বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী যাতে বিক্রি না করেন, সে জন্য প্রকাশক ও বিক্রেতাদের ওপর হামলা হচ্ছে। যারা এই হামলার কাজটি করছে, তাদের দৃষ্টিতে তারা সঠিক এবং তাদের জন্য উপকারীও।
গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে এ দেশে রাজনীতির নামে বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি ও দখলবাজি প্রকাশ্যে হচ্ছে। আগে এর বেশিরভাগই হতো অপ্রকাশ্যে।
আগে যারা অপ্রকাশ্যে এই চাঁদাবাজি ও দখলবাজি করত, তারা কেউ আওয়ামী লীগার ছিল, কেউ ক্ষমতাসীন পার্টিতে এসে জুটেছিল। তারা যদি বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পড়তেন, নিশ্চয়ই চাঁদাবাজি, দখলবাজি এগুলো করতে পারতেন না।
শিশু থেকে বয়স্ক ব্যক্তি অবধি- যেকোনো ক্ষেত্রের সফল মানুষের আত্মজীবনী পড়ে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের জীবন গড়তে বা বদলাতে পারে। বাংলাদেশের হাজার বছরের সফল রাজনীতিক ও বীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী তো যেকোনো রাজনৈতিক কর্মী, নেতা বা যেকোনো দেশপ্রেমিক মানুষের জীবন বদলে দেবে, তার চিন্তাভাবনা বদলে দেবে।
তবে আওয়ামী লীগ আমলে বঙ্গবন্ধুর এই আত্মজীবনী বের হলেও বড় বড় অনেক আওয়ামী লীগ নেতা যে ওই বই পড়েছিলেন, তার প্রমাণ কিন্তু ৫ আগস্টের পরে মেলেনি।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ১৯৭১-এর অংশ লেখার আগের অংশ। পরবর্তী অংশ তিনি কিছু লিখিয়েছিলেন মাহবুব তালুকদার ও কিছু গাফফার চৌধুরীকে দিয়ে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে সে অংশ কী হয়েছে, জানা যায় না। মাহবুব তালুকদার বিএনপি ঘরানায় নাম লেখানোর আগে সচিত্র সন্ধানীতে বসে একদিন বলেছিলেন, তিনি ১৫ আগস্ট সকালে সেগুলো উদ্ধার করেছিলেন। হয়তো চাকরি, পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলের সুবিধা পাওয়াসহ সব মিলিয়ে ওগুলো হারিয়ে গেছে।
১৯৯১ সালে গাফফার চৌধুরী ঢাকায় এসে তার স্ত্রীর বোনের বাড়ি থেকে ওই ট্রাঙ্কভর্তি কাগজপত্র উদ্ধার করেছিলেন। হাটখোলা রোডে গাড়িতে বসে তিনি সে কথা বলেছিলেন। তারপর কেন তিনি আর সেগুলো নিয়ে এগোননি, সেটাও বড় প্রশ্ন। জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি খুব অভিমানী হয়ে পড়েছিলেন, তাও বোঝা যায়। কারণ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস সেক্রেটারিরা তাকে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করানোর জন্য যে টালবাহানা করতেন এবং তাঁকে যে দিনের পর দিন বসে থাকতে হতো—তা তাঁর জন্য সুখকর ছিল না।

যাহোক, শেখ হাসিনার অনেক কীর্তির মধ্যে একটি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীটি প্রকাশ করা। বঙ্গবন্ধুর এই আত্মজীবনী প্রকাশ করার সময় কোনো একটি সংবাদপত্রে লিখেছিলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী কোনো প্রকাশনা সংস্থাকে দিয়ে প্রকাশ না করিয়ে আম্বেদকরের রচনাবলির মতো একটি ফাউন্ডেশন করে নামমাত্র বিক্রয়মূল্য রাখা উচিত। তাহলে ছাত্ররা, তরুণরা পড়তে পারবে। শেখ হাসিনার দলের একটি বড় অংশের নেতারা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা যে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পড়বে না—সেটা সেদিন লিখিনি। কেন লিখিনি? উত্তর একটাই, মাঠ থেকে বেড়ে ওঠা কোনো সাংবাদিক তার আত্মজীবনী কখনও লিখতে পারে না। তাকেও তো সমাজে বাস করতে হয়।
যাহোক, আমাদের মতো সাংবাদিকদের কথায় তো আর কেউ কান দেন না। তবে তাঁর অনেক নেতাই যে পড়েননি, তা তো ৫ আগস্টের পরে কয়েকটি ঘটনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে। তাঁরা যদি বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পড়তেন, তাহলে নিশ্চয়ই জাতি তাদের কাছ থেকে বাথরুমে পালিয়ে থাকা ও কচুরিপানায় নাক ডুবিয়ে থাকার বীরত্বের গল্প শুনত না।
কারণ, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর অনুসারীদের রাজনীতিতে কিন্তু পলায়ন নেই। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর মুখে বসে ছিলেন। তারপরে পাকিস্তান রাষ্ট্র তাঁকে জেলে নিয়ে যায়। নুরে আলম সিদ্দিকী পরিণত বয়সে এসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “সেদিন বারবার বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম আপনার বাড়ি থেকে সরে যাওয়া উচিত—কিন্তু পরিণত বয়সে এসে বুঝি বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তিনি নিজ থেকে ভারতে চলে গেলে পৃথিবী ধরে নিত শেখ মুজিব আগের থেকেই ভারতের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তান ভাঙার চেষ্টা করছেন।”
ভারতের অনেক সাংবাদিক বলেন, ভারতে শেখ হাসিনাও আছেন, দালাই লামাও আছেন। পৃথিবীতে সব কথার উত্তর দিতে নেই। আমার দেখা রাজনীতিবিদদের মধ্যে তাঁদের এ কথার সবচেয়ে সুন্দর উত্তর দিতে পারতেন আব্দুস সামাদ আজাদ। তারা বুঝতে পারে না, দালাই লামা তাঁর অনুসারীদের নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে তাঁর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রোটোকলের মাধ্যমে তাঁর জীবন রক্ষার জন্য বন্ধু রাষ্ট্রের ভারতীয় সেনাঘাঁটিতে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে পৌঁছে দেয়। বাদবাকি নিয়ে ইতিহাসের কোনো পর্যায়ে নিখুঁত বিশ্লেষণ হবে। এখানে এ প্রসঙ্গ আর নয়।
তবে আওয়ামী লীগ নেতারা যদি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়তেন, যদি তারা তাঁর সারাজীবন লক্ষ্য করতেন ও ভাষণগুলো পড়তেন, তাহলে এই বাথরুম কাব্য, কচুরিপানা কাব্য তারা লিখতেন না। কারণ, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি আর জেল, জুলুম, মৃত্যুকে উপেক্ষা—এ তো সমার্থক শব্দ। যাহোক, তাদের ওই সব কাব্য অমর হোক।

এমনকি আওয়ামী লীগের ওই সব নেতাদের আরেক কাব্য-কীর্তির কথা বলতে গেলে ভাষাটি পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির জীবিত জ্ঞানী নেতাদের অন্যতম তথাগত রায়ের একটি বক্তব্য থেকে শব্দটি ধার নিতে হয়। যদিও শব্দটি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতায়ও বড় চমৎকারভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে রাজনীতিতে তথাগত রায়ের মতো এত সুন্দরভাবে কেউ অন্তত বাংলা ভাষায় ব্যবহার করতে পারেননি। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জয়ের বেলুন উড়িয়ে যখন “আশিতে আসেনি”, তখন তথাগত রায় বলেছিলেন, “নগরের নটিদের” নমিনেশন দিয়ে তো আর নির্বাচনে জেতা যায় না।
সম্প্রতি একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা, যারা মন্ত্রী ছিলেন, তাদের ছবি তথাগত রায়ের শব্দযুগলে চিহ্নিতদের সঙ্গেই দেখা গেছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে অন্তত এটা তাদের চরিত্রে আসে না, রাজনীতি আর নগরের নটি একসঙ্গে যায় না। যাহোক, তারা বঙ্গবন্ধুকে পড়েনি বলেই, বঙ্গবন্ধুকে উপলব্ধি করেনি বলেই তাদের মতো করে রাজনীতি ও মন্ত্রিত্ব উপভোগ করেছেন।
তাছাড়া বাঙালি এমনিতেই তার নায়কদের জীবনী পড়তে চায় না। বাঙালির সমস্ত নায়করাই বাঙালির যাপিত জীবনে, আচরিত জীবনে উপেক্ষিত হয়েছেন। তাই সে বাঙালি যেখানে থাকুক না কেন, রবীন্দ্রনাথের সংজ্ঞায়িত এই খর্বাকৃতি, শঠ ও পরশ্রীকাতর জনগোষ্ঠীতে দীর্ঘকায়, বিরাট হৃদয়ের মানুষগুলো সবসময়ই উপেক্ষিত ও বেমানান।
৮০-এর দশকের দিকে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে শিশির বসুর লেখা ‘মেমোয়ার্স অব শরৎ বসু’ বইটি খুঁজতে গিয়ে হাসি-ঠাট্টার পাত্র হয়েছিলেম। এক দোকানি তো একটু বিশেষ স্বরে বললেন, “দাদা, কোথা থেকে এসেছেন?” বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলাম, “ঢাকা থেকে।” তিনি ঠাট্টার হাসি আরও হেসে বলেছিলেন, “আপনারা এখনো এগুলোই পড়েন। দেখুন, ওই এলগিন রোডে ‘ওদের’ একটা বাড়ি আছে। ওখানে গেলে পেতে পারেন।”
স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। হাঁটু অবধি ধুতি পরা, একটি আধা-ময়লা হাফশার্ট পরা লোকটির দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকি—আসলে বাঙালি হিসেবে জন্ম নেওয়া কত বড় পাপ। মনে পড়ে কবি দাউদ হায়দারের একুশ বছর বয়সে লেখা কবিতার সেই লাইন, “জন্মই আমার আজন্মের পাপ”। নেতাজি সুভাষ বসুর বাড়িকে বলছেন, “ওদের” একটা বাড়ি আছে।
আবার সবটুকু পাপ ভাবতেও পারি না। রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ বসু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—বাঙালি ঘরেই জন্মেছেন।
যাহোক, বলতে বসেছিলাম, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়তে না দেওয়ার উপকারিতা। সেই মূল কথায় ফিরে যাওয়া যাক—বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা ও তাঁর চিন্তার অগ্রগামী ধারা বুঝতে অনেক সাহায্য করে। বাকি তো ইতিহাসের পাতায় আছে। তাই বঙ্গবন্ধুকে পড়লে বা বুঝলে অনেক অসুবিধা। এটা বুঝেছিলেন বলেই ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক হয়েও তোফায়েল আহমদ ৭০-এ বাসে বা লঞ্চে চড়ে বিভিন্ন জায়গায় জনসভা করতে গেছেন। আর ২০২৪-এর ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের ছাত্রনেতারা শেখ হাসিনার সরকার ভেঙে যাওয়ার এক মাসের মধ্যেই কোটি টাকা দামের গাড়ি চড়েছে, ওয়েস্টিনে নাস্তা করেছে, ৩০০ ফিটে হাঁস খেয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে তারা কি এভাবে ক্ষমতাকে উপভোগ করতে পারত? আজ যে দেশের অন্যতম একটি লাভজনক প্রফেশন চাঁদাবাজি, দখলবাজি। আর বাঙালির সেই আবহমান সহজিয়া কালচারের জায়গায় বসানোর চেষ্টা হচ্ছে “মব ভায়োলেন্স” কালচার।
বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী বাজারে থাকলে যদি কেউ মনোযোগ দিয়ে পড়ে বসে, তাহলে সে হয়তো মব ধর্ম ও চাঁদাবাজির ধর্ম থেকে সাধারণ বাঙালির ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে যেতে পারে। সেটা এই চাকরি হারানো, চাকরি না পাওয়া কোটি কোটি বেকারের দেশে, এই আক্রার বাজারে কতটা অসুবিধার তা কি বলার অপেক্ষা রাখে। বরং এটা বাজারে না থাকাই উপকারী। এটা বাজারে থাকলে, মানুষ পড়লে কারও না কারও করে খাওয়ার পথে নিজের বিবেক বাধা দিতে পারে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
নারীমুক্তির রামমোহন, পূর্ববাংলার ব্রাহ্ম সমাজ ও রাহুল গান্ধী
ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ায় লাভবান তারেক রহমান, ক্ষতি বাংলাদেশের
কিশোর গ্যাং, অপ্রতীমের মৃত্যু এবং “মবস্টার ইউনূস”
কানাঘুষোয় শোনা যায়, বিএনপি এসে গেছে











