আজকের পাকিস্তান এক অস্বাভাবিক ঐতিহাসিক দ্বিধার মুখোমুখি। ১৯৪৭ সালে মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দেশটি এখন ক্রমশ নিজেকে এমন এক সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরছে, যার বিকাশ দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের আগমনেরও হাজার হাজার বছর আগে। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, তক্ষশিলা ও গান্ধার আর শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়; এগুলো এখন পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। দেশটি ক্রমেই নিজেকে বিশ্বের প্রাচীনতম নগরসভ্যতাগুলোর একটি—সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতার—উত্তরসূরি হিসেবে উপস্থাপন করছে, যার ইতিহাস পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো।
সিন্ধু নদ ও প্রাচীন ঐতিহ্যের রাজনীতি
সিন্ধু সভ্যতাকে ঘিরে পাকিস্তানের নতুন আগ্রহ এমন সময় সামনে এসেছে, যখন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে সিন্ধু নদব্যবস্থা। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে নদীর পানি বণ্টনের কাঠামো নির্ধারণ করে আসছে।
২০২৫ সালে পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত চুক্তিটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলে বিষয়টি শুধু পানি বণ্টনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ভূরাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে সামনে এনে নদীটিকে আধুনিক রাষ্ট্রসীমার আগের এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
ভারতের দৃষ্টিতে অবশ্য বাস্তবতা ভিন্ন। তাদের দাবি, চুক্তির আওতায় পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ পানি পাকিস্তান ব্যবহার করে, আর ভারতের অংশ মাত্র ২০ শতাংশ। নরেন্দ্র মোদি সরকার চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। পেহেলগাম হামলার পর ভারতের অবস্থান ছিল—‘রক্ত ও পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না।’
পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হিসেবে তুলে ধরলেও ভারত এখনো নদীর প্রবাহ বন্ধ করেনি। তবে ইসলামাবাদের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর প্রবাহসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতের প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে অন্তত কয়েক বছর পাকিস্তান এর সরাসরি প্রভাব অনুভব নাও করতে পারে।
তবু পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পশ্চিমা দেশগুলোর সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করছে এবং একই সঙ্গে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর বাঁধে হামলার হুমকিও দিচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ ঐক্যের নতুন বর্ণনা
সিন্ধু সভ্যতার গল্প পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রের জন্য আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সিন্ধ, খাইবার পাখতুনখোয়া এবং অন্যান্য অস্থির প্রদেশকে একই নদী অববাহিকার অংশ হিসেবে একটি অভিন্ন ঐতিহাসিক পরিচয়ের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি করে।
এই ঐক্যের বর্ণনা এমন সময় সামনে আনা হচ্ছে, যখন পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল—অধিকৃত কাশ্মীর, গিলগিট-বালতিস্তান, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া—অস্থিরতায় জর্জরিত। একই সঙ্গে ডুরান্ড লাইনে তালেবান সরকারের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।
ইসলাম-পূর্ব অতীতে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা
পাকিস্তানের এই প্রবণতা একেবারে ব্যতিক্রম নয়। ইরান, মিসর ও ইরাকের মতো দেশেও নতুন প্রজন্ম তাদের ইসলাম-পূর্ব ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ইরান পারস্যের ঐতিহ্য, মিসর ফেরাউনদের ইতিহাস এবং ইরাক মেসোপটেমিয়ার উত্তরাধিকারকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে সমালোচকদের মতে, পাকিস্তানের অবস্থান অনেক বেশি পরিবর্তনশীল। একসময় তারা নিজেদের তুর্কি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে, পরে আরব বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে আরব পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়েছে, আর এখন সিন্ধু সভ্যতার উত্তরাধিকারকে সামনে আনছে। সমালোচকদের ভাষায়, এই পরিবর্তনের পেছনে মূল চালিকা শক্তি আদর্শ নয়, বরং রাজনৈতিক সুবিধাবাদ।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
এই বর্ণনা পশ্চিমা বিশ্বের কিছু মহলের সমর্থনও পাচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। একই সঙ্গে ভারতের ভেতরেও কিছু বিশ্লেষক মনে করিয়ে দেন যে, সিন্ধু নদ ও এর প্রধান উপনদীগুলোর উৎপত্তি তিব্বতে, যা চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে চীন চাইলে ভবিষ্যতে ভারতের ক্ষেত্রেও পানি নিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও আলোচনায় এসেছে।
ভারতের বক্তব্য হলো, তারা পাকিস্তানের কাছে একটাই দাবি জানায়—রাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
জিয়াউল হকের আমলে ইসলামকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পর থেকে কাশ্মীর, পাঞ্জাবসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে ভারতীয় অবস্থান।
ভারতের বর্তমান সরকার প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে, সন্ত্রাসবাদকে তারা যুদ্ধের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করে। সেই নীতির অংশ হিসেবেই সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখা হয়েছে বলে দিল্লির দাবি।
সভ্যতার উত্তরাধিকার নাকি কূটনৈতিক কৌশল?
হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো ও সিন্ধু সভ্যতাকে নতুন করে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরে পাকিস্তান নদী ব্যবস্থাকে কেবল ১৯৬০ সালের একটি চুক্তির বিষয় হিসেবে নয়, বরং হাজার বছরের সভ্যতার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।
এই বর্ণনার মূল বার্তা হলো—পাকিস্তান কেবল একটি নিম্নপ্রবাহের রাষ্ট্র নয়; বরং বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার ভৌগোলিক অভিভাবকও বটে।
পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ইসলামী ভিত্তি
পাকিস্তানের রাষ্ট্রগঠনের মূল দর্শন কোনো প্রাচীন সভ্যতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। দেশটির জন্ম হয়েছিল এই ধারণার ভিত্তিতে যে, দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র জাতি। স্বাধীনতার পর সংবিধান ও বিভিন্ন সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচয়ের কেন্দ্রে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
১৯৪৯ সালের ‘অবজেকটিভস রেজোলিউশন’-এ ঘোষণা করা হয়, সমগ্র মহাবিশ্বের সার্বভৌমত্ব একমাত্র মহান আল্লাহর। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা ও ইসলামী নীতির মধ্যে একটি সাংবিধানিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৭৩ সালের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আইনকে ইসলামী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হক ‘অবজেকটিভস রেজোলিউশন’-কে সংবিধানের ২এ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত করে এটিকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেন। এর ফলে ইসলামী পরিচয় পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

রাষ্ট্রের সরকারি বক্তব্যে ইসলামী পরিচয়ের ধারাবাহিকতা
এই আদর্শিক কাঠামো এখনো পাকিস্তানের সরকারি বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির একাধিক ভাষণে বারবার ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’-এর কথা উল্লেখ করেন।
পাহেলগাম হামলার পর প্রবাসী পাকিস্তানিদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, মুসলমান ও হিন্দুর ধর্ম, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মূল্যবোধ আলাদা; আর এই পার্থক্যই ছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তি।
পরে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতেও তিনি জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের জন্ম একটি পৃথক মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু বক্তব্যের বিষয়বস্তুতে নয়; বরং এ কারণে যে, এগুলো এসেছে পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান—সামরিক বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা এবং আদর্শগত সীমারেখা নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। ফলে রাষ্ট্রের বার্তাও একই রয়ে গেছে—পাকিস্তান একটি মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র।
মুহাম্মদ বিন কাসিম থেকে মহেঞ্জোদারো
স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামি রাজনৈতিক ইতিহাসই ছিল প্রধান বিষয়। স্কুলের ‘পাকিস্তান স্টাডিজ’ পাঠ্যবইগুলোতে সাধারণত অষ্টম শতকে সিন্ধুতে ইসলামের আগমন, মুহাম্মদ বিন কাসিম, মুঘল সাম্রাজ্য এবং মুসলিম লীগের আন্দোলনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসবিদ কে. কে. আজিজ তাঁর আলোচিত গ্রন্থ The Murder of History–এ পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, দেশটির ইতিহাস পাঠ্যক্রমে রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্যে অতীতকে বেছে বেছে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিশেষ করে জিয়াউল হকের শাসনামলে শিক্ষানীতিতে ইসলামী পরিচয় ও ধর্মীয় আদর্শের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
আজও পাকিস্তানের জাতীয় শিক্ষাক্রমে দেশটিকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা প্রবল। অন্যদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও বহুত্ববাদী ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
শিক্ষা ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে গবেষণার পর্যবেক্ষণ
২০২৫ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অব রিলিজিয়াস এডুকেশন-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, পাকিস্তানের জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবইগুলো শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে সেখানে ‘অন্য ধর্মাবলম্বী’দের উপস্থাপনের ধরন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ইতিহাসচর্চার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়।
একই বছরে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা—Inclusive Education for a United and Harmonious Pakistan—পাঞ্জাবের পাঠ্যবই বিশ্লেষণ করে জানায়, সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব সীমিত এবং সহনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে আরও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
এই পর্যবেক্ষণগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের (USCIRF) আগের প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, সরকারি স্কুলের কিছু পাঠ্যবই অমুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে ভূমিকা রাখে।

নতুন ঐতিহাসিক বর্ণনার তাৎপর্য
এই প্রেক্ষাপটে হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, তক্ষশিলা ও গান্ধারকে নতুন করে জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা পাকিস্তানের ইতিহাসচর্চায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
প্রশ্নটি এই নয় যে পাকিস্তান কেন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো উদ্যাপন করবে। বরং প্রশ্ন হলো—যে রাষ্ট্র এতদিন নিজের পরিচয়কে প্রধানত ইসলামী উৎসের সঙ্গে যুক্ত করেছে, সেই রাষ্ট্র এখন কেন ইসলাম-পূর্ব ঐতিহ্যকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে নিয়ে আসছে?
সংখ্যালঘু অধিকার ও সভ্যতার দাবির বৈপরীত্য
পাকিস্তান যখন নিজেকে একটি প্রাচীন ও বহুত্ববাদী সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরতে চায়, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে দেশের বর্তমান ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বহু বছর ধরেই পাকিস্তানে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূত, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (USCIRF) ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্ম অবমাননা আইনের অপব্যবহার, উগ্র জনতার সহিংসতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর আরোপিত সাংবিধানিক ও আইনি বিধিনিষেধ। ১৯৭৪ সালের দ্বিতীয় সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে আহমদিয়াদের আনুষ্ঠানিকভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়।
এখানেই একটি সুস্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে পাকিস্তান এমন একটি প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকার দাবি করে, যা নগর পরিকল্পনা, বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত ছিল; অন্যদিকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার অভিযোগে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে।
উপসংহার
সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতাকে নতুন করে সামনে আনার মাধ্যমে পাকিস্তান শুধু নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে না; বরং ঐতিহ্যভিত্তিক কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি নতুনভাবে গড়ে তুলতেও আগ্রহী।
তবে ইসলাম-পূর্ব ঐতিহ্যের এই নির্বাচিত পুনরাবিষ্কার একটি মৌলিক প্রশ্নও উত্থাপন করে। কারণ পাকিস্তানের আধুনিক রাষ্ট্রপরিচয় দীর্ঘদিন ধরে দ্বিজাতি তত্ত্ব, ইসলামী মূল্যবোধ এবং পৃথক মুসলিম রাজনৈতিক জাতিসত্তার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই আদর্শিক ভিত্তির সঙ্গে আজকের এই নতুন সভ্যতাভিত্তিক পরিচয়ের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়।
এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন প্রাচীন সভ্যতার বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান পাকিস্তানের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার তুলনা করা হয়।
যদি পাকিস্তান সত্যিই তার ইতিহাসকে বৈচিত্র্য, সহাবস্থান এবং সভ্যতার ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করতে চায়, তাহলে সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একইসঙ্গে দেশের ভেতরে বসবাসকারী সব ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায়ের অধিকার, মর্যাদা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রেও সেই অঙ্গীকার দৃশ্যমান হতে হবে।
একটি সভ্যতার উত্তরাধিকার কেবল প্রাচীন নগর, প্রত্নস্থল কিংবা আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রচারণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রকৃত অর্থে একটি রাষ্ট্রের সভ্যতাগত পরিপক্বতার মূল্যায়ন হয় সে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের—বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের—অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপর।
শিশির গুপ্ত 



















