টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মরিচ ও সবজির ক্ষেতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় মরিচ, পেঁপে, আমনের বীজতলা এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, জেলার ২২২ হেক্টর জমির সবজি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে সবজির সরবরাহ কমে দামও কয়েক গুণ বেড়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাতটি উপজেলায় ৪ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি, ৯০০ হেক্টরে পেঁপে, ২৩১ হেক্টরে রোপা আমনের বীজতলা এবং ৪৩০ হেক্টরে মরিচের আবাদ করা হয়েছে।
টানা বৃষ্টির কারণে ১৪৪ হেক্টর জমির বিভিন্ন সবজি, ৫৫ হেক্টর জমির পেঁপে এবং ১৬ হেক্টর জমির রোপা আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে বেগুন, লাউ, ধুন্দল, লালশাক, করলা, মুলা শাক, পুঁইশাক, পটোল, চালকুমড়া, ঢ্যাঁড়শ ও শসা। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৮৮৫ জন কৃষক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাজাহান সিরাজ জেলা সমন্বয় সভায় এই তথ্য উপস্থাপন করেন।
মাঠে গাছ পচে যাচ্ছে
জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় মরিচ গাছের গোড়া পচে যাচ্ছে, পাতাগুলো হলুদ হয়ে ঝরে পড়ছে। কোথাও কোথাও সবজির গাছ মাচার ওপরই শুকিয়ে নুয়ে পড়েছে। পেঁপে গাছের গোড়া নরম হয়ে অনেক গাছ মাটিতে পড়ে যাচ্ছে।

কৃষকদের দুর্ভোগ
হরিরামপুর উপজেলার বাল্লা গ্রামের কৃষক জমির উদ্দিন জানান, ৮৫ শতাংশ জমিতে মরিচ চাষ করেছিলেন। বৃষ্টির আগে ফলন ভালো ছিল এবং বাজারদরও সন্তোষজনক ছিল। তবে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে যাওয়ায় এখন গাছ মরে যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে অপরিপক্ব মরিচ তুলতে হচ্ছে।
একই উপজেলার কৃষক মনির হোসেন জানান, আগে পেঁয়াজ চাষে ক্ষতির মুখে পড়ে পরে মরিচের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু এবারও বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে মরিচ গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সদর উপজেলার জাগির, সাটুরিয়ার জান্না এবং সিংগাইরের জয়মন্টপ ইউনিয়ন জেলার প্রধান সবজি উৎপাদন এলাকা। এসব অঞ্চলের প্রায় ৬০ শতাংশ জমির সবজি টানা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাগির ইউনিয়নের কৃষক চাঁন মিয়া জানান, ১৫০ শতাংশ জমিতে ধুন্দল ও কুমড়া চাষে ৬২ হাজার টাকার বেশি ব্যয় করেছিলেন। বৃষ্টির আগে মাত্র ২৭ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতে পেরেছেন। এখন ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গাছ মারা যাচ্ছে।
সাটুরিয়ার গফ্ফার মিয়া বলেন, তাঁর লালশাক ও মুলা শাকের পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে সিংগাইরের কৃষক আজাহার হোসেন জানান, পেঁপে গাছে প্রচুর ফল এলেও বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ গাছ পড়ে গেছে।
বাজারে সবজির দামে বড় উল্লম্ফন
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে অনেক সবজির দাম গড়ে চার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
বৃষ্টির আগে প্রতি কেজি মরিচ ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ১৪০ থেকে ২০০ টাকায় উঠেছে। ধুন্দল ও চিচিঙ্গা ১৫ থেকে ২০ টাকার বদলে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বেগুন ৩০ থেকে ৪০ টাকার পরিবর্তে ৮০ থেকে ১২০ টাকা এবং ঢ্যাঁড়শ ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাউ, কুমড়া, লাউশাক ও মিষ্টি কুমড়ার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মাঠ পর্যায়ে ফসল নষ্ট হওয়ায় পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। আর সেই প্রভাবেই খুচরা বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে।
টানা বৃষ্টিতে মানিকগঞ্জে ২২২ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সবজির দামও কয়েক গুণ বেড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















