ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। তবে এই উদযাপনকে ঘিরে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে—যে শহর জলাবদ্ধতা, যানজট, দূষণ ও অবকাঠামোগত সংকটে প্রতিদিন নাকাল, সেই শহরের ঠিক কোন অর্জন উদযাপন করা হচ্ছে?
ইতিহাসের গৌরব, বর্তমানের বাস্তবতা
ঢাকার দীর্ঘ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিঃসন্দেহে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে রাজধানীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি উৎসব, নাটক, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও অন্যান্য আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আয়োজকদের মতে, শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই এই উৎসবের প্রধান লক্ষ্য।
অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক
উৎসবের ব্যয় নির্বাহে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে অনুদান চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক খাতের একটি অংশে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, এই ধরনের তহবিল মূলত জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত, তাই উৎসবের ব্যয়ে তা ব্যবহার কতটা যৌক্তিক, সে বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনুদান দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। যে প্রতিষ্ঠান ইচ্ছুক, তারাই এতে অংশ নিতে পারবে।
নাগরিক ভোগান্তিই আলোচনার কেন্দ্র
সম্প্রতি অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। সড়কে দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। একই সময়ে রাজধানীর বসবাসযোগ্যতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসন, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ এবং সবুজ এলাকা রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলেই রাজধানীর সমস্যা আরও জটিল হয়েছে।
উন্নয়নের দাবি ও বাস্তবতার ব্যবধান
গত কয়েক বছরে ড্রেন ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করা হলেও বর্ষা এলেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের জলাবদ্ধতার চিত্র দেখা যায়। পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
![]()
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একটি শহরের প্রকৃত সাফল্য কেবল উৎসবের আয়োজন দিয়ে নয়, বরং নাগরিকদের নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও স্বস্তিদায়ক জীবন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই পরিমাপ করা উচিত।
উৎসবের পাশাপাশি সমাধানের প্রত্যাশা
রাজধানীর ইতিহাস ও সংস্কৃতি উদযাপন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নাগরিকদের প্রত্যাশা, উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দূষণ, যানজট ও নগর পরিকল্পনার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ একটি শহরের গৌরব তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার বাসিন্দারাও সেই শহরে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারেন।
ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি তাই শুধু উৎসবের উপলক্ষ নয়, বরং ভবিষ্যতের আরও বাসযোগ্য রাজধানী গড়ার অঙ্গীকার নতুন করে স্মরণ করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















