প্রথমবারের মতো মহাকাশে এআই চিপ পাঠিয়েছে গুগল। বৃহস্পতিবার ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যান্ডেনবার্গ স্পেস ফোর্স বেস থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন নাইন রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। ট্রান্সপোর্টার এইটিন নামের এই অভিযানে ছিল মোট ১৩০টি উপগ্রহ ও যন্ত্র। তার একটি গুগলের প্রজেক্ট সানক্যাচারের পরীক্ষামূলক উপগ্রহ। মহাকাশে এআই চিপ কতটা টিকে থাকে, সেটি যাচাই করাই এর লক্ষ্য। উৎক্ষেপণের সাড়ে সাত মিনিট পর রকেটের প্রথম ধাপ ভ্যান্ডেনবার্গে ফিরে অবতরণ করে।
উপগ্রহটির আকার একটি রেফ্রিজারেটরের মতো। গুগল এর নাম দিয়েছে এমভিপি। এটি তৈরি করেছে উপগ্রহ প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট। ভেতরে আছে গুগলের নিজস্ব চারটি টেনসর প্রসেসিং ইউনিট, সংক্ষেপে টিপিইউ। সৌর প্যানেল থেকে প্রায় এক কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাবে চিপগুলো। চিপগুলোর সম্মিলিত ক্ষমতা মোটামুটি পৃথিবীর একটি ডেটা সেন্টার সার্ভারের সমান। গবেষকেরা দেখবেন, উৎক্ষেপণের ঝাঁকুনি, মহাকাশের বিকিরণ ও তাপমাত্রার চরম ওঠানামায় চিপগুলো কেমন কাজ করে। নতুন শীতলীকরণ পদ্ধতিও সেখানে পরীক্ষা হবে। গুগলের দাবি, গবেষণাগারের পরীক্ষায় চিপগুলো পাঁচ বছরের অভিযানের সমান বিকিরণ সহ্য করেছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই একে টিপিইউর জন্য ছোট্ট একটি পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন।
প্রজেক্ট সানক্যাচার প্রথম ঘোষণা করা হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরে। প্রতিষ্ঠানটি একে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা হিসেবে বর্ণনা করে। লক্ষ্য হলো, মহাকাশে সৌরশক্তিচালিত ডেটা সেন্টার গড়া সম্ভব কি না, তা যাচাই করা। পৃথিবীতে এআই ডেটা সেন্টারগুলো বিপুল বিদ্যুৎ টানছে। বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ বাড়ছে। মহাকাশে সূর্যের আলো প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়। উৎক্ষেপণ খরচ কমায় এমন ধারণা এখন আর কল্পবিজ্ঞান মনে হচ্ছে না। স্পেসএক্স এ পর্যন্ত তাদের রাইডশেয়ার কর্মসূচিতে ১ হাজার ৮০০টির বেশি উপগ্রহ ও যন্ত্র কক্ষপথে পাঠিয়েছে। ২০২৭ সালে দুটি উপগ্রহ পাঠিয়ে আলোর মাধ্যমে উপগ্রহে উপগ্রহে তথ্য আদান-প্রদান পরীক্ষার পরিকল্পনা আছে। গুগলের গবেষণাপত্রে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় ৮১টি উপগ্রহের ঘন গুচ্ছের নকশাও দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই অভিযান সরাসরি না হলেও পরোক্ষে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এই খাতের বড় বাধা। শিল্পকারখানার মতো ডেটা সেন্টারও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না। এআই চালানোর জন্য বিদ্যুতের জোগান এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বিষয়। মহাকাশে ডেটা সেন্টার সফল হলে ভবিষ্যতে কম্পিউটিং সেবার দাম ও প্রাপ্যতার হিসাব বদলে যেতে পারে। তখন বিদ্যুৎ সংকটে থাকা দেশগুলোও উন্নত এআই সেবা পেতে পারে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই দশকে পৃথিবীর ডেটা সেন্টারের হিসাব বদলাবে না। মহাকাশে এআই চিপ পাঠানো তাই আপাতত একটি দীর্ঘমেয়াদি বাজি।
পুরো পরিকল্পনার ভাগ্য ঝুলে আছে একটি সংখ্যার ওপর। গুগলের নিজস্ব হিসাব বলছে, প্রতি কেজি পণ্য কক্ষপথে পাঠানোর খরচ ২০০ ডলারে নামলে তবেই মহাকাশের ডেটা সেন্টার পৃথিবীর বিদ্যুৎ খরচের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে। বর্তমানে এই খরচ কেজিপ্রতি দেড় হাজার থেকে ২ হাজার ৯০০ ডলার। বৃহস্পতিবারের উৎক্ষেপণে ব্যবহৃত বুস্টারটি এ নিয়ে ২৫তম বার উড়ল। এমন বারবার ব্যবহারের পথ ধরেই খরচ ২০০ ডলারের দিকে নামবে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন।












