নেপালের মধ্যাঞ্চলে তুষারধসে অন্তত ১৫ জন নেপালি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। বিদেশি পর্বতারোহীদের জন্য তাঁরা একটি ক্যাম্প প্রস্তুত করছিলেন। উদ্ধার কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছেন। একজন এখনো নিখোঁজ। চলতি মাসে শেষ হতে যাওয়া শরৎকালীন পর্বতারোহণ মৌসুমে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। হিমলুং হিমালে তুষারধসের সময় বিদেশি আরোহীরা তখনো ক্যাম্পে পৌঁছাননি। ফলে নিহতদের সবাই ছিলেন স্থানীয় সহায়ক কর্মী।
তুষারধসটি ঘটে গত সপ্তাহান্তে, উত্তরের মানাং জেলায় অবস্থিত হিমলুং হিমালের বেস ক্যাম্পে। পর্বতটির উচ্চতা ৭ হাজার ১২৬ মিটার। এটি নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের কাছে অবস্থিত। আট হাজার মিটারের নিচের চূড়াগুলোর মধ্যে এটি বিদেশি আরোহীদের কাছে জনপ্রিয়। বসন্তের পর শরৎই নেপালে পর্বতারোহণের দ্বিতীয় প্রধান মৌসুম। শ্রমিকেরা সেখানে তাঁবু খাটাচ্ছিলেন এবং দড়ি বাঁধছিলেন। হঠাৎ নেমে আসা বরফ ও তুষারে পুরো ক্যাম্প চাপা পড়ে। বৃহস্পতিবার বরফের নিচ থেকে আটটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাকি সাতটি মরদেহ এর আগেই উদ্ধার হয়েছিল। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় উদ্ধারকারী ও গাইডরা বরফ সরিয়ে মরদেহ খুঁজেছেন। কয়েক দিন ধরে বরফ খুঁড়ে উদ্ধারকাজ চালাতে হয়েছে। দুর্গম এলাকা ও প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তোলে।
নেপাল ন্যাশনাল মাউন্টেন গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তুল সিং গুরুং জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডুতে আনা হবে। নিখোঁজ শ্রমিককে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন তিনি। উদ্ধার অভিযানও শিগগির শেষ হতে পারে। প্রতিবছর হাজারো বিদেশি পর্যটক ও আরোহী নেপালে আসেন। তাঁদের ঘিরে গাইড, মালবাহক ও সহায়ক কর্মী হিসেবে কাজ করেন হাজার হাজার মানুষ। পর্যটন নেপালের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত, আর পর্বতারোহণ তার বড় অংশ। এই কাজ থেকে আসা আয় অনেক পাহাড়ি পরিবারের প্রধান ভরসা। এই শ্রমিকেরাই আরোহীদের আগে পাহাড়ে উঠে পথ ও ক্যাম্প তৈরি করেন। তাই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় ভার তাঁদেরই বহন করতে হয়। হিমলুং হিমালে তুষারধস সেই ঝুঁকির নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে হিমবাহ ও বরফ দ্রুত গলছে। এতে পাহাড়ের কাজ আগের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি দুই দিক থেকে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশি পর্বতারোহীরা প্রায়ই নেপালের বিভিন্ন চূড়ায় অভিযানে যান এবং স্থানীয় শেরপা ও গাইডদের ওপর নির্ভর করেন। ২০১০ সালে মুসা ইব্রাহীম প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন। এরপর আরও অনেক বাংলাদেশি নেপালের নানা চূড়া জয় করেছেন। দ্বিতীয়ত, হিমালয়ের হিমবাহই বাংলাদেশের বড় নদীগুলোর পানির অন্যতম উৎস। হিমালয়ে বরফ গলার গতি বাড়লে ভাটির দেশে বন্যা ও শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহের ধরন বদলায়। হিমলুং হিমালে তুষারধস তাই দূরের পাহাড়ের দুর্ঘটনা হলেও এর বার্তা বাংলাদেশের জন্যও।
নিহত শ্রমিকেরা কাজ করছিলেন বেস ক্যাম্পে, চূড়ার ৭ হাজার ১২৬ মিটার উচ্চতা থেকে অনেক নিচে। আরোহণের সবচেয়ে কঠিন অংশ শুরুই হয়নি তখনো। বিদেশি আরোহীরা পৌঁছানোর আগে প্রস্তুতির কাজেই এতগুলো প্রাণ গেল। মৌসুমের এই সবচেয়ে বড় ক্ষতি তাই পর্বতারোহণ শিল্পে নিরাপত্তার দায় কার, সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।












