যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে আবহাওয়ার ভয়াবহ রূপ দেখেছে দেশটির মানুষ। নতুন তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই। একই সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র দাবদাহ, দাবানল, বন্যা, ঝড় এবং ভয়াবহ বায়ুদূষণ দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যেন একই মাসে একাধিক বিপর্যয়ের চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) নতুন তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে সংলগ্ন ৪৮টি অঙ্গরাজ্যের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০ শতকের গড়ের চেয়ে ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। মাসজুড়ে লাখো মানুষকে তিন দফা ভয়াবহ ‘হিট ডোম’ বা তাপ-গম্বুজের মধ্যে থাকতে হয়েছে।
১২ জুলাই কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডও হয়েছে। আইডাহো, ইউটাহ ও মন্টানাসহ কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। প্রচণ্ড গরমের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
তবে জুলাইয়ের জলবায়ু বিপর্যয় শুধু তীব্র গরমেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পূর্ব ওরেগনে ভয়াবহ দাবানলে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার একর এলাকা পুড়ে যায়। আগুনের কারণে হাজার হাজার মানুষকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হয়। একই সময়ে কলোরাডো, ওয়াশিংটনসহ যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। একসঙ্গে এত জায়গায় আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ফেডারেল পর্যায়ের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ওপরও ব্যাপক চাপ তৈরি হয়।
দাবানলের ধোঁয়া শুধু আগুনের আশপাশের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কানাডার দাবানল থেকে আসা ধোঁয়ার সঙ্গেও মিশে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় বায়ুর মান খারাপ করে দেয়। লাখো মানুষকে দূষিত বাতাসের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। অনেককে বাইরে বের হওয়ার সময় এন৯৫ মাস্ক ব্যবহার করতে হয়েছে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে শিকাগোর বায়ুর মান এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে। উত্তর মিনেসোটায় অবস্থিত বাউন্ডারি ওয়াটার্স ক্যানো এরিয়া ওয়াইল্ডারনেসও প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হয়। ফলে প্রকৃতিপ্রেমী, পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়।
একদিকে কোথাও মানুষ প্রচণ্ড গরম ও ধোঁয়ায় হাঁসফাঁস করেছে, অন্যদিকে দেশের আরেক অংশে নেমে এসেছে ভয়াবহ বৃষ্টি ও বন্যা। ১৩ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত সেন্ট্রাল টেক্সাসে ২৮ ইঞ্চির বেশি বৃষ্টিপাত হয়। অল্প কয়েক দিনে এত বিপুল বৃষ্টির ফলে গুয়াডালুপ নদী এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এতে অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়।
টেক্সাসের উভালডেতেও বন্যার ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে, মানুষকে ঘরের ভেতরেই আটকে থাকতে হয় এবং অনেক পরিবারকে ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বন্যার পরও অনেক এলাকায় স্বাভাবিক জীবন ফিরতে সময় লাগে।
এর মধ্যেই ২২ জুলাই লুইজিয়ানা উপকূলে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ‘বার্থা’ আঘাত হানার আশঙ্কা তৈরি করে। নিউ অরলিন্সের কাছে শিশুরা যখন উত্তাল ঢেউয়ের পাশে খেলছিল, তখন উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ের প্রভাব নিয়ে সতর্কতা জারি ছিল।
অন্যদিকে কলোরাডোতে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও রেকর্ড পরিমাণ কম তুষারপাতের প্রভাব পড়েছে পানির ব্যবস্থাপনায়। পানির সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সপ্তাহে মাত্র দুদিন বাগানে পানি দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ফলে একই দেশে কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে বন্যা, আবার কোথাও পানির অভাবে খরা—দুই বিপরীত চিত্রই দেখা গেছে।
জুলাইয়ের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বসবাসের পরিবেশের অংশ হয়ে উঠছে। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ, দাবানল, ধোঁয়ায় বায়ুদূষণ, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং শক্তিশালী ঝড়—সবকিছু একই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে।
একটি মাসের ঘটনাপ্রবাহেই যুক্তরাষ্ট্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোথাও মানুষকে তীব্র গরম থেকে বাঁচতে ঘরে থাকতে হয়েছে, কোথাও ধোঁয়ার কারণে মাস্ক পরে চলতে হয়েছে, কোথাও দাবানলের কারণে বাড়িঘর ছাড়তে হয়েছে, আবার কোথাও বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে এসব ঘটনা আরও বড় একটি সতর্কবার্তা। জলবায়ুর পরিবর্তন যত তীব্র হচ্ছে, চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোও মানুষের জীবনে তত বেশি প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেই বাস্তবতারই এক ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে থাকল।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















