ইংল্যান্ডের ডেভন ও কর্নওয়ালের একাধিক বিদ্যালয়ে কঠোর শৃঙ্খলানীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বড় সাফল্য এনে দিয়েছে। অভিযোগ ছিল, বিদ্যালয়গুলোতে এমন কঠোর নিয়ম চালু করা হয়েছিল, যা অনেক শিক্ষার্থীর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রবল জনচাপের মুখে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ট্রাস্ট এখন নিজেকে বিলুপ্ত করে বিদ্যালয়গুলো অন্য ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
টয়লেটে যাওয়ার ভয়ে পানি পান বন্ধ
১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যামেলিয়ার অভিজ্ঞতা এই বিতর্কের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। বিদ্যালয়ের কঠোর নিয়মের কারণে ক্লাস চলাকালে সহজে টয়লেটে যাওয়ার অনুমতি মিলত না। শাস্তির ভয়ে সে স্কুলে পানি পানই বন্ধ করে দেয়, যাতে টয়লেটে যেতে না হয়।
তার মা কেলির দাবি, দীর্ঘদিন এমন অবস্থায় থাকার ফলে অ্যামেলিয়া একাধিক মূত্রনালির সংক্রমণে আক্রান্ত হয় এবং তার কিডনিতেও ক্ষত তৈরি হয়েছে। বর্তমানে তাকে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হচ্ছে।
শৃঙ্খলা নাকি ভয়ের পরিবেশ?
অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং সাবেক শিক্ষকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলোতে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যেখানে শিক্ষার্থীরা সব সময় ভুল করার ভয়ে আতঙ্কিত থাকত।
একজন এডিএইচডি-সম্পন্ন শিক্ষার্থী জানিয়েছে, প্রতিনিয়ত মনে হতো সামান্য ভুল করলেই শাস্তি পেতে হবে। অন্যদিকে একাধিক সাবেক শিক্ষক বলেছেন, শ্রেণিকক্ষে এমন নীরবতা বজায় রাখতে বাধ্য করা হতো যে, সঙ্গীতের ক্লাসও প্রায় কথা ছাড়া পরিচালনা করতে হতো।
তাদের ভাষায়, এটি শৃঙ্খলার চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণমূলক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
শাস্তির ঘরে কাটত ঘণ্টার পর ঘণ্টা
বিদ্যালয়গুলোতে দুই ধাপের শাস্তি ব্যবস্থা চালু ছিল। প্রথমবার সতর্কবার্তা, দ্বিতীয়বার একই ধরনের আচরণ করলে শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে ‘রিফ্লেকশন’ নামে একটি কক্ষে পাঠানো হতো। সেখানে দীর্ঘ সময় নীরবে বসে নির্ধারিত কাজ করতে হতো।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একটি বিদ্যালয়ে মাত্র ছয় মাসে প্রায় এক হাজারবার শিক্ষার্থীকে এমন কক্ষে পাঠানো হয়েছিল।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি শাস্তির মুখে পড়েছে।
কেউ জানিয়েছেন, তাদের সন্তান জানালার বাইরে কয়েক সেকেন্ড তাকালেও তাকে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হতো। আবার অটিজম বা শ্রবণপ্রতিবন্ধকতাসহ নানা সমস্যাকে আচরণগত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
কয়েকটি বিদ্যালয়ে সাময়িক বহিষ্কারের হারও জাতীয় গড়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ছিল।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা
সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের দাবি, তাদের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার পরিবেশ শান্ত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ রাখা। তারা বলেছে, টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পেশাগত বিবেচনার সুযোগ ছিল এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শাস্তির কক্ষগুলো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তদারকিসহ পরিচালিত হতো এবং সাম্প্রতিক সময়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হারও কমেছে।
আন্দোলনের ফল, ভেঙে যাচ্ছে ট্রাস্ট
মাসের পর মাস অভিভাবকদের প্রতিবাদ, গণস্বাক্ষর অভিযান, বিদ্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমর্থনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়।
প্রথমে ট্রাস্টের প্রধান পদত্যাগ করেন। এরপর ট্রাস্ট ঘোষণা দেয়, তারা নিজেদের বিলুপ্ত করে বিদ্যালয়গুলো অন্য শিক্ষা ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করবে।
দেশটির শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। বিদ্যালয়গুলো নতুন ট্রাস্টের অধীনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমান পরিচালনাকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের প্রতি শৃঙ্খলাবিষয়ক নীতি যুক্তিসংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে।
শৃঙ্খলা বনাম শিক্ষার্থীর কল্যাণ
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কঠোর শৃঙ্খলা শিক্ষার মান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে এবং শ্রেণিকক্ষকে সুশৃঙ্খল রাখে। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, শৃঙ্খলা এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা ভয়, মানসিক চাপ বা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
এই ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সীমা কোথায়, আর সেই সীমা অতিক্রম করলে তার মূল্য কতটা বড় হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















