২০০৮ সালে বিটকয়েনের ধারণা সামনে আসার পর অর্থব্যবস্থা নিয়ে মানুষের চিন্তায় বড় পরিবর্তন আসে। বিটকয়েনের ছদ্মনামধারী নির্মাতা সাতোশি নাকামোতো এমন এক ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন থাকবে না। এরপর বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির উত্থান ঘটে। আবার এর দামে বড় উত্থান-পতনও দেখা যায়।
কিন্তু এখন আলোচনার কেন্দ্র বদলেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির বদলে এর পেছনে থাকা প্রযুক্তি—টোকেনায়ন ও ব্লকচেইনভিত্তিক বিতরণকৃত খতিয়ান—নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্ড, শেয়ার বা ব্যাংকের আমানতের মতো সম্পদকে ডিজিটাল টোকেনে রূপ দেওয়া যায়। সেই টোকেন খুব দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো সম্ভব।
এর ফলে ভবিষ্যতে আর্থিক লেনদেন আরও দ্রুত, সহজ ও কম খরচে করা সম্ভব হতে পারে। এমনকি অনেক লেনদেন ২৪ ঘণ্টাই চালু রাখা যেতে পারে এবং মাঝখানে থাকা অনেক মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন কমে যেতে পারে।
তবে প্রযুক্তির এই পরিবর্তন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে না। বরং অর্থব্যবস্থা যত বেশি ডিজিটাল হচ্ছে, নিরাপদ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সরকারি অর্থের প্রয়োজন ততই বাড়ছে।
লেনদেনের শেষ নিশ্চয়তা
কোনো লেনদেন তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন ক্রেতা তার কেনা জিনিস বা সম্পদ পান এবং বিক্রেতা এমন অর্থ পান, যার ওপর তিনি আস্থা রাখতে পারেন। অর্থনীতিতে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিষ্পত্তি বা সেটেলমেন্ট।
ধরা যাক, আপনি একটি গাড়ি বিক্রি করলেন। এর বিনিময়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ভাউচার পেলেন, যাকে আপনি ভালোভাবে চেনেন না। সেই প্রতিষ্ঠান পরে টাকা দিতে ব্যর্থ হলে আপনি সমস্যায় পড়বেন। অর্থাৎ যে অর্থ বা সম্পদ আপনি পেয়েছেন, তার সঙ্গে ঝুঁকি রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থের বড় সুবিধা এখানেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন অর্থ দেয়, যার ওপর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণভাবে নির্ভর করতে পারে। এটিই লেনদেনের সবচেয়ে নিরাপদ ভিত্তি।
বিশেষ করে বড় আর্থিক বাজারে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরোর লেনদেন করে। এসব লেনদেন শেষ করতে এমন একটি অর্থ দরকার, যাকে সবাই নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। বর্তমানে সেই ভূমিকা পালন করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ।
প্রযুক্তি বদলালেও নিরাপদ অর্থের প্রয়োজন থাকবে
টোকেনায়ন ও ব্লকচেইন লেনদেনকে অনেক দ্রুত করতে পারে। যে কাজ শেষ করতে আগে কয়েক দিন লাগত, সেটি ভবিষ্যতে কয়েক সেকেন্ডে করা সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু শুধু দ্রুত লেনদেন করলেই হবে না। লেনদেনের সময় যে অর্থ ব্যবহার করা হবে, সেটিও নিরাপদ হতে হবে।
বর্তমানে ব্লকচেইনভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের অর্থ রয়েছে। কিন্তু সবগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থের বিকল্প নয়।
স্টেবলকয়েনের পেছনে থাকা প্রতিষ্ঠান বা সম্পদের ওপর ঝুঁকি থাকতে পারে। টোকেনায়িত ব্যাংক আমানতের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঝুঁকি থাকে। আর বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টো সম্পদের দাম খুব দ্রুত ওঠানামা করতে পারে।
তাই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও একটি নিরাপদ আর্থিক ভিত্তি প্রয়োজন। আর সেই ভিত্তি দিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ।
ইউরোপে নতুন উদ্যোগ
এই ধারণা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২১ সেপ্টেম্বর তাদের ‘পন্টেস’ উদ্যোগ চালু হয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে টোকেনায়িত সম্পদ কেনাবেচার প্ল্যাটফর্মকে এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ ব্যবহার করে লেনদেন নিষ্পত্তি করা হয়।
এর ফলে নতুন ধরনের ডিজিটাল সম্পদও প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার মতো একটি নিরাপদ ভিত্তি পেতে পারে।
এটি অবশ্য শেষ পদক্ষেপ নয়। ২০২৮ সালের মধ্যে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই ব্লকচেইনে টোকেনায়িত সম্পদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টোকেনায়িত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে চায়।
এর ফলে ইউরোপের আর্থিক বাজারে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা লেনদেনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যে অভিন্ন নিয়ম ও মানদণ্ড চালুর চেষ্টা চলছে। এতে ইউরোপের পুঁজিবাজারে থাকা বিভিন্ন ধরনের বিভাজন কমানো সম্ভব হতে পারে।
স্টেবলকয়েন থাকবে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থও দরকার
এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থই ব্যবহার হবে। স্টেবলকয়েনসহ বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি ডিজিটাল অর্থও থাকবে।
তবে এসব অর্থের মধ্যে সহজে লেনদেন ও বিনিময় করতে হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এক ইউরো যেন যে রূপেই থাকুক না কেন, তার মূল্য এক ইউরোই থাকে। সেটি ব্যাংকের হিসাবে থাকুক, টোকেন হিসেবে থাকুক বা অন্য কোনো ডিজিটাল ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হোক, তার মূল্য ও গ্রহণযোগ্যতায় যেন পার্থক্য না হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা এটিকে অর্থের ‘এককত্ব’ হিসেবে দেখেন।
সাধারণ মানুষ যেন সুফল পায়
নতুন প্রযুক্তির সুবিধা শুধু কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এর পুরো সুফল পাওয়া যাবে না। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সহজে যোগাযোগ ও লেনদেনের সুযোগ থাকা দরকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অভিন্ন নিয়ম ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের জন্য আলাদা ও বন্ধ ব্যবস্থা তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
এই ব্যবস্থা সফল হলে আর্থিক লেনদেনের খরচও কমতে পারে। প্রায় দেড়শ বছর ধরে আর্থিক মধ্যস্থতার খরচ মোটামুটি ২ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যতে এই খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিটকয়েনের স্বপ্ন থেকে ভিন্ন ভবিষ্যৎ
২০০৮ সালে বিটকয়েনের ধারণার পেছনে যে চিন্তা ছিল, তার একটি বড় অংশ ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানো। কিন্তু এখন ডিজিটাল অর্থব্যবস্থার যে রূপ তৈরি হচ্ছে, তা সেই ধারণার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।
ডিজিটাল অর্থের ভবিষ্যৎ হয়তো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সরিয়ে দেওয়ার দিকে যাচ্ছে না। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও দক্ষভাবে ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে।
অর্থাৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইনের শুরুটা যদি সরকারি অর্থের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী অধ্যায়টি হতে পারে সরকারি অর্থকে আরও ভালোভাবে ব্যবহারের চেষ্টা।
প্রযুক্তি বদলাবে, লেনদেনের পদ্ধতি বদলাবে, অর্থের রূপও বদলাতে পারে। কিন্তু অর্থের ওপর মানুষের আস্থা নিশ্চিত করার জন্য একটি নিরাপদ ও সর্বজনগ্রাহ্য ভিত্তির প্রয়োজন থাকবে। আর সেই জায়গায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা আগামী দিনেও গুরুত্বপূর্ণ থাকার সম্ভাবনাই বেশি।











