ভারতের অরুণাচল প্রদেশের লোহিত নদী অববাহিকায় প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের অন্যতম বিরল পাখি সাদা-পেট বকের ভারতে টিকে থাকার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পানির স্বচ্ছতা এবং তীরবর্তী বনভূমির পরিবর্তন এই পাখির বাসস্থান ও প্রজননকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলবে।
অতি বিরল এই পাখির শেষ আশ্রয়
সাদা-পেট বক বিশ্বের সবচেয়ে দুর্লভ জলচর পাখিদের একটি। ভারতে বর্তমানে মাত্র ছয় থেকে নয়টি সাদা-পেট বক টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। এগুলো মূলত নোয়া-দিহিং, লাহম এবং লোহিত নদী এলাকায় বিচরণ করে। এর মধ্যে লোহিত নদী অববাহিকাতেই দেশের প্রায় সত্তর শতাংশ পাখির আবাস।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পাখি অগভীর পানিতে মাছ শিকার করে এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। পানির প্রবাহ বা স্বচ্ছতায় বড় পরিবর্তন এদের খাদ্য সংগ্রহকে কঠিন করে তুলতে পারে।
বাঁধ প্রকল্প নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

লোহিত নদীতে এক হাজার দুইশ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে তেত্রিশ হাজারেরও বেশি গাছ কাটা হবে বলে জানা গেছে।
পরিবেশবিদদের অভিযোগ, প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে সাদা-পেট বকের উপস্থিতি ও সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। অথচ এই এলাকাই ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলগুলোর একটি।
বন ধ্বংসে প্রজননও হুমকিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তীরবর্তী পরিণত বনভূমি সাদা-পেট বকের বাসা বাঁধা ও বিশ্রামের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঁধ নির্মাণের ফলে এসব বনভূমি কেটে ফেলা বা পানির নিচে তলিয়ে গেলে পাখিটির প্রজনন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
এছাড়া এই প্রজাতি মানুষের সামান্য উপস্থিতিও এড়িয়ে চলে। তাই নির্মাণকাজ, যানবাহন চলাচল এবং মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেলে পাখির স্বাভাবিক জীবনচক্র আরও বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিস্তৃতি কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে

একসময় ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের বিস্তৃত অঞ্চলে সাদা-পেট বকের দেখা মিলত। কিন্তু গত এক শতকে এর বিস্তৃতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে অরুণাচল প্রদেশ, ভুটান এবং মিয়ানমারের কয়েকটি সীমিত এলাকায় এই বিরল পাখি টিকে আছে।
ভারতের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনে সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও এর সংখ্যা ক্রমাগত কমছে বলে সংরক্ষণবিদরা সতর্ক করেছেন।
স্থানীয়দেরও আপত্তি
প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি রয়েছে। তাদের দাবি, বিপুল পরিমাণ জমি ও বনাঞ্চল পানির নিচে চলে যাবে, যার প্রভাব পড়বে জীবিকা, সংস্কৃতি এবং পরিবেশের ওপর। জনশুনানিতেও প্রকল্পের পরিবেশগত তথ্য ও বাস্তবতার মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ তোলা হয়েছে।
বিস্তৃত পরিকল্পনার দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রকল্প এলাকা নয়, পুরো লোহিত নদী অববাহিকাকে একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। কারণ সাদা-পেট বকের মতো বিরল প্রজাতির জন্য বিচ্ছিন্নভাবে মূল্যায়ন করলে প্রকৃত পরিবেশগত ক্ষতির চিত্র উঠে আসে না।
তাদের মতে, বাঘ বা হাতির মতো পরিচিত বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি এমন বিরল প্রজাতির সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে বিশ্বের অন্যতম দুর্লভ এই পাখির ভারতে অস্তিত্ব একসময় পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















