যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা দশম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। একই সময়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে দুটি তেলবাহী জাহাজ আটকে দেওয়ারও দাবি করেছে তারা। এদিকে ওমান উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত উৎসের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও।
হরমুজকে কেন্দ্র করে সংঘাত
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যেই সর্বশেষ হামলা চালানো হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, নৌ সক্ষমতা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সেন্টকম বলেছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি তাদের অব্যাহত থাকবে।
ইরানের পাল্টা দাবি
আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও অন্যান্য সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী দুটি ‘নিয়ম না মানা’ তেলবাহী জাহাজ থামিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে তারা। ইরানের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিক যাচাই সম্ভব হয়নি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সতর্কতা
কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে। দেশটির বাসিন্দাদের বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাহরাইনও একাধিক হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে এবং সাইরেন বাজিয়ে নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সময়ে জর্ডান জানিয়েছে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং এতে কোনো হতাহত হয়নি।
নৌ চলাচল ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব
উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে এসেছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, সোমবার এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অতিক্রম করেছে মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ, যা আগের দিনের তুলনায় কম। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তারা প্রায় ৯০০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ পারাপারে সহায়তা করেছে। এসব জাহাজে প্রায় ৪৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করা হচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য ‘বিশ্বব্যাপী সতর্কতা’ জারি করেছে। এতে মার্কিন নাগরিকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নতুন করে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
হরমুজে সংঘাত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের ওপরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও তীব্র। পাল্টাপাল্টি হামলা, তেলবাহী জাহাজে ঝুঁকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















