড়ছে। রাজনৈতিক দাবিকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা এবং শান্তিপূর্ণ জাতীয়তাবাদী কণ্ঠকেও কঠোরভাবে দমন করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যখন রাজনৈতিক পথ সংকুচিত হয়, তখন চরমপন্থী সংগঠনগুলোর জন্য জনসমর্থন বা নতুন সদস্য সংগ্রহ সহজ হয়ে যায়।
সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ায়। ফলে সংকটের মূল কারণ অমীমাংসিতই থেকে যায়।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় দ্বৈত সংকট
খাইবার পাখতুনখোয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের রাজনৈতিক বিরোধের কারণে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন হলেও বাস্তবে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়েছে।
এর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পর্কও পুরোপুরি বিশ্বাসভিত্তিক নয়। আধুনিক বিদ্রোহ দমন কৌশলের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো—শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। জনগণের আস্থা অর্জন ছাড়া নিরাপত্তা অভিযান স্থায়ী ফল দেয় না।
আজাদ কাশ্মীরের অস্থিরতার রাজনৈতিক তাৎপর্য
আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে চলমান বিক্ষোভ পাকিস্তানের জন্য কেবল একটি আঞ্চলিক প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি কাশ্মীর প্রশ্নে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানকেও প্রভাবিত করতে পারে।
অর্থনৈতিক অসন্তোষ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে মোকাবিলা না করে যদি প্রধানত বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেওয়া হয়, তাহলে জনমতের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে সংরক্ষিত শরণার্থী আসন নিয়ে বিতর্ক এবং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা সংকটকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
পূর্ব সীমান্তে বাড়ছে কৌশলগত চাপ
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গত কয়েক বছরে আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে। সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত এবং পানি ব্যবস্থাপনাকে রাজনৈতিক চাপের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত পাকিস্তানের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এর পাশাপাশি ভারতের সামরিক আধুনিকীকরণ এবং পারমাণবিক সক্ষমতার কার্যকর মোতায়েন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। যদি প্রতিরোধমূলক নীতির পরিবর্তে দ্রুত ব্যবহারের সক্ষমতার দিকে ঝোঁক বাড়ে, তাহলে সংকটকালে ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে।
এই পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও তার নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনার চাপের মুখে পড়তে পারে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।

পশ্চিম সীমান্তে অচলাবস্থা
আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও স্থিতিশীল নয়। সীমান্ত সংঘর্ষ, বাণিজ্য স্থবিরতা এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে ঘিরে দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস ক্রমশ গভীর হয়েছে।
ইসলামাবাদ সামরিক চাপ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাবুলকে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে চাইলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। বরং সীমান্ত পরিস্থিতি অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
নিরাপত্তা রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা
দীর্ঘ দশক ধরে নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাকিস্তানের রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় ও নিরাপত্তা নীতির গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মতো খাতগুলো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়েছে।
কিন্তু এত দীর্ঘ নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পরও যদি সীমান্তে সংঘাত, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা একসঙ্গে বিস্তৃত হতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—শুধু নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি কি যথেষ্ট?
বর্তমান বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল নতুন অস্ত্র বা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়। বরং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং প্রতিবেশী সম্পর্ক—সবকিছুকে সমন্বিত করে একটি নতুন জাতীয় কৌশল নির্মাণ করা। অন্যথায় দেশের নিরাপত্তা সংকটের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
মালিহা লোধি 


















