যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ককে বর্ণনা করতে ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’, ‘প্রযুক্তিযুদ্ধ’ কিংবা ‘নতুন শীতল যুদ্ধ’—এ ধরনের শব্দবন্ধ বহুদিন ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু ২০২৬ সালে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সম্পর্ককে বলছে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতার গঠনমূলক সম্পর্ক’। এর উদ্দেশ্য হলো দুই পরাশক্তির উত্তেজনা তুলনামূলক শান্তভাবে পরিচালনা করা।
তবে চীনের ভেতরে সম্পর্কটির আরেকটি বর্ণনা ক্রমেই আলোচনায় আসছে—‘কৌশলগত অচলাবস্থা’। শব্দটি কূটনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর পেছনে রয়েছে চীনের প্রতিষ্ঠাতা নেতা মাও সে তুংয়ের প্রায় নয় দশক আগের সামরিক চিন্তা।
চীনা মন্ত্রিসভার উপদেষ্টা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীন গবেষক এবং শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও সাম্প্রতিক সময়ে ‘কৌশলগত অচলাবস্থা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর উৎস ১৯৩৮ সালে ইয়ানানে মাওয়ের দেওয়া ‘দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ’ বিষয়ক বক্তৃতা।
মাওয়ের সেই তত্ত্ব ছিল দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে তুলনামূলক দুর্বল পক্ষ কীভাবে ধাপে ধাপে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান বদলাতে পারে। প্রথম পর্যায়ে দুর্বল পক্ষকে প্রতিরক্ষায় থাকতে হবে। এরপর আসে ‘কৌশলগত অচলাবস্থা’র পর্যায়—যেখানে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের অগ্রযাত্রা থেমে যায় এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষ নিজেদের সংগঠিত ও শক্তিশালী করার সুযোগ পায়। শেষ পর্যায়ে দুর্বল পক্ষ পাল্টা আক্রমণে যায়।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে এই কাঠামোয় দেখার অর্থ হলো, বেইজিং মনে করছে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ওয়াশিংটনের একতরফা চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা আগের মতো নেই এবং চীনও পাল্টা চাপ দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করেছে।
বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয় ২০১৮ সালে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে। সে সময় চীন পাল্টা শুল্ক দিলেও সামগ্রিকভাবে তুলনামূলক চাপের মধ্যে ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা একটি অসম চুক্তিতেও চীনকে বেশি পরিমাণে মার্কিন পণ্য কেনা এবং মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছিল। মাওয়ের ভাষায় একে সাময়িক ‘পিছু হটার সাহস’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়—অর্থাৎ লড়াই ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করা।
জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সির সময় চীন বিশেষ করে প্রযুক্তিখাতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দেয়। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বা আধুনিক চিপ তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সুবিধা রয়েছে—এটি বিবেচনায় নিয়ে চীন দেশীয় বিকল্প তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করে।
একই সঙ্গে বেইজিং নিজেদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়।
ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর পর চীনের পাল্টা পদক্ষেপ আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হয়। বিশেষ করে বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ এসব খনিজ বৈদ্যুতিক গাড়ি, সামরিক সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিকস ও নানা উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে দুই দেশের মধ্যে এমন এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে উন্নত কম্পিউটার চিপের শক্তি রয়েছে, আর চীনের হাতে রয়েছে রেয়ার আর্থসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহের ওপর বড় নিয়ন্ত্রণ।
এ কারণেই বিশ্লেষকেরা কখনো পরিস্থিতিটিকে ‘পারস্পরিক বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা’ কিংবা ‘ঝুঁকির ভারসাম্য’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
চীনের জন্য অচলাবস্থাই কি লক্ষ্য?
চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই অবস্থানের গুরুত্ব হলো, এত দূর পর্যন্ত পৌঁছানোই একটি অর্জন। তবে এর অর্থ এই নয় যে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার পরিকল্পনা করছে।
চীনের অনেক গবেষক ও বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্থায়ী ও নির্ণায়ক অর্থনৈতিক বিজয় অর্জন বাস্তবসম্মত নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে কৌশলগত অচলাবস্থা বজায় রাখাই তুলনামূলকভাবে বাস্তব লক্ষ্য হতে পারে।
সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুয়াং রেনওয়েই এমন অচলাবস্থা ৩০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।
তবে এখানেই মাওয়ের তত্ত্বের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বড় পার্থক্যও রয়েছে। সামরিক যুদ্ধে অচলাবস্থা ভেঙে এক পক্ষ চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে যেতে পারে। কিন্তু বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতায় এমন ফল অনেক বেশি জটিল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়ও ‘অচলাবস্থা’
এই প্রতিযোগিতা শুধু বাণিজ্য বা খনিজসম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও দুই দেশের মধ্যে একই ধরনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা চলছে।
চীনের একটি বড় উদ্বেগ হলো, তারা যদি এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় স্থায়ীভাবে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় বড় অসুবিধায় পড়তে পারে।
এই আশঙ্কার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত কিছু এআই নিরাপত্তা কাঠামো গ্রহণে চীন অনাগ্রহী বলে দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তিটি হলো, চীনা এআই মডেলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মডেলের কাছাকাছি সক্ষমতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত বেইজিং নিজের এআই গবেষণাগারগুলোকে ধীর করতে চাইবে না।
অর্থাৎ এআই ক্ষেত্রেও চীনের লক্ষ্য হতে পারে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছানো, যেখানে দুই পক্ষের সক্ষমতার মধ্যে অন্তত একটি ভারসাম্য তৈরি হয়।
রেয়ার আর্থ কেন গুরুত্বপূর্ণ
রেয়ার আর্থের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল দেখা যায়। চীন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য এসব খনিজের রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ না করলেও নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহকে সীমিত করার ক্ষমতা ধরে রেখেছে।
দুই দেশের সম্পর্ক সত্যিকার অর্থে সহযোগিতামূলক হলে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ লাইসেন্স ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হতো। কিন্তু পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা।
চীনের কাছে রেয়ার আর্থ এমন একটি হাতিয়ার, যা যুক্তরাষ্ট্র আবার আক্রমণাত্মক বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিলে দ্রুত চাপ প্রয়োগের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’র কথার পাশাপাশি বাস্তবে দুই পক্ষই একে অপরের দুর্বল জায়গাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে।
অচলাবস্থার মূল্যও আছে
তবে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা চীনের জন্য শুধু কৌশলগত সুবিধা নিয়ে আসছে না; এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যও রয়েছে।
প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার ওপর অতিরিক্ত জোর চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু এর জন্য বিপুল অর্থ শিল্প সক্ষমতা, উৎপাদন অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ব্যয় করতে হচ্ছে।
এর বিপরীতে সামাজিক কল্যাণে তুলনামূলকভাবে কম সম্পদ যাচ্ছে বলে বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে। এর একটি সম্ভাব্য ফল হলো মানুষের আয় বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া।
এই পরিস্থিতিকে যুদ্ধকালীন অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—তবে সেটি কোনো স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিযোগিতা।
মাও সে তুংয়ের ‘দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ’ তত্ত্ব বর্তমান চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। দুই সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবু ‘কৌশলগত অচলাবস্থা’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তুলে ধরে: বেইজিং হয়তো দ্রুত চূড়ান্ত বিজয়ের চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নিজের সক্ষমতা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা চাপ মোকাবিলার ক্ষমতা ধরে রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক সামনে সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা এবং পারস্পরিক চাপ—এই তিনটির জটিল সমন্বয় হিসেবেই এগোতে পারে। আর মাওয়ের পুরোনো তত্ত্বটি সেই দীর্ঘ প্রতিযোগিতার চীনা কৌশলগত মানসিকতা বোঝার একটি জানালা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।











