হলিউড অভিনেত্রী হেইডেন প্যানেটিয়ার মাত্র ৩৬ বছর বয়সে গত ১৬ আগস্ট মারা গেছেন। জনপ্রিয় সুপারহিরো টেলিভিশন সিরিজ ‘হিরোজ’-এ ক্লেয়ার বেনেট চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন। তবে অভিনয়জীবনে তার যে বিশেষ দক্ষতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল, সেটি ছিল ইচ্ছেমতো কান্না করতে পারা।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত নিজের স্মৃতিকথা ‘দিস ইজ মি: আ রেকনিং’ নিয়ে কথা বলার সময় মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিবিএসকে হেইডেন জানিয়েছিলেন, তিনি খুব সহজেই ক্যামেরার সামনে কান্না করতে পারতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষ যখন বুঝতে শুরু করে যে তিনি প্রয়োজনমতো কান্না করতে পারেন, তখন প্রায় প্রতিটি কাজেই সেই দক্ষতা ব্যবহার করা হতো।
শৈশবে কান্না আনার জন্য তিনি নিজের পোষা প্রাণীর মৃত্যুর কথা কল্পনা করতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কল্পনার বিষয় আরও অন্ধকার হয়ে উঠেছিল বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। অভিনয়ের জন্য ব্যবহৃত এই অস্বাভাবিক দক্ষতার পেছনে অবশ্য তার নিজের জীবনেও ছিল গভীর দুঃখ ও কঠিন অভিজ্ঞতা।

কিশোর বয়স থেকেই হেইডেনকে আক্রমণাত্মক আলোকচিত্রীদের চাপ সামলাতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে ভাইয়ের মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। নিজের জীবনের বিষণ্নতা ও মানসিক সংগ্রাম নিয়েও তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন।
বিশেষ করে সন্তানের জন্মের পরের সময়টি তার জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন। সন্তান জন্মের পর তিনি প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগেছিলেন। স্মৃতিকথা প্রকাশের সময় সিবিএসকে তিনি বলেছিলেন, তার একটি সুন্দর ও সুস্থ কন্যাসন্তান ছিল এবং জীবনও ছিল অনেক দিক থেকে সৌভাগ্যপূর্ণ, কিন্তু তারপরও তিনি কোনোভাবেই সুখী হতে পারছিলেন না।
স্মৃতিকথায় নিজের সেই সময়ের অভিজ্ঞতা আরও খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন হেইডেন। মানসিক যন্ত্রণা সামলাতে তিনি মাদক ও অ্যালকোহলের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২০ সালে তিনি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হন।
তবে এসব কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্যেও অভিনয় ছিল তার জীবনের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। মাত্র ১১ মাস বয়সে একটি বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে তার যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০০০-এর দশকে বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্রে নিয়মিত কাজ করেন তিনি।

‘রিমেম্বার দ্য টাইটানস’ এবং ‘স্ক্রিম ৪’-এর মতো চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন হেইডেন। পরে ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রচারিত জনপ্রিয় সংগীতভিত্তিক ধারাবাহিক ‘ন্যাশভিল’-এ জুলিয়েট বার্নস চরিত্রে অভিনয় করে নতুন করে দর্শকদের নজর কাড়েন।
২০২৩ সালে ‘স্ক্রিম’-এর ধারাবাহিক চলচ্চিত্রে আবারও অভিনয়ে ফেরেন তিনি। তবে জীবনের শেষ কয়েক বছরে তিনি আগের তুলনায় অনেকটাই প্রচারের আড়ালে ছিলেন।
হেইডেনের মৃত্যুর পর সহকর্মী ও বন্ধুদের কাছ থেকে এসেছে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া। ২০১৬ সালের চলচ্চিত্র ‘কাস্টডি’-তে তার সঙ্গে অভিনয় করা অভিনেত্রী ভায়োলা ডেভিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেইডেনকে স্মরণ করেন।
ডেভিস লিখেছেন, পৃথিবীর আরও অনেকটা সময় হেইডেনের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ থাকা উচিত ছিল, কারণ তিনি জানতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন—হেইডেন ভবিষ্যতে কেমন মানুষ হয়ে উঠবেন। তার জীবনের পরীক্ষাগুলোই শেষ পর্যন্ত তার সাক্ষ্যে পরিণত হয়েছে, আর সেই সাক্ষ্যই তার উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে—এমনই আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন ডেভিস।
হেইডেন প্যানেটিয়ারের জীবন তাই শুধু একজন সফল অভিনেত্রীর গল্প নয়। শৈশব থেকে তারকা হয়ে ওঠা, ক্যামেরার সামনে অসাধারণ অভিনয়ক্ষমতা, ব্যক্তিগত জীবনের গভীর সংকট, মাতৃত্ব-পরবর্তী বিষণ্নতা, আসক্তির সঙ্গে লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে তুলে ধরার সাহস—সব মিলিয়ে তার জীবন ছিল আলো ও অন্ধকারে ভরা এক জটিল যাত্রা। পর্দায় যিনি মুহূর্তেই কান্না আনতে পারতেন, বাস্তব জীবনেও তাকে দীর্ঘ সময় ধরে নিজের কান্না ও কষ্টের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















