ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার পেন্টাগনে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক গম্ভীর অনুষ্ঠানে নিহতদের স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি এমন কিছু নীতির প্রতি আগের চেয়ে বেশি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যেগুলোর দীর্ঘদিন ধরে তিনি সমালোচনা করে এসেছেন। ইরানের সঙ্গে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের পর ট্রাম্পের অবস্থানের এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
৯/১১ হামলার পর আমেরিকানদের ঐক্যের প্রশংসা করে ট্রাম্প তার ইরান নীতিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর সঙ্গে যুক্ত করেন। ট্রাম্পের এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ৯/১১-এর পর ইরাক আগ্রাসনের তীব্র সমালোচনা করেই তিনি ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, ২৫ বছর আগে নিহতদের স্মরণে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, আজ তা আবারও নবায়ন করা হচ্ছে—কখনো তাদের ভুলে যাওয়া হবে না। তার ভাষায়, এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখন লড়াই করছে এবং তাদের কোনো বিকল্প নেই। ৯/১১-এর মতো দিনগুলো একটি দেশের প্রকৃত শক্তি ও চরিত্র প্রকাশ করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সকাল ৯টার কিছু পর ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাম্প পেন্টাগনের অনুষ্ঠানে পৌঁছান। সেখানে পেন্টাগন হামলায় নিহত ১৮৪ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর নাম একে একে পড়ে শোনানো হয়। প্রতিটি নাম পাঠের পর একটি ঘণ্টা বাজানো হয়।
প্রায় ১৮ মিনিটের বক্তব্যে ট্রাম্প ৯/১১ হামলার ভয়াবহতা এবং এর পর আমেরিকানদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন। তবে বারবার ফিরে আসেন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা চালানোর নিজের সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গে। তার দাবি, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে ঠেকাতেই এই যুদ্ধ প্রয়োজন হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এই যুদ্ধ ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে করা কিছু ভুলেরই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে।

বুশের যুদ্ধনীতির কাছাকাছি ট্রাম্প
৯/১১-এর পর জর্জ ডব্লিউ বুশ যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। এসব যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ট্রিলিয়ন ডলার। প্রাণ হারিয়েছেন হাজারো মার্কিন সেনা এবং আরও বহু আফগান ও ইরাকি। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও দূরবর্তী দেশগুলোর সমাজকে নিজেদের মতো করে পরিবর্তনের প্রচেষ্টা নিয়ে মার্কিন জনগণের বড় অংশের মধ্যে পরে হতাশা তৈরি হয়।
২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় ট্রাম্প বুশের অন্যতম কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি ইরাক যুদ্ধকে প্রেসিডেন্টের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
কিন্তু শুক্রবারের বক্তব্যে ট্রাম্পের অবস্থান বুশ এবং পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার যুদ্ধসংক্রান্ত নীতির তুলনামূলক কাছাকাছি বলে মনে হয়েছে। ওবামা ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অনেকটাই কমিয়ে আনলেও আফগানিস্তানে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন।
এবারের স্মরণ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প তার জীবিত চার পূর্বসূরির কাছ থেকে আলাদা ছিলেন। সাবেক প্রেসিডেন্টরা নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
ট্রাম্প বলেন, গত ২৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেরা ও সাহসী’ মানুষরা দেশকে নিরাপদ রেখেছেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করা সব মার্কিন সেনাসদস্যকে তিনি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে ইরানকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশটির যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে, তা নিশ্চিত করতে মার্কিন সেনারা কাজ করছে।
ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বড় ইস্যু
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ওয়াশিংটনের মিত্রদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ও সামরিক দায়বদ্ধতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি বুশ আমলের যুদ্ধের অভিজ্ঞ এবং সেই যুদ্ধের সমালোচকদেরও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তাদের মধ্যে রয়েছেন। ৯/১১-এর পর সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে চলতি বছর ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা তার প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়েছে। তেহরানও তার ধারণার চেয়ে বেশি প্রতিরোধ দেখিয়েছে। ফলে বুশের প্রেসিডেন্সিতে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছাপ ফেলেছিল, ইরান যুদ্ধও তেমনি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছে।

শুক্রবারের বক্তব্যে ট্রাম্প ৯/১১-এর দিনের নিজের স্মৃতির কথাও বলেন। পেন্টাগন, নিউইয়র্ক এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩-এ নিহতদের শ্রদ্ধা জানান তিনি। ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে ছিনতাইকারীরা বিমানটি আরেকটি হামলায় ব্যবহার করতে চায়। তারা প্রতিরোধ করে বিমানটি পেনসিলভানিয়ায় ভূপাতিত করেন এবং নিজেরাও প্রাণ হারান।
ট্রাম্প বলেন, আমেরিকানদের মধ্যে এমন এক ধরনের ভালোত্ব ও মানসিক শক্তি রয়েছে, যা যেকোনো পার্থিব শক্তিকে অতিক্রম করতে পারে।
অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের ক্লান্তি নিয়ে প্রশ্ন
নিহতদের নাম পাঠের সময় ট্রাম্পকে কয়েকবার চোখ খোলা রাখতে কষ্ট করতে দেখা যায়। শুক্রবার ভোররাত প্রায় আড়াইটার দিকে তিনি ডালাস থেকে হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন। সেখানে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একটি রিপাবলিকান সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি।
ট্রাম্পের ক্লান্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইংল বলেন, প্রেসিডেন্ট গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে নিহত ও সেদিন প্রাণ হারানো সাহসী প্রথম সাড়াদানকারীদের স্মরণ করছিলেন। ট্রাম্প ঘুমিয়ে পড়েছিলেন—এমন দাবি তিনি মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের সঙ্গে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যরাও ছিলেন। মঞ্চে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন তার পাশে বসেছিলেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইসও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। হামলার সময় তিনি বুশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন।
অন্যদিকে ভ্যান্স নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এলাকায় আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানে সাবেক প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে যোগ দেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কের অনুষ্ঠানটি অরাজনৈতিক রাখার চেষ্টা করা হয় বলে সেখানে প্রেসিডেন্টরা সাধারণত বক্তব্য দেন না।
সেখানে নিহতদের স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা পালাক্রমে তাদের নাম পাঠ করেন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হামলায় নিহত ২ হাজার ৭৫৩ জনের নাম পাঠ করা হয়।
ন্যাটো ও কানাডার ভূমিকা স্মরণ করলেন রাইস
পেন্টাগনের অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের বক্তব্যের আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ তার বক্তব্যে বারবার ‘ইসলামি সন্ত্রাসীদের’ নিন্দা করেন। জেনারেল কেইন হামলার পর আমেরিকানদের ঐক্যের কথা স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ২৫ বছর আগে সবচেয়ে বড় বিপদের মুহূর্তে আমেরিকানরা একে অপরের কাছাকাছি এসেছিল। হামলার সময় তিনি ছিলেন বিমানবাহিনীর একজন পাইলট এবং ওয়াশিংটনের আকাশসীমায় প্রবেশ করা যেকোনো বাণিজ্যিক বিমান ভূপাতিত করার দায়িত্বে ছিলেন।

কন্ডোলিজা রাইস হামলার দিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড এইচ. রামসফেল্ডের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা এবং টেলিভিশনে পেন্টাগনের বিশাল ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দেখার সময় তার উদ্বেগের কথা স্মরণ করেন।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। ৯/১১-এর পর ন্যাটো ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলাকে জোটের সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করে এবং আফগানিস্তানে সেনা পাঠায়। কানাডার সাধারণ নাগরিকদেরও তিনি স্মরণ করেন, যারা আটকে পড়া ভ্রমণকারীদের নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
রাইসের বক্তব্য ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে বেশ ভিন্ন। ট্রাম্প ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। কানাডা সম্পর্কেও সম্প্রতি তিনি বলেছেন, চীন বা রাশিয়ার চেয়েও কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রতিপক্ষ।
৯/১১ নিয়ে বিতর্কিত দাবি আর তোলেননি ট্রাম্প
নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার পর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নিজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে ট্রাম্প চলতি সপ্তাহের শুরুতে দাবি করেছিলেন। ২০০১ সালে তিনি নিউইয়র্কের একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ছিলেন।
তবে শুক্রবারের অনুষ্ঠানে তিনি সেই দাবি পুনরাবৃত্তি করেননি। চলতি সপ্তাহে ২৪ বছর বয়সী শেয়ার ব্যবসায়ী ও স্বেচ্ছাসেবী দমকলকর্মী ওয়েলস ক্রাউথারকে মরণোত্তর প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম দেওয়ার সময় ট্রাম্প ওই দাবি করেছিলেন। ক্রাউথার দক্ষিণ টাওয়ারে মারা যাওয়ার আগে আনুমানিক ১৮ জনকে উদ্ধার করেছিলেন।
নিউইয়র্ক সিটি ফায়ার ডিপার্টমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত ব্যাটালিয়ন প্রধান রিচার্ড অ্যালেস ২০১৯ সালে পলিটিফ্যাক্টকে জানিয়েছিলেন, হামলার পরপরই ঘটনাস্থলে ট্রাম্প ছিলেন—এমন কোনো তথ্য তার জানা নেই। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী তিনি ১০০ জন শ্রমিকের একটি দল সেখানে পাঠিয়েছিলেন—এমন কোনো রেকর্ডও পাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠান শেষে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে যান। শুক্রবার রাতেই তার আয়ারল্যান্ড যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে নিজের মালিকানাধীন রিসোর্টে সপ্তাহান্তে একটি গলফ টুর্নামেন্ট দেখার পাশাপাশি আইরিশ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। এরপর তার ওয়াশিংটনে ফেরার কথা।
মাইকেল বিরনবম 


















