ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষা (এনইইটি) প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে বিরোধী দলগুলোর বিক্ষোভের মুখে বুধবার সংসদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। একই সঙ্গে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী ও যুবকদের প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর তরুণদের পক্ষ থেকে এটি তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
সংসদে উত্তেজনা, কার্যক্রম স্থগিত
বুধবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী সংসদ সদস্যরা সংসদ ভবনের বাইরে বিক্ষোভ করেন। অনেকেই কালো পোশাক পরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে প্ল্যাকার্ড বহন করেন। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, “আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ বিক্রির জন্য নয়” এবং “এনইইটি বাঁচান, জীবন বাঁচান”।
পরে সংসদে প্রবেশ করে বিরোধী সদস্যরা শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আলোচনা দাবি করেন। এতে সংসদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়।
তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, তারা এনইইটি এবং শিক্ষা সংস্কার নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত।
রাজধানী থেকে দেশজুড়ে আন্দোলন
গত মাসে এনইইটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পর আন্দোলনের সূচনা হয়। এই পরীক্ষায় প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল।
সোমবার নয়াদিল্লিতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে।
বুধবার দিল্লির জনতার মান্তারে এক হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী জড়ো হন। আন্দোলনের সংগঠকেরা জানিয়েছেন, সরকারের এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর সঙ্গে তাদের দ্বিতীয় দফা আলোচনারও কথা রয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে দিল্লি মেট্রো কর্তৃপক্ষ রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকার ১৬টি স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে।
এদিকে আন্দোলন দিল্লির বাইরে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, গোয়া, গৌহাটি, তিরুবনন্তপুরম, জম্মু ও আহমেদাবাদসহ বিভিন্ন শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে।

সরকারের প্রতিশ্রুতি
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, সরকার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং পরীক্ষা পদ্ধতিতে সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, সরকার এনইইটি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা এবং তরুণদের সব যৌক্তিক উদ্বেগের সমাধানে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিরোধীদের চাপ অব্যাহত
মঙ্গলবার রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের প্রবেশপথের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পুলিশ রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রাসহ কয়েকজন শীর্ষ বিরোধী নেতাকে আটক করলেও পরে তাদের ছেড়ে দেয়।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির ভেতরে প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণেই সরকার এ দাবিতে নতি স্বীকার করছে না।
তরুণদের ক্ষোভ কেন বাড়ছে
অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামের আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কর্মসংস্থানের সংকট, ঘন ঘন পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা—এসব কারণে বহু তরুণ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
আন্দোলনটি সামাজিক কর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থন পাওয়ার পর আরও গতি পায়। অনশনরত অবস্থায় তাকে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে গেলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে তা মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরও বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের জেরে ভারতে বিক্ষোভ তীব্র হয়েছে। সংসদে অচলাবস্থা, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি ও শিক্ষা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ঘিরে বাড়ছে চাপ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















