০৮:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
খাইবার পাখতুনখোয়ায় টানা বৃষ্টিতে প্রাণহানি বেড়ে ১৮, ভূমিধসে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ জনতার মঞ্চে বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি, ধামেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগসহ তিন দাবিতে অনড় সিজেপি ট্রাম্পের ১০% শুল্কের মেয়াদ শেষ ২৪ জুলাই: ভারতীয় পণ্যের সামনে নতুন অনিশ্চয়তা, বাড়তে পারে আরও শুল্ক বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সুবিধা: ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক লেনদেন আরও সহজ, রপ্তানি আয় আনতে মিলবে বাড়তি সহায়তা সাংবাদিক আবু হেনা রাসেল আর নেই, শোকে ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন হুথিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণার নিন্দা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কা, ছয় মাসে আয় ১৯.৩৪ বিলিয়ন ডলার সরকারি ক্রয় কমিটির অনুমোদন: ৩০৩ কোটি টাকায় এমওপি সার আমদানি ও ১.৬ কোটি খাদ্য বস্তা কেনা বাড়ির বাগানের ওপর দিয়ে ছুটছে মহাসড়ক, তবু বাসিন্দাদের কাছে সেটিই আশ্রয়ের ছাদ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট সিঙ্গাপুরের, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়

মেসিকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: যখন সুন্দর খেলা ঘৃণার অস্ত্রে পরিণত হয়

লিওনেল মেসির চোখের জল ছিল একটি ফুটবল যুগের আবেগঘন সমাপ্তির প্রতীক। বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজয়ের পরও আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা তাকে যেভাবে বিদায় জানিয়েছেন, তা খেলাধুলার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার এমন দৃশ্য সাধারণত মানুষকে একত্র করে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে সেই মুহূর্তও বেশিক্ষণ নির্মল থাকেনি। খুব দ্রুত সেটি ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ এবং ঘৃণার নতুন উপকরণে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা পোস্টে মেসিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, এমনকি তাকে ইহুদি বলেও দাবি করা হয়। বাস্তবতা হলো, মেসি ইহুদি নন। কিন্তু ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জগতে সত্যের চেয়ে কল্পনাই বেশি কার্যকর। সেখানে একটি মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রমাণের দরকার হয় না; দরকার হয় এমন একটি গল্প, যা মানুষের ক্ষোভ ও পূর্বধারণাকে খাওয়াতে পারে।

এই প্রচারণা কেবল ফুটবল নিয়ে আবেগপ্রবণ সমর্থকদের অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া নয়। এটি আরও গভীর একটি প্রবণতার অংশ, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং দীর্ঘদিনের ইহুদিবিদ্বেষকে এক সুতোয় গেঁথে নতুন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। স্পেনকে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে ফিলিস্তিনের প্রতীক এবং আর্জেন্টিনাকে ইসরায়েলের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে মেসির অতীতের কিছু সফর ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বেছে নিয়ে এমন একটি কাহিনি নির্মাণ করা হয়েছে, যেন তিনি কোনো গোপন আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার অংশ।

কিন্তু এই বয়ান ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক তথ্য আড়াল করে। মেসি ২০১৩ সালে পশ্চিম প্রাচীর সফর করেছিলেন ঠিকই, তবে সেটি ছিল একটি শান্তি সফরের অংশ। একই সফরে তিনি পশ্চিম তীরেও গিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং ফিলিস্তিনি শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলেছিলেন। ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বৈশিষ্ট্যই হলো, এটি পূর্ণ সত্যকে নয়, সুবিধাজনক অংশকে বেছে নেয়।

আরেকটি সমান্তরাল অভিযোগ ছিল, ফিফা নাকি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে চেয়েছিল। রেফারিদের সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের কিছু বিতর্কিত মুহূর্তকে কেন্দ্র করে সেই অভিযোগ আরও ছড়ানো হয়। কিন্তু এখানেও খেলার বিশ্লেষণ খুব দ্রুত গিয়ে ঠেকে পুরোনো একটি বিদ্বেষপূর্ণ ধারণায়—বিশ্বের বড় প্রতিষ্ঠান, সরকার, সংবাদমাধ্যম কিংবা খেলাধুলার নিয়ন্ত্রণ নাকি একটি গোপন ইহুদি নেটওয়ার্কের হাতে।

এই ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নতুন নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইহুদিদের সম্পর্কে যে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কেবল তার নতুন বাহন। আগে এসব ধারণা বই, পুস্তিকা বা রাজনৈতিক বক্তৃতায় ছড়াত; এখন কয়েক সেকেন্ডে লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফুটবলের মতো বৈশ্বিক জনপ্রিয় একটি আসর সেই প্রচারণার জন্য আদর্শ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন ফাইনাল: পরিসংখ্যান ও মেসি-ইয়ামাল লড়াই | দ্য ডেইলি  স্টার

অনলাইন বিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইবারওয়েলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ চলাকালে ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি ভাষায় অসংখ্য পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে ইহুদিরা গোপনে ফিফা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সংবাদমাধ্যম এবং বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে গাজায় ঘটে যাওয়া সব ঘটনার জন্য সমষ্টিগতভাবে ইহুদিদের দায়ী করার প্রচেষ্টাও ছিল সেই প্রচারণার অংশ। অর্থাৎ একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে ব্যবহার করা হয়েছে বহু পুরোনো বিদ্বেষকে নতুনভাবে বৈধতা দেওয়ার জন্য।

এ ধরনের প্রচারণা সবচেয়ে বিপজ্জনক তখনই হয়ে ওঠে, যখন তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক আলোচনার অংশে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম উত্তেজক, বিভাজনমূলক এবং আবেগনির্ভর বিষয়কে বেশি ছড়িয়ে দেয়। ফলে ভিত্তিহীন দাবিও বারবার সামনে আসে এবং অনেকের কাছে সেটিই সত্য বলে মনে হতে শুরু করে। ষড়যন্ত্রতত্ত্বের শক্তি এখানেই—এটি যুক্তির মাধ্যমে নয়, পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে বিশ্বাস তৈরি করে।

ফুটবল কখনোই পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে ছিল না। জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস, যুদ্ধ, অভিবাসন কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবকিছুর প্রতিফলন এই খেলায় দেখা যায়। তাই বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে সমসাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব থাকবেই। কিন্তু রাজনৈতিক মতভেদ আর ঘৃণাভিত্তিক ষড়যন্ত্র এক বিষয় নয়। কোনো খেলোয়াড়কে বিদ্বেষের প্রতীক বানানো কিংবা একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শতাব্দীপ্রাচীন অপপ্রচার পুনর্জীবিত করা খেলাধুলার স্বাভাবিক রাজনৈতিক মাত্রাকে অতিক্রম করে বিপজ্জনক সামাজিক বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়।

ফিফার বহুল ব্যবহৃত স্লোগান—‘ফুটবল বিশ্বকে এক করে’—নিঃসন্দেহে একটি আকাঙ্ক্ষার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। আজকের পৃথিবীতে একই খেলা যেমন কোটি মানুষকে আনন্দ দেয়, তেমনি সেটিকেই ঘৃণা, বিভ্রান্তি এবং বিভাজনের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। প্রযুক্তি এই দুই সম্ভাবনাকেই সমানভাবে বিস্তৃত করেছে।

মেসিকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া এই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব শেষ পর্যন্ত শুধু একজন খেলোয়াড়কে অপমান করেনি। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সামাজিক বিভাজন কত সহজে এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যেখানে একটি ফুটবল ম্যাচও আর কেবল ফুটবল থাকে না। বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের বিদায়বেলাও তখন বিদ্বেষের রাজনৈতিক প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়।

সুন্দর খেলার জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে?

জনপ্রিয় সংবাদ

খাইবার পাখতুনখোয়ায় টানা বৃষ্টিতে প্রাণহানি বেড়ে ১৮, ভূমিধসে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ

মেসিকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: যখন সুন্দর খেলা ঘৃণার অস্ত্রে পরিণত হয়

০৭:০৯:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

লিওনেল মেসির চোখের জল ছিল একটি ফুটবল যুগের আবেগঘন সমাপ্তির প্রতীক। বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজয়ের পরও আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা তাকে যেভাবে বিদায় জানিয়েছেন, তা খেলাধুলার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার এমন দৃশ্য সাধারণত মানুষকে একত্র করে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে সেই মুহূর্তও বেশিক্ষণ নির্মল থাকেনি। খুব দ্রুত সেটি ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ এবং ঘৃণার নতুন উপকরণে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা পোস্টে মেসিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, এমনকি তাকে ইহুদি বলেও দাবি করা হয়। বাস্তবতা হলো, মেসি ইহুদি নন। কিন্তু ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জগতে সত্যের চেয়ে কল্পনাই বেশি কার্যকর। সেখানে একটি মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রমাণের দরকার হয় না; দরকার হয় এমন একটি গল্প, যা মানুষের ক্ষোভ ও পূর্বধারণাকে খাওয়াতে পারে।

এই প্রচারণা কেবল ফুটবল নিয়ে আবেগপ্রবণ সমর্থকদের অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া নয়। এটি আরও গভীর একটি প্রবণতার অংশ, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং দীর্ঘদিনের ইহুদিবিদ্বেষকে এক সুতোয় গেঁথে নতুন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। স্পেনকে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে ফিলিস্তিনের প্রতীক এবং আর্জেন্টিনাকে ইসরায়েলের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে মেসির অতীতের কিছু সফর ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বেছে নিয়ে এমন একটি কাহিনি নির্মাণ করা হয়েছে, যেন তিনি কোনো গোপন আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার অংশ।

কিন্তু এই বয়ান ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক তথ্য আড়াল করে। মেসি ২০১৩ সালে পশ্চিম প্রাচীর সফর করেছিলেন ঠিকই, তবে সেটি ছিল একটি শান্তি সফরের অংশ। একই সফরে তিনি পশ্চিম তীরেও গিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং ফিলিস্তিনি শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলেছিলেন। ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বৈশিষ্ট্যই হলো, এটি পূর্ণ সত্যকে নয়, সুবিধাজনক অংশকে বেছে নেয়।

আরেকটি সমান্তরাল অভিযোগ ছিল, ফিফা নাকি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে চেয়েছিল। রেফারিদের সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের কিছু বিতর্কিত মুহূর্তকে কেন্দ্র করে সেই অভিযোগ আরও ছড়ানো হয়। কিন্তু এখানেও খেলার বিশ্লেষণ খুব দ্রুত গিয়ে ঠেকে পুরোনো একটি বিদ্বেষপূর্ণ ধারণায়—বিশ্বের বড় প্রতিষ্ঠান, সরকার, সংবাদমাধ্যম কিংবা খেলাধুলার নিয়ন্ত্রণ নাকি একটি গোপন ইহুদি নেটওয়ার্কের হাতে।

এই ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নতুন নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইহুদিদের সম্পর্কে যে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কেবল তার নতুন বাহন। আগে এসব ধারণা বই, পুস্তিকা বা রাজনৈতিক বক্তৃতায় ছড়াত; এখন কয়েক সেকেন্ডে লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফুটবলের মতো বৈশ্বিক জনপ্রিয় একটি আসর সেই প্রচারণার জন্য আদর্শ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন ফাইনাল: পরিসংখ্যান ও মেসি-ইয়ামাল লড়াই | দ্য ডেইলি  স্টার

অনলাইন বিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইবারওয়েলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ চলাকালে ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি ভাষায় অসংখ্য পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে ইহুদিরা গোপনে ফিফা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সংবাদমাধ্যম এবং বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে গাজায় ঘটে যাওয়া সব ঘটনার জন্য সমষ্টিগতভাবে ইহুদিদের দায়ী করার প্রচেষ্টাও ছিল সেই প্রচারণার অংশ। অর্থাৎ একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে ব্যবহার করা হয়েছে বহু পুরোনো বিদ্বেষকে নতুনভাবে বৈধতা দেওয়ার জন্য।

এ ধরনের প্রচারণা সবচেয়ে বিপজ্জনক তখনই হয়ে ওঠে, যখন তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক আলোচনার অংশে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম উত্তেজক, বিভাজনমূলক এবং আবেগনির্ভর বিষয়কে বেশি ছড়িয়ে দেয়। ফলে ভিত্তিহীন দাবিও বারবার সামনে আসে এবং অনেকের কাছে সেটিই সত্য বলে মনে হতে শুরু করে। ষড়যন্ত্রতত্ত্বের শক্তি এখানেই—এটি যুক্তির মাধ্যমে নয়, পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে বিশ্বাস তৈরি করে।

ফুটবল কখনোই পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে ছিল না। জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস, যুদ্ধ, অভিবাসন কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবকিছুর প্রতিফলন এই খেলায় দেখা যায়। তাই বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে সমসাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব থাকবেই। কিন্তু রাজনৈতিক মতভেদ আর ঘৃণাভিত্তিক ষড়যন্ত্র এক বিষয় নয়। কোনো খেলোয়াড়কে বিদ্বেষের প্রতীক বানানো কিংবা একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শতাব্দীপ্রাচীন অপপ্রচার পুনর্জীবিত করা খেলাধুলার স্বাভাবিক রাজনৈতিক মাত্রাকে অতিক্রম করে বিপজ্জনক সামাজিক বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়।

ফিফার বহুল ব্যবহৃত স্লোগান—‘ফুটবল বিশ্বকে এক করে’—নিঃসন্দেহে একটি আকাঙ্ক্ষার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। আজকের পৃথিবীতে একই খেলা যেমন কোটি মানুষকে আনন্দ দেয়, তেমনি সেটিকেই ঘৃণা, বিভ্রান্তি এবং বিভাজনের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। প্রযুক্তি এই দুই সম্ভাবনাকেই সমানভাবে বিস্তৃত করেছে।

মেসিকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া এই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব শেষ পর্যন্ত শুধু একজন খেলোয়াড়কে অপমান করেনি। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সামাজিক বিভাজন কত সহজে এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যেখানে একটি ফুটবল ম্যাচও আর কেবল ফুটবল থাকে না। বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের বিদায়বেলাও তখন বিদ্বেষের রাজনৈতিক প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়।

সুন্দর খেলার জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে?