বিশ্বের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের গণিত, পড়া ও বিজ্ঞান বিষয়ে দক্ষতা যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরীক্ষা হলো পিআইএসএ—‘প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট’। ২০২৫ সালের ফল প্রকাশের পর চীনের শিক্ষার্থীদের ফলাফল বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—এই ফলাফল কি পুরো চীনের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে?
২০২৫ সালের পিআইএসএ পরীক্ষায় চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে ১২ হাজার ৩৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। গণিত ও বিজ্ঞানে তারা অংশগ্রহণকারী দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে। পড়ার দক্ষতায় তারা সিঙ্গাপুরের পর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল।
তবে এই ফলাফলকে পুরো চীনের ফল বলা যায় না। কারণ পরীক্ষায় মূল ভূখণ্ডের মাত্র চারটি অঞ্চল অংশ নিয়েছিল—বেইজিং, সাংহাই, জিয়াংসু ও ঝেজিয়াং। পিআইএসএ-তে এই চার অঞ্চলকে সংক্ষেপে ‘বিএসজেজেড’ বলা হয়। দুটি বড় শহর ও দুটি পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি।
সমস্যা হলো, এই চার অঞ্চল চীনের অন্যান্য অংশের তুলনায় অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে অনেক এগিয়ে। এসব এলাকায় একাডেমিক উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে মাথাপিছু গড় ব্যবহারযোগ্য আয় প্রায় ৭০ হাজার ইউয়ান বা ৯ হাজার ৭০০ ডলার—যা চীনের মূল ভূখণ্ডের জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
ফলে বেইজিং, সাংহাই, জিয়াংসু ও ঝেজিয়াংয়ের শিক্ষার্থীদের ফলাফলকে পুরো চীনের শিক্ষার্থীদের গড় ফল হিসেবে দেখলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র কিছুটা উঁচু হয়ে দেখা দিতে পারে।
আয় ও শিক্ষার ফলাফলের সম্পর্ক
২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের গবেষকেরা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। চীনের বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন সময়ে পিআইএসএ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। সেই সময় অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাত্রাও এক ছিল না। ফলে আয় ও পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে একটি সম্পর্ক নির্ণয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
গবেষকেরা মাথাপিছু ব্যবহারযোগ্য আয় এবং পিআইএসএ পরীক্ষার ফলাফলের সম্পর্ক ব্যবহার করে পুরো চীনের সম্ভাব্য ফলাফল অনুমান করার চেষ্টা করেন। যুক্তিটি ছিল, দেশের জাতীয় আয় জানা থাকলে আয় ও শিক্ষাগত ফলাফলের সম্পর্কের ভিত্তিতে পুরো দেশের সম্ভাব্য পিআইএসএ ফলও হিসাব করা সম্ভব।
দ্য ইকোনমিস্ট পরবর্তী সময়ের পরীক্ষার তথ্য যুক্ত করে সেই পদ্ধতিকে হালনাগাদ করেছে। হিসাব অনুযায়ী, আয় ও পরীক্ষার ফলাফলের সরল প্রবণতা ধরে এগোলে দেখা যায়, দেশের সব প্রদেশ পিআইএসএতে অংশ নিলেও চীন ভালো ফল করতে পারত।
এই হিসাব অনুযায়ী, পুরো চীনের সম্ভাব্য গণিতের স্কোর হতে পারত ৫৭৯। সেটি হলে চীন গণিতে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানেই থাকত।
তবে এই হিসাবকে সরাসরি বাস্তব ফলাফল হিসেবে দেখা যায় না। কারণ ২০২৫ সালের পিআইএসএ ফলাফলে বিশ্বের অনেক দেশই প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ করেছে। এর পেছনে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কিংবা শিক্ষায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতো কারণ থাকতে পারে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে আলোচনা হয়েছে।
চীনের ওই চার অঞ্চলের ফলাফলও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালে বেইজিং, সাংহাই, জিয়াংসু ও ঝেজিয়াংয়ের শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের তুলনায় পড়ার দক্ষতায় কম নম্বর পেয়েছে। অন্যান্য বিষয়েও তাদের ফল আয় বৃদ্ধির তুলনায় যতটা উন্নত হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি।
অর্থাৎ আয় বাড়লেই শিক্ষার ফল একই অনুপাতে বাড়বে—এমন পুরোনো সম্পর্ক ২০২৫ সালের তথ্যের ক্ষেত্রে পুরোপুরি কার্যকর নাও হতে পারে।
তাহলে পুরো চীনের সম্ভাব্য ফল কত?
এই পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট আগের আয়-ফলাফল সম্পর্কের প্রবণতাকে নিচের দিকে সামঞ্জস্য করেছে। এরপর ২০২৫ সালে অংশ নেওয়া চারটি তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চল—বেইজিং, সাংহাই, জিয়াংসু ও ঝেজিয়াংয়ের প্রকৃত ফলাফলের সঙ্গে সেটিকে মিলিয়ে পুরো চীনের সম্ভাব্য ফল হিসাব করা হয়েছে।
এই পদ্ধতিতে চীনের জাতীয় গণিত স্কোর আনুমানিক ৫৩৬ হতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে।
এটি ওই চার অঞ্চলের প্রকৃত ৬১২ স্কোরের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। কিন্তু ৫৩৬ স্কোর হলেও চীন আন্তর্জাতিকভাবে চতুর্থ অবস্থানে থাকত বলে হিসাবটি দেখায়।
তিনটি বিষয়ের গড় স্কোরও গুরুত্বপূর্ণ। এই হিসাব অনুযায়ী, গণিত, পড়া ও বিজ্ঞানে চীনের সম্ভাব্য গড় স্কোর হতে পারে প্রায় ৫০১। এমন ফল হলে দেশটি বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে থাকত। অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে এটিও বেশ শক্তিশালী শিক্ষাগত ফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো কোনো বাস্তব জাতীয় পিআইএসএ ফল নয়। এগুলো আয়, পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফল এবং ২০২৫ সালের পরিবর্তনকে ভিত্তি করে করা পরিসংখ্যানগত অনুমান।
চীনকে কি পুরো দেশ হিসেবে পিআইএসএতে দেখা উচিত?
পিআইএসএতে শুধু একটি দেশের কিছু অঞ্চল অংশ নেওয়ার ঘটনা চীনের জন্য একেবারে অনন্য নয়। ইরাকের ক্ষেত্রে শুধু কুর্দি অঞ্চল প্রতিনিধিত্ব করে। তাজিকিস্তানের ক্ষেত্রে অংশ নেয় রাজধানী দুশানবে।
তবে চীনের ক্ষেত্রে চারটি নির্বাচিত ও তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চল পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে কি না—এই প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীনের প্রদেশগুলোর মধ্যে অর্থনীতি, শিক্ষা, নগরায়ণ ও পারিবারিক আয়ের বড় পার্থক্য রয়েছে।
সারা দেশের শিক্ষার্থীরা পিআইএসএতে অংশ নিলে চীনের শিক্ষাব্যবস্থার একটি আরও বিস্তৃত ও তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অঞ্চলভেদে শিক্ষার বৈষম্য, অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভাব এবং শিক্ষার মানের পার্থক্যও আরও স্পষ্ট হতে পারে।
২০২৫ সালের ফলাফল অবশ্যই দেখিয়েছে যে বেইজিং, সাংহাই, জিয়াংসু ও ঝেজিয়াংয়ের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় অত্যন্ত উচ্চ ফল করেছে। কিন্তু সেই ফলাফলকে পুরো চীনের জাতীয় ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করার আগে অঞ্চলগুলোর অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সারা দেশের অংশগ্রহণ হলে চীনের শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জাতীয় গড় কোথায় দাঁড়ায়, তা আরও নির্ভুলভাবে বোঝা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ‘বিএসজেজেড’ নামে পরিচিত চার অঞ্চলের ফলাফলও তখন পুরো দেশের ফল থেকে আলাদা করে মূল্যায়ন করা যাবে।












