১০:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক

জাপানের প্রতিরক্ষা উত্থান: গাড়ি শিল্পের সংকটের কি সত্যিই সমাধান?

জাপান প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় দ্রুত বাড়াচ্ছে, আর সেই সঙ্গে দেশটির সংকটে থাকা গাড়ি শিল্পে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত গাড়ি কারখানাকে সামরিক সরঞ্জাম, বিশেষ করে সামরিক ড্রোন তৈরির কাজে লাগানোর ধারণা তাই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি পুরোনো শিল্প অবকাঠামোকে নতুন পণ্যের জন্য ব্যবহার করলেই যে নতুন শিল্প সক্ষমতা তৈরি হবে—এমন ধারণা জাপানের জন্য বিপজ্জনকভাবে সরল।

জাপান প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে। একই সময়ে মনুষ্যবিহীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ প্রায় ১১১ বিলিয়ন ইয়েন থেকে বেড়ে ২৭৭ বিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছেছে। এই বাড়তি চাহিদা গাড়ি শিল্পের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল টোকিওর কাছে নিসানের একটি কারখানা কেনার বিষয়ে আলোচনা করছে, যাতে সেখানে সামরিক ড্রোন উৎপাদন করা যায়। ইউরোপেও কম ব্যবহৃত গাড়ি কারখানাকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে কাজে লাগানোর অনুরূপ চিন্তা চলছে।

দেখতে বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু শিল্পনীতি হিসেবে এটি বড় ধরনের ভুল হিসাবেও পরিণত হতে পারে।

কারখানা আর শিল্প সক্ষমতা এক জিনিস নয়

সামরিক ড্রোন এবং গাড়ি—দুটিই উন্নত প্রকৌশল ও উৎপাদন দক্ষতার ওপর নির্ভর করলেও তাদের ব্যবসায়িক কাঠামো এক নয়। গাড়ি শিল্পের মূল শক্তি হলো একই মডেলের বিপুল সংখ্যক পণ্য দ্রুত ও কম খরচে তৈরি করা। বিপরীতে সামরিক ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত পরিবর্তিত হয়। সফটওয়্যার, সেন্সর, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও নকশা নিয়মিত বদলাতে পারে।

মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান সম্প্রতি যে পার্থক্যের কথা বলেছেন, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি গাড়ি কারখানার উৎপাদন লাইন থাকা মানেই প্রতিরক্ষা পণ্য তৈরির প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থাকা নয়।

একটি প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রকৃত সম্পদ হলো দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষণা ও উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার জ্ঞান, পরীক্ষণ সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনে তৈরি উৎপাদন অভিজ্ঞতা। কারখানার ভবন বা যন্ত্রপাতি তার কেবল একটি অংশ।

সরকার বড় অঙ্কের অর্ডার দিতে পারে, কিন্তু অর্ডার দিয়ে রাতারাতি শিল্প সক্ষমতা তৈরি করা যায় না। বরং পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা ছাড়া সরকারি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন বাড়ার চেয়ে দাম দ্রুত বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। জাপানের সাম্প্রতিক বড় ধরনের সরকারি ব্যয় এরই মধ্যে আর্থিক বাজারে চাপ তৈরি করেছে; ইয়েন দুর্বল হয়েছে এবং সরকারি ঋণের খরচও বেড়েছে।

গাড়ি শিল্পের সংকট কেন জাতীয় সংকট

এখানে জাপানের সমস্যার গুরুত্ব বোঝা জরুরি। গাড়ি উৎপাদন দেশটির সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতগুলোর একটি এবং প্রায় ৫৫ লাখ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত, যা মোট কর্মশক্তির প্রায় ৮ শতাংশ। ফলে অব্যবহৃত কারখানার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ কেবল কয়েকটি কোম্পানির ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির প্রশ্ন।

জাপানি গাড়ি নির্মাতারা একই সঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চীনা নির্মাতারা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাড়ি রপ্তানিকারক হয়ে উঠেছে এবং চীনের বাজারেও জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর অবস্থান দ্রুত দুর্বল করছে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, চীনের গাড়ির বাজারে জাপানের অংশ ২০২০ সালের ২৩ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিদ্যুৎচালিত গাড়ির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সহজ নয়। অনেক বাজারে প্রত্যাশার তুলনায় ইভি বিক্রি ধীর হয়েছে। একই সময়ে মূল্য প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং প্রচলিত ইঞ্জিন, হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিতে একসঙ্গে বিনিয়োগের চাপ তৈরি হয়েছে। এসব কারণে জাপানি কোম্পানিগুলো তাদের আগের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে। হোন্ডা একাই ইভি ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ইয়েন ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং কয়েকটি পরিকল্পিত বৈদ্যুতিক মডেল বাতিল করেছে।

 

এই অবস্থায় কারখানাকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ব্যবহার করার প্রলোভন বোঝা যায়। কিন্তু সেটিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

Toyota Stops Production After Possible Cyberattack at a Supplier - The New York Times

পুরোনো সক্ষমতাকে নতুন শিল্পে রূপান্তর

জাপানের সামনে বরং অন্য একটি পথ রয়েছে। গাড়ি কারখানাগুলোকে সরাসরি ড্রোন বা সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় পরিণত করার বদলে দেখতে হবে, গাড়ি শিল্পের কোন প্রযুক্তিগত সক্ষমতাগুলো অন্য খাতে কাজে লাগানো সম্ভব।

পাওয়ার ইলেকট্রনিকস, সেন্সর, উন্নত উপকরণ, ব্যাটারি প্রযুক্তি, রোবোটিকস এবং নিখুঁত উৎপাদন—এসব ক্ষেত্রে জাপানের শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। এই সক্ষমতাগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এর জন্য নতুন দক্ষ জনবল, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, গবেষণা এবং নতুন অংশীদারত্বে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অর্থাৎ জাপানকে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। দেশটির প্রকৌশল দক্ষতা এবং উৎপাদন সংস্কৃতি এখনো বিশ্বমানের। প্রয়োজন হলো সেই পুরোনো শক্তিকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা।

প্রতিরক্ষা ব্যয়ের আসল লক্ষ্য কী?

প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি ব্যয়ের সাফল্য শুধু কতগুলো ড্রোন বা সামরিক সরঞ্জাম তৈরি হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই ব্যয় কি জাপানের সামগ্রিক শিল্পভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করছে?

এ কারণেই দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন প্রযুক্তি, যা একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করবে, অন্যদিকে বেসামরিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাও বাড়াবে। সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত ব্যাটারি, রোবোটিকস, সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উৎপাদন এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে এর জন্য ধৈর্য প্রয়োজন। শিল্প সক্ষমতা সরকারি ক্রয়াদেশের মাধ্যমে শুধু তৈরি হয় না; তা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠে।

চীনের শিল্প উত্থানও কেবল সরকারি ভর্তুকির ফল নয়। অবকাঠামো, প্রকৌশলী তৈরির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতার বিস্তার এবং পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিপরীতে পশ্চিমা অনেক অর্থনীতি উৎপাদন এশিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার ফলে নিজেদের শিল্পভিত্তির বড় অংশ হারিয়েছে।

জাপানের জন্য শিক্ষা স্পষ্ট। একটি কারখানা কেনা, ভর্তুকি দেওয়া কিংবা বড় সরকারি অর্ডার দেওয়া শিল্পশক্তির সমার্থক নয়। প্রকৃত সক্ষমতা তৈরি হয় দক্ষ মানুষ, প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ে।

তাই প্রতিরক্ষা খাতে জাপানের বর্তমান বিনিয়োগকে শুধু সামরিক উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটিকে ব্যবহার করতে হবে দেশের শিল্পভিত্তিকে পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রকল্প হিসেবে। গাড়ি শিল্পের প্রতিটি শক্তিকে যেখানে সম্ভব নতুন প্রযুক্তি ও নতুন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

জাপানের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হবে বেশি ড্রোন তৈরি করা নয়; এমন একটি শিল্প অর্থনীতি তৈরি করা, যা একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নিরাপদ। প্রতিরক্ষা উত্থান সেই পরিবর্তনের সুযোগ দিতে পারে—কিন্তু কেবল তখনই, যখন টোকিও কারখানা পুনর্ব্যবহার নয়, সক্ষমতা পুনর্গঠনের দিকে নজর দেবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্কুলে সহিংসতা ঠেকাতে আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

জাপানের প্রতিরক্ষা উত্থান: গাড়ি শিল্পের সংকটের কি সত্যিই সমাধান?

০৬:১৯:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

জাপান প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় দ্রুত বাড়াচ্ছে, আর সেই সঙ্গে দেশটির সংকটে থাকা গাড়ি শিল্পে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত গাড়ি কারখানাকে সামরিক সরঞ্জাম, বিশেষ করে সামরিক ড্রোন তৈরির কাজে লাগানোর ধারণা তাই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি পুরোনো শিল্প অবকাঠামোকে নতুন পণ্যের জন্য ব্যবহার করলেই যে নতুন শিল্প সক্ষমতা তৈরি হবে—এমন ধারণা জাপানের জন্য বিপজ্জনকভাবে সরল।

জাপান প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে। একই সময়ে মনুষ্যবিহীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ প্রায় ১১১ বিলিয়ন ইয়েন থেকে বেড়ে ২৭৭ বিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছেছে। এই বাড়তি চাহিদা গাড়ি শিল্পের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল টোকিওর কাছে নিসানের একটি কারখানা কেনার বিষয়ে আলোচনা করছে, যাতে সেখানে সামরিক ড্রোন উৎপাদন করা যায়। ইউরোপেও কম ব্যবহৃত গাড়ি কারখানাকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে কাজে লাগানোর অনুরূপ চিন্তা চলছে।

দেখতে বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু শিল্পনীতি হিসেবে এটি বড় ধরনের ভুল হিসাবেও পরিণত হতে পারে।

কারখানা আর শিল্প সক্ষমতা এক জিনিস নয়

সামরিক ড্রোন এবং গাড়ি—দুটিই উন্নত প্রকৌশল ও উৎপাদন দক্ষতার ওপর নির্ভর করলেও তাদের ব্যবসায়িক কাঠামো এক নয়। গাড়ি শিল্পের মূল শক্তি হলো একই মডেলের বিপুল সংখ্যক পণ্য দ্রুত ও কম খরচে তৈরি করা। বিপরীতে সামরিক ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত পরিবর্তিত হয়। সফটওয়্যার, সেন্সর, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও নকশা নিয়মিত বদলাতে পারে।

মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান সম্প্রতি যে পার্থক্যের কথা বলেছেন, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি গাড়ি কারখানার উৎপাদন লাইন থাকা মানেই প্রতিরক্ষা পণ্য তৈরির প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থাকা নয়।

একটি প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রকৃত সম্পদ হলো দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষণা ও উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার জ্ঞান, পরীক্ষণ সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনে তৈরি উৎপাদন অভিজ্ঞতা। কারখানার ভবন বা যন্ত্রপাতি তার কেবল একটি অংশ।

সরকার বড় অঙ্কের অর্ডার দিতে পারে, কিন্তু অর্ডার দিয়ে রাতারাতি শিল্প সক্ষমতা তৈরি করা যায় না। বরং পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা ছাড়া সরকারি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন বাড়ার চেয়ে দাম দ্রুত বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। জাপানের সাম্প্রতিক বড় ধরনের সরকারি ব্যয় এরই মধ্যে আর্থিক বাজারে চাপ তৈরি করেছে; ইয়েন দুর্বল হয়েছে এবং সরকারি ঋণের খরচও বেড়েছে।

গাড়ি শিল্পের সংকট কেন জাতীয় সংকট

এখানে জাপানের সমস্যার গুরুত্ব বোঝা জরুরি। গাড়ি উৎপাদন দেশটির সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতগুলোর একটি এবং প্রায় ৫৫ লাখ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত, যা মোট কর্মশক্তির প্রায় ৮ শতাংশ। ফলে অব্যবহৃত কারখানার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ কেবল কয়েকটি কোম্পানির ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির প্রশ্ন।

জাপানি গাড়ি নির্মাতারা একই সঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চীনা নির্মাতারা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাড়ি রপ্তানিকারক হয়ে উঠেছে এবং চীনের বাজারেও জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর অবস্থান দ্রুত দুর্বল করছে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, চীনের গাড়ির বাজারে জাপানের অংশ ২০২০ সালের ২৩ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিদ্যুৎচালিত গাড়ির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সহজ নয়। অনেক বাজারে প্রত্যাশার তুলনায় ইভি বিক্রি ধীর হয়েছে। একই সময়ে মূল্য প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং প্রচলিত ইঞ্জিন, হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিতে একসঙ্গে বিনিয়োগের চাপ তৈরি হয়েছে। এসব কারণে জাপানি কোম্পানিগুলো তাদের আগের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে। হোন্ডা একাই ইভি ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ইয়েন ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং কয়েকটি পরিকল্পিত বৈদ্যুতিক মডেল বাতিল করেছে।

 

এই অবস্থায় কারখানাকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে ব্যবহার করার প্রলোভন বোঝা যায়। কিন্তু সেটিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

Toyota Stops Production After Possible Cyberattack at a Supplier - The New York Times

পুরোনো সক্ষমতাকে নতুন শিল্পে রূপান্তর

জাপানের সামনে বরং অন্য একটি পথ রয়েছে। গাড়ি কারখানাগুলোকে সরাসরি ড্রোন বা সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় পরিণত করার বদলে দেখতে হবে, গাড়ি শিল্পের কোন প্রযুক্তিগত সক্ষমতাগুলো অন্য খাতে কাজে লাগানো সম্ভব।

পাওয়ার ইলেকট্রনিকস, সেন্সর, উন্নত উপকরণ, ব্যাটারি প্রযুক্তি, রোবোটিকস এবং নিখুঁত উৎপাদন—এসব ক্ষেত্রে জাপানের শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। এই সক্ষমতাগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এর জন্য নতুন দক্ষ জনবল, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, গবেষণা এবং নতুন অংশীদারত্বে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অর্থাৎ জাপানকে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। দেশটির প্রকৌশল দক্ষতা এবং উৎপাদন সংস্কৃতি এখনো বিশ্বমানের। প্রয়োজন হলো সেই পুরোনো শক্তিকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা।

প্রতিরক্ষা ব্যয়ের আসল লক্ষ্য কী?

প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি ব্যয়ের সাফল্য শুধু কতগুলো ড্রোন বা সামরিক সরঞ্জাম তৈরি হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই ব্যয় কি জাপানের সামগ্রিক শিল্পভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করছে?

এ কারণেই দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন প্রযুক্তি, যা একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করবে, অন্যদিকে বেসামরিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাও বাড়াবে। সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত ব্যাটারি, রোবোটিকস, সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উৎপাদন এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে এর জন্য ধৈর্য প্রয়োজন। শিল্প সক্ষমতা সরকারি ক্রয়াদেশের মাধ্যমে শুধু তৈরি হয় না; তা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠে।

চীনের শিল্প উত্থানও কেবল সরকারি ভর্তুকির ফল নয়। অবকাঠামো, প্রকৌশলী তৈরির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতার বিস্তার এবং পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিপরীতে পশ্চিমা অনেক অর্থনীতি উৎপাদন এশিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার ফলে নিজেদের শিল্পভিত্তির বড় অংশ হারিয়েছে।

জাপানের জন্য শিক্ষা স্পষ্ট। একটি কারখানা কেনা, ভর্তুকি দেওয়া কিংবা বড় সরকারি অর্ডার দেওয়া শিল্পশক্তির সমার্থক নয়। প্রকৃত সক্ষমতা তৈরি হয় দক্ষ মানুষ, প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ে।

তাই প্রতিরক্ষা খাতে জাপানের বর্তমান বিনিয়োগকে শুধু সামরিক উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটিকে ব্যবহার করতে হবে দেশের শিল্পভিত্তিকে পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রকল্প হিসেবে। গাড়ি শিল্পের প্রতিটি শক্তিকে যেখানে সম্ভব নতুন প্রযুক্তি ও নতুন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

জাপানের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হবে বেশি ড্রোন তৈরি করা নয়; এমন একটি শিল্প অর্থনীতি তৈরি করা, যা একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নিরাপদ। প্রতিরক্ষা উত্থান সেই পরিবর্তনের সুযোগ দিতে পারে—কিন্তু কেবল তখনই, যখন টোকিও কারখানা পুনর্ব্যবহার নয়, সক্ষমতা পুনর্গঠনের দিকে নজর দেবে।