বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে আবাসন বাজার নতুন ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর ফলে বন্ধকী ঋণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাব এবার বাড়ির দামে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁর মন্ত্রিসভাকে বলেছিলেন, তিনি বাড়িকে আরও সাশ্রয়ী করতে চান, আবার একই সঙ্গে যারা ইতিমধ্যে বাড়ির মালিক, তাদের সম্পদের মূল্যও বাড়াতে চান। কিন্তু বাস্তবে এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা কঠিন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ির মালিকেরা সম্পদের মূল্য বৃদ্ধির সুবিধা পেলেও নতুন ক্রেতাদের জন্য বাড়ি কেনা ক্রমেই কঠিন হয়েছে।
কোভিড-পরবর্তী মূল্যস্ফীতির পর ২০২২-২৩ সালে বন্ডের সুদ বেড়ে যাওয়ায় বন্ধকী ঋণের খরচও বেড়েছিল। এখন আবার বন্ডের সুদ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে বিভিন্ন সরকারের ঋণের বোঝাও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ৩০ বছরের গৃহঋণের গড় সুদের হার প্রায় ৭ শতাংশের দিকে এগোচ্ছে। এক বছর আগে তা ছিল ৬ শতাংশের কিছু বেশি এবং মহামারির আগে যে পর্যায়ে ছিল, তার প্রায় দ্বিগুণ। অন্যান্য ধনী দেশেও ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ছে। তবে এবারের পরিস্থিতিতে শুধু ঋণের খরচ বাড়াই নয়, বাড়ির দাম কমার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
ক্রেতাদের ওপর বাড়ছে চাপ
সাম্প্রতিক সুদ বৃদ্ধির মাত্রা আগের দফার মতো তীব্র না হলেও আবাসন বাজার আগের তুলনায় কিছুটা দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ধনী দেশগুলোর বিভিন্ন বাজারে পরিবর্তনশীল সুদের বন্ধকী ঋণ বেড়েছে। ফলে সুদ আরও বাড়লে অনেক পরিবারের মাসিক ঋণের কিস্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
কোভিডের সময় জমিয়ে রাখা সঞ্চয়ের বড় অংশও অনেক পরিবার ইতিমধ্যে ব্যয় করে ফেলেছে। ফলে বাড়ি কেনার মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে সতর্ক হতে পারে ক্রেতারা। একই সময়ে ২০১০-এর দশকের তুলনায় বাড়ির সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। চাহিদার ওপর চাপ এবং সরবরাহের এই পরিবর্তন মিলিয়ে দাম কমার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তবে বাড়ির দাম নামমাত্র হিসাবে খুব বেশি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। গভীর অর্থনৈতিক মন্দা ছাড়া বাড়ির দাম বড় আকারে কমার নজির তুলনামূলকভাবে বিরল। কিন্তু মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে দেখলে বাড়ির প্রকৃত দাম কমতে পারে। অর্থনীতির জন্য সেটি সব সময় খারাপ খবর নাও হতে পারে।
প্রথমবারের ক্রেতাদের জন্য স্বস্তি
অনেক মানুষের আয়ের তুলনায় বাড়ি কেনার মোট খরচ দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় আবাসন এখন বড় অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে, যেখানে আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ কেন্দ্রীভূত, এই সমস্যা আরও প্রকট।
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মজুরি মূল্যস্ফীতির তুলনায় ভালো গতিতে বেড়েছে। কিন্তু বাড়ির মালিকানার মোট খরচ তার চেয়েও দ্রুত বেড়েছে। ফলে বাড়ির দাম কিছুটা কমলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন প্রথমবারের ক্রেতারা। কারণ তাঁদের জন্য বাড়ির প্রাথমিক জমা অর্থ বা ডাউন পেমেন্ট জোগাড় করাই অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বাড়ির দাম কমলে আবাসন বাজারে লেনদেনও বাড়তে পারে। গত কয়েক বছরে বিশেষ করে যেসব দেশে নির্দিষ্ট সুদের বন্ধকী ঋণ জনপ্রিয়, সেখানে বাড়ি কেনাবেচার বাজার অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বহু বাড়ির মালিক মহামারির সময় পাওয়া অত্যন্ত কম সুদের ঋণ ধরে রেখেছেন। ফলে নতুন বাড়ি কিনে বেশি সুদে ঋণ নেওয়ার বদলে অনেকে বর্তমান বাড়িতেই থেকে গেছেন। এর কারণে গত চার বছরে বাড়ি হাতবদলের সংখ্যা ২০০৭-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে কম পর্যায়ে নেমেছে।
এর অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। মানুষ যদি ভালো চাকরির সুযোগের জন্য অন্য শহরে যেতে না চায়, তাহলে শ্রমবাজারের গতিশীলতা কমে যায়। বাড়ির দাম কমতে শুরু করলে উল্টো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে আরও দাম কমার আশঙ্কায় কেউ কেউ এখনই বাড়ি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বাড়িকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার ঝুঁকি
আবাসন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যপতনের আরেকটি সম্ভাব্য শিক্ষা হলো—নিজের বাড়িকে নিছক একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকার মানুষকে বাড়িকে সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে উৎসাহ দিয়েছে। অনেক দেশে বাড়ির মালিকদের বিভিন্ন কর-সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। বাড়ি অবশ্যই একটি সম্পদ। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষও ঋণ নিয়ে বড় সম্পদে বিনিয়োগের সুযোগ পান।
কিন্তু একটি বাড়িতে পরিবারের সম্পদের বড় অংশ আটকে থাকলে বিনিয়োগে বৈচিত্র্য থাকে না। বাড়ির দামের পতনের ঝুঁকি পুরোপুরি সামাল দেওয়াও কঠিন। বীমা কিছু ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু সব ঝুঁকি দূর করতে পারে না।
আরেকটি সমস্যা হলো, একটি পরিবারের বাড়ির মূল্য ও ভবিষ্যৎ আয় একই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থনীতি খারাপ হলে একদিকে চাকরি বা মজুরি কমার ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে বাড়ির দামও কমতে পারে। অর্থাৎ একই সময়ে পরিবারের আয় ও সম্পদের মূল্য—দুই দিকেই চাপ পড়তে পারে।
বাড়ির সঙ্গে পরিবারের আর্থিক স্বার্থ যত বেশি জড়িয়ে থাকে, নতুন আবাসন নির্মাণের বিরোধিতা করার প্রবণতাও তত বাড়তে পারে। কারণ নতুন বাড়ি তৈরি হলে সরবরাহ বাড়বে এবং পুরোনো বাড়ির দাম কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা অনেক বাড়ির মালিককে উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতায় উৎসাহিত করতে পারে।
সুদ বৃদ্ধির মধ্যে সম্ভাব্য ‘স্বস্তি’
মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সুদের হার বাড়ার পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর নয়। কিন্তু এর একটি সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—বাড়ির দাম কমে যাওয়া—আবাসন বাজারের দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যা কমাতে পারে।
বাড়ির দাম যদি মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় কিছুটা নিচে আসে, তাহলে প্রথমবারের ক্রেতাদের জন্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বাড়ি কেনাবেচার গতি ফিরতে পারে।
অর্থাৎ সুদের হার বাড়ার মূল কারণগুলো নিয়ে স্বস্তির কিছু নেই। তবে এর ফলে আবাসন বাজারে অতিরিক্ত মূল্যায়নের কিছুটা সংশোধন হলে সেটিই হতে পারে বর্তমান পরিস্থিতির সীমিত ‘সান্ত্বনা’।











