উচ্চশিক্ষার ব্যয় বাড়ছে, চাকরির বাজার হয়ে উঠছে আরও অনিশ্চিত, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। এমন বাস্তবতায় অনেক তরুণ-তরুণী এখন চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক পেশা ও কারিগরি প্রশিক্ষণকে বেছে নিচ্ছেন। তাদের বিশ্বাস, হাতে-কলমে শেখা দক্ষতা দ্রুত আয়ের সুযোগ তৈরি করছে এবং ভবিষ্যতের কর্মবাজারেও এর চাহিদা স্থিতিশীল থাকবে।
বদলে যাচ্ছে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবনা
একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন ২৩ বছর বয়সী লাডোনা গ্লাস। কিন্তু উচ্চশিক্ষার বিপুল ব্যয় এবং বিনিয়োগের যথাযথ ফল মিলবে কি না, সেই প্রশ্ন তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বিদ্যুৎকর্মীর শিক্ষানবিশ কর্মসূচিতে যোগ দেন।
বর্তমানে কাজের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি লাইসেন্সধারী বিদ্যুৎকর্মী হওয়ার পথে এগোচ্ছেন। তার মতে, দক্ষতাভিত্তিক পেশায় নিজের হাতে বাস্তব কিছু তৈরি করার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে আর্থিক নিরাপত্তার সম্ভাবনাও।
বাড়ছে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারিগরি শিক্ষা, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, নির্মাণ, ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে।
অনেক শিক্ষার্থীর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করে বিপুল ঋণের বোঝা নেওয়ার পরিবর্তে কম সময়ে দক্ষতা অর্জন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করাই এখন বেশি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবও বড় কারণ
তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অফিসভিত্তিক অনেক কাজ বদলে দিতে পারে। কিন্তু বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন, পাইপলাইন মেরামত, যন্ত্রপাতি স্থাপন কিংবা ওয়েল্ডিংয়ের মতো কাজ এখনও মানুষের দক্ষতার ওপরই নির্ভরশীল।
এই ধারণাই অনেককে এমন পেশার দিকে আকৃষ্ট করছে, যেখানে বাস্তব দক্ষতা সবচেয়ে বড় সম্পদ।
দ্রুত আয়ের সুযোগও আকর্ষণ বাড়াচ্ছে
কারিগরি প্রশিক্ষণ শেষ করার পর অনেকেই তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে ভালো আয়ের চাকরি পাচ্ছেন। কেউ বায়ুকল রক্ষণাবেক্ষণে, কেউ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়, আবার কেউ ওয়েল্ডিং বা বিদ্যুৎকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। অনেকের বার্ষিক আয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়া নতুন কর্মীদের সমপর্যায়ে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি।
তরুণদের ভাষায়, পড়াশোনা শেষে দীর্ঘদিন চাকরি খোঁজার অনিশ্চয়তার তুলনায় এই পথ তাদের কাছে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বাধাও রয়েছে
তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে অনেকেই পরিবার, শিক্ষক কিংবা পরিচিতদের আপত্তির মুখে পড়ছেন। বহু অভিভাবক এখনও মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই সফলতার একমাত্র পথ।
বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কারিগরি পেশাকে অনেক সময় পুরুষপ্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। তবুও নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণী এসব ধারণা ভেঙে ওয়েল্ডিং, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন।
ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে নতুন বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, অভিজ্ঞ কর্মীদের অবসর এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে আগামী বছরগুলোতে দক্ষ কারিগরি কর্মীর চাহিদা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা এখনও দীর্ঘমেয়াদে আয়ের সম্ভাবনা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও, সব শিক্ষার্থীর জন্য একটাই পথ উপযুক্ত—এমন ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বাস্তবতা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে। তাদের কাছে সফলতার সংজ্ঞা আর শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দক্ষতা অর্জনই হয়ে উঠছে নতুন শক্তি।
দক্ষতাভিত্তিক পেশায় ঝুঁকছে নতুন প্রজন্ম। উচ্চশিক্ষার ব্যয়, চাকরির অনিশ্চয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বদলাচ্ছে ক্যারিয়ারের ধারণা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















